kalerkantho

দিল্লির চিঠি

বাঙালি নেতা অধীরবাবু সফল হবেন কি

জয়ন্ত ঘোষাল   

৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাঙালি নেতা অধীরবাবু সফল হবেন কি

ঢাকা থেকে এক পাঠকের চিঠি পেলাম। তিনি লিখেছেন, ভারতের সংসদে বিরোধী কংগ্রেসের সংসদীয় দলনেতা হলেন এক বাঙালি নেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী। পাঠক অধীরবাবু সম্পর্কে জানতে চান। তাঁর প্রশ্ন, অধীরবাবুর আগে কি কোনো বাঙালি নেতা লোকসভায় কংগ্রেস নেতা হয়েছেন?

ঢাকার কৌতূহলী পাঠকের প্রশ্ন শুনে ভালো লাগল কিন্তু নিজেই মনে করতে পারছি না। মনে করার চেষ্টা করলাম। মনমোহন সিংহ যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন প্রণব মুখোপাধ্যায় লোকসভার কংগ্রেস নেতা হন। প্রথমত, সেটি ছিল শাসকদলের নেতা। দ্বিতীয়ত, মাথার ওপর কংগ্রেস দলের সভানেত্রী ছিলেন সোনিয়া গান্ধী। সত্যি কথা বলতে কী কংগ্রেসের প্রয়াত অতুল্য ঘোষের পর সেভাবে সর্বভারতীয় বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্বই আমরা খুব কম দেখেছি। কংগ্রেসে প্রয়াত অশোক সেন ছিলেন, হীরেন মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত, জ্যোতির্ময় বসু এবং সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন কমিউনিস্ট নেতা, কিন্তু সর্বভারতীয় ব্যক্তিত্ব।

১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচনে কংগ্রেস ছাড়া অন্য কোনো বিরোধী দলই ছিল না। কংগ্রেস ছাড়া অন্য যে দলটি ছিল তার নাম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। ১৬টি আসন পেয়েছিল কমিউনিস্টরা। ৮৪৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৬টি আসন, তাই কোনো বিরোধী নেতা ছিলেন না। তবে কার্যত এ কে গোপালনই ছিলেন প্রধান বিরোধী নেতা।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলেও বিজেপির একক দাপুটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর কংগ্রেসের আসনসংখ্যা এমন হলো যে সংবিধান অনুসারে কাউকেই বিরোধী দলনেতার মর্যাদা দেওয়া যায় না। কারণ ভারতীয় সংবিধান অনুসারে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি তখনই দেওয়া হবে, যখন লোকসভার মোট আসনসংখ্যার কমপক্ষে এক-দশমাংশ আসন বিরোধী দল পাবে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনেও তো এমনটাই হলো। এবারও লোকসভায় রাহুল গান্ধী বিরোধী দলনেতা হতে পারলেন না। অবশ্য গতবারের তুলনায় এবার কংগ্রেসের কিঞ্চিৎ আসনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বটে। কিন্তু তবু লোকসভায় প্রথম সারিতে রাহুলের স্থান হয়নি। সোনিয়া গান্ধী বসছেন এবং কংগ্রেস দলনেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরী।

কাজেই প্রণববাবুর পর  অধীর চৌধুরী। আর কোনো বাঙালিই এ পদে আসীন হননি। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে ও প্রণববাবুর পর কংগ্রেসে এহেন রাজনৈতিক গুরুত্ব ও সম্মান পেলেন তিনি। অধীর বহরমপুর থেকে পর পর পাঁচবার জিতেছেন। এবার লোকসভা ভোটে কংগ্রেস দলে পর পর পাঁচবারের আইনসভার সদস্য এমন ব্যক্তিত্ব কয়জন আছেন, সেটাও গবেষণার বিষয়। তা ছাড়া তুলনামূলকভাবে অধীর বয়সে নবীন, ৬১ বছর দিল্লির রাজনীতিতে নবীনই।

তা ছাড়া অধীর শারীরিকভাবেও যথেষ্ট ফিট। তরতাজা মানুষ, বিচক্ষণও বটে। নিন্দুকেরা তো কিছু বলবেই। কুছ তো লগ কহেঙ্গে। কোনো এক সাংবাদিক বললেন, অধীর খুবই ক্ষুব্ধ ছিলেন। ভোটের সময় তিনি নিজের জোরে জিতেছেন। হাইকমান্ডের দয়ায় নয়। উল্টো রাজ্য কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে অধীরকে সরিয়ে সোমেন মিত্রকে করার সময় থেকেই তাঁর ক্ষোভ তীব্র। দিল্লির কোনো এক সাংবাদিক বললেন, অধীরদাকে এটা না করা হলে তিনি বিজেপিতে চলে যেতেন। পশ্চিমবঙ্গে মমতার বিরুদ্ধে অধীরদাকে ছায়া মুখ্যমন্ত্রী করতে প্রস্তুত বিজেপি। সেই নবীন সাংবাদিককে বললাম, এই গসিপ মানে গালগপ্পোটি আমি গত দুই বছর ধরে শুনে আসছি। যুক্তি দিয়ে শুধু একটা কথা বলুন যে অধীর চৌধুরীর সবচেয়ে বড় শক্তি জেলা, সেই জেলায় বহরমপুরে কম হলেও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে মুর্শিদাবাদে সবচেয়ে বেশি মুসলমান জনসংখ্যা। তা সেই জেলা থেকে নির্বাচিত হয়ে যোগ দেবেন বিজেপিতে?

আমি নিজে সাংবাদিক হিসেবে ও ব্যক্তিগতভাবেও অধীরবাবুকে যে খুব বেশি জানি তা কখনোই দাবি করব না। অধীর রঞ্জন চৌধুরী কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন ১৯৯১ সালে। রাজীব গান্ধীর সময়। আর আমি কলকাতা থেকে দিল্লি চলে এসেছি ১৯৮৭ সালে। অধীর রঞ্জন চৌধুরী চিরকাল জেলার রাজনীতিই করে এসেছেন। দিল্লি তো দূর-অস্ত্, তিনি রাজ্য রাজনীতিতেও সেভাবে সক্রিয় ছিলেন না। অধীরবাবু সম্পর্কে সংবাদপত্রে লেখা হতো, তিনি হলেন বহরমপুরের রবিনহুড। দিল্লি থেকে তখন দেখতাম অধীরবাবু ঘনিষ্ঠ ছিলেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির, আর সোমেন মিত্রর সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল চিরকালই খারাপ। রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি অধীরবাবুকে করার আগেও হাইকমান্ড তখন যথেষ্ট সন্দিগ্ধ ছিলেন। মনে আছে, বারবার প্রণববাবুকে কংগ্রেস নেতৃত্ব জিজ্ঞেস করতেন, অধীর তো জেলার শক্তিশালী নেতা, রাজ্য সভাপতি করা কি তাঁকে উচিত হবে। যা হোক, শেষ পর্যন্ত প্রণববাবুর সমর্থনেই অধীর রাজ্য সভাপতি হন।

অধীরবাবু লোকসভার সদস্য হয়ে আসার পর থেকে আমি তাঁকে দেখেছি কাছ থেকে। প্রথমত অধীরবাবু সম্পর্কে ধারণা ছিল যে তিনি হলেন কার্যত ‘বাহুবলি’ সংসদ সদস্য। কিন্তু দেখলাম সংসদে তিনি প্রশ্ন করছেন। বক্তব্য দিচ্ছেন। যাকে বলে যথেষ্ট অংশগ্রহণকারী সংসদ সদস্য। নবগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে অধীর যেতেন ১৯৯১ সালে। ১৯৯৬ সালেও তিনি যেতেন। তারপর ১৯৯৯ সালে তিনি স্থানীয় শক্তিশালী আরএসপি নেতাকে হারিয়ে লোকসভায় আসেন। ঐতিহাসিকভাবে মুর্শিদাবাদে বিশেষত বহরমপুরে আরএসপির সাংগঠনিক শক্তি ছিল যথেষ্ট। অধীরবাবুর মতো ডাকাবুকো ব্যক্তি সেই ঘাঁটি ভাঙলেন। বহরমপুর পুরসভা দখল করা এবং দীর্ঘদিন তা ধরে রাখা সে-ও ছিল অধীরবাবুর কৃতিত্ব।

