kalerkantho

ইরান চুক্তি আইএইএ ও কূটনীতি

টনি কার্তালুচ্চি

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইরান চুক্তি আইএইএ ও কূটনীতি

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ তুঙ্গে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান ইউকিয়া আমানোর মৃত্যু ব্যাপক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। বিদ্যমান বিরোধ-উত্তেজনার পারদও চড়েছে। আমানোর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। জুলাইয়ের মাঝামাঝি দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে দায়িত্ব হস্তান্তর করে অবসরে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন তিনি।

গত ১৮ জুলাই বার্তা সংস্থা এএফপি-জেআইজেআইএর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পরমাণু কর্মসূচিবিষয়ক জাতিসংঘের তদারকি সংস্থার প্রধান ইউকিয়া আমানো স্বাস্থ্যগত কারণে আগামী মার্চে পদত্যাগ করবেন বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) তথা ইরান পরমাণু চুক্তিকে অকার্যকর করার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে তাঁর আপত্তি ছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে সন্দেহমূলক কথাবার্তা রটছে—তাঁর মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল অথবা উভয়ের ভূমিকা থেকে থাকতে পারে।

ইরানভিত্তিক তাসনিম বার্তা সংস্থার এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সূত্র অনুমান করছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাবেক প্রধান ইউকিয়া আমানোকে যুক্তরাষ্ট্রের যোগসাজশে হত্যা করেছে ইসরায়েল। কারণ তিনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে নতুন করে বানোয়াট অভিযোগ তোলার ব্যাপারে সম্মত হননি।

যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পররাষ্ট্রনীতির যে ধারা, তাতে পশ্চিমা স্বার্থের বিরুদ্ধাচারী কাউকে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হলেও হত্যার জন্য টার্গেট করা তাদের পক্ষে সম্ভব বলেই মনে হয়। যা হোক, আমানোকে হত্যা করার ধারণার সপক্ষে কোনো সাবুদ কেউ সরবরাহ করেনি। তাঁর মৃত্যু যেভাবেই হয়ে থাকুক, আইএইএ নীতিমালার ওপর বা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র টানাপড়েনে তেমন প্রভাব ফেলবে না।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সদস্য দেশগুলোর স্বার্থের প্রতিফলন ঘটায়। বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটলে এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রভাবের মাত্রায়ও পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ তাদের এজেন্ডায় পরিবর্তন ঘটে।

ইরান চুক্তি অবমাননা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেছে আইএইএ। আসলে এ সমালোচনা আইএইএর নয়, বরং এ সমালোচনা পরমাণু প্রযুক্তি বিষয়ে আইএইএ যেসব দেশের প্রতিনিধিত্ব করে তাদের অভিমতের প্রতিফলন। সমালