kalerkantho

শুভ জন্মদিন

প্রাণময় সেই তরুণকে আজ কোথাও দেখি না

এম নজরুল ইসলাম

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রাণময় সেই তরুণকে আজ কোথাও দেখি না

দীর্ঘ দেহ, ঋজু। পুরু গোঁফ। চোখে কালো ফ্রেমের মোটা কাচের চশমা। পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল। ঠোঁটে প্রশ্রয়ের স্মিত হাসি। এ এক উচ্ছল তরুণের প্রফাইল। সেই প্রাণময় তরুণকে আজ আর কোথাও দেখি না। শেষ কবে দেখেছি তাঁকে? না সে হিসাব তো করা নেই। হিসাব রাখারও তো কোনো প্রয়োজন ছিল না। রোজ যাঁর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, যাঁর স্মিত হাসি আর পিঠের ওপর হাত রেখে কাজ করার সাহস জোগাচ্ছেন যিনি—তাঁর সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছে, এমন হিসাব কষার তো কোনো প্রয়োজন নেই। কোথায় দেখিনি তাঁকে। সদ্য স্বাধীন দেশে তখন আমরা ডানা মেলে উড়ছি যেন। চারদিকে আনন্দের জোয়ার। সেই জোয়ারে তিনি দক্ষ এক সংগঠকের ভূমিকায়। গানের আসরে তাঁকে পাই। নাটকের মঞ্চে তাঁর সপ্রাণ উপস্থিতি। খেলার মাঠে তিনি তো আছেনই। রাজনৈতিক সংগঠনের কার্যালয়েও তিনি উপস্থিত। সকালে দেখছি তাঁকে। বিকেলেও সেই হাসিমুখে টেনে নিচ্ছেন কাছে। অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী এই তরুণ যেকোনো মানুষকে অনায়াসে কাছে টানার শক্তি রাখতেন। জানতেন কী করে সংগঠনকে প্রাণবন্ত রাখতে হয়।

বলছি শেখ কামালের কথা। না, শেখ কামাল নয়, বলছি আমাদের কামাল ভাইয়ের কথা। আমাদের কাছে তো তিনি শেখ কামাল নন। তিনি আমাদের কামাল ভাই। খুব বেশিদিন আগের কথা তো নয়। এই তো সেদিনও শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের ঠিক উল্টো দিকে ৩০ মিরপুর রোডে ছিল ছাত্রলীগের অফিস। দোতলা বাড়ির নিচতলায় মহানগর ছাত্রলীগের, দোতলায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের অফিস। সেই অফিসে আমারও তো নিত্য যাতায়াত ছিল। বয়সে কনিষ্ঠ হলেও ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সহসম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি তখন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের প্রতিনিধি হিসেবে আমার ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত হয়। আজও মনে পড়ে, তখন মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন সৈয়দ নূরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শফিকুর রহমান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ভিপি ছিলেন আমিনুল ইসলাম জিন্নাহ, জিএস ছিলেন ফজলে এলাহী মোহন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্য রকম একটা জোয়ার আনার চেষ্টা করেছিলেন শেখ কামাল। বিশেষ করে ছাত্ররাজনীতির গুণগত মানের পরিবর্তনের চেষ্টা ছিল তাঁর। সরকারের প্রধান নির্বাহী ও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির ছেলে হয়েও দলের উঁচু পদের দিকে তাঁর কোনো মোহ ছিল না। সাধারণ কর্মী হিসেবেই কাজ করতেন তিনি। ছিলেন উদ্যমী পুরুষ। সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে খেলার মাঠ, সর্বত্র সমান দাপট।

এই প্রাণবন্ত তরুণ প্রতিভাকে যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়নি। মূল্যায়ন দূরের কথা, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ তাঁর শিল্পীমনের পরিচয় কয়জনের জানা আছে? অনেকেই হয়তো জানেন না শেখ কামাল চমৎকার সেতার বাজাতেন। ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে দেশের সংগীত জগতে পপসংগীতের যে উত্থান, তার নেপথ্যেও শেখ কামালের অবদান কম নয়। বন্ধু শিল্পীদের নিয়ে সে সময় গড়ে তুলেছিলেন ‘স্পন্দন’ শিল্পীগোষ্ঠী—যে দলটি দেশের সংগীত জগতে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিল, সেই সাতের দশকের প্রথমার্ধে। দেশের নাট্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে শেখ কামাল ছিলেন প্রথম সারির সংগঠক। ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও। অভিনেতা হিসেবেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।

শৈশব থেকে ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় উৎসাহী শেখ কামাল স্বাধীনতার পর আবির্ভূত হন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে। তিনি উপমহাদেশের অন্যতম ক্রীড়া সংগঠন ও আধুনিক ফুটবলের অগ্রদূত আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা। রাজনীতিতেও তাঁর অবদান কম নয়। ছাত্রলীগের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী তিনি। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য ছিলেন এবং শাহাদাতবরণের সময় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কমিশন লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শাহাদাতবরণের সময় তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষা দিয়েছিলেন।  

জন্মেছিলেন আজকের বঙ্গতীর্থ টুঙ্গিপাড়ায় ১৯৪৯ সালের এই দিনে। মাত্র ২৬ বছরের জীবন। ঘাতকের বুলেটে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিহত হন ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। তাঁর মৃত্যু দেশের সংস্কৃতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে তো বটেই, রাজনীতিতেও এক অসামান্য ক্ষতি। আজ জন্মদিনে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেই প্রাণময় তরুণকে, যাঁর প্রেরণা একদিন আমাদের উজ্জীবিত করেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতিতে। তিনি আমাদের দীক্ষা দিয়েছিলেন দেশপ্রেমের মন্ত্রে। প্রাণময় তরুণকে আজ কোথাও দেখি না। প্রবাস থেকে যখনই দেশে যাই, খুঁজি তাঁকে মানুষের ভিড়ে। মিরপুর রোডের চেহারা পাল্টে গেছে। ধানমণ্ডি লেকও আজ অনেক আধুনিক। সেই আবাহনী মাঠ আছে, নেই তার প্রাণপুরুষ। খুঁজি তাঁকে হাসিমুখ হাজার মানুষের ভিড়ে। একবার যদি চমকে দিয়ে হাসিমুখে পিঠে হাত রাখতেন!

লেখক :  সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়াপ্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

[email protected] 

মন্তব্য