এত কথা বললাম এ জন্য যে অধীরবাবু যেভাবেই হোক জেলায় নিজের একটা গণভিত্তি অর্জন করেন। আর দিল্লি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয় সেসব নেতাকে, এলাকায় যাঁদের নিজস্ব প্রতিপত্তি আছে। সেটা হলো এই বঙ্গসন্তানের রাজনীতির পটভূমি। 

এরপর দিল্লি এসেও কিন্তু তিনি দিল্লিতে ধীরে ধীরে নিজস্ব জমি তৈরি করছেন। দিল্লির লাড্ডু সম্পর্কে প্রচলিত জোকস, যে খাবে সে-ও পস্তাবে, যে খাবে না সে-ও পস্তাবে। অধীরবাবু কিন্তু সে লাড্ডুটা সামলেছেন। প্রণববাবুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মনমোহন সিংহের সময় রেলমন্ত্রী হলেন। রেলমন্ত্রী হিসেবেও তিনি যথেষ্ট সক্রিয় রাজ্যমন্ত্রী ছিলেন। এমনিতে দিল্লিতে প্রচলিত ধারণা, রাজ্যমন্ত্রীদের কোনো কাজ থাকে না। অধীরবাবু কিন্তু তাঁর সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জনপ্রিয় হন। দিল্লির মিডিয়াও কিন্তু অধীরবাবু সম্পর্কে বিরূপ নয়।

ক্রমেই তিনি রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। রাহুল গান্ধী আমাকে বলেছিলেন রাজ্যসভাপতির পদ থেকে ভোটের আগে অধীরকে সরাতে চাই না। কারণ ও স্ট্রিট ফাইটার। নেতার স্তরে লড়াকু ব্যক্তি পাওয়া কঠিন। এটা ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে।

তবে আজ এমন একটা সময়ে অধীর চৌধুরী এ দায়িত্ব পেলেন, যখন দেশের অবস্থা খুবই শোচনীয়। অধীরবাবুর নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের এখন ঠিক কী পরিস্থিতি, তা তো কারোরই অজানা নয়। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। আবার গোটা দেশে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে এখনো যে অনুকূল হাওয়া, যেভাবে বিরোধীরা ছত্রভঙ্গ, সেখানে পদত্যাগী রাহুল গান্ধী যে পরিস্থিতিতে অধীরবাবুকে দায়িত্ব দিলেন তা-ও অধীরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এখনো পর্যন্ত যা বাস্তব, তাতে রাহুল গান্ধী আর দায়িত্ব নিতেই রাজি নন। দলেরই কোনো সভাপতি নেই।

প্রিয়াঙ্কা গান্ধী দায়িত্ব নেবেন কি না সেটাও রহস্য। এ অবস্থায় অধীরবাবুর সামনে চ্যালেঞ্জ একটাই, জাতীয় রাজনীতিতে নিজেকে প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। যেভাবে দিল্লি এসে তিনি একদা করেছিলেন। ধাপে ধাপে মন্ত্রী পর্যন্ত হন। কিন্তু এটা অধীরবাবুর জন্যও চ্যালেঞ্জের দ্বিতীয় ইনিংস। দিল্লিতে বাঙালি নেতা আজ বড় কম, অধীরবাবু সফল হবেন কি না সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

 

লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি

মন্তব্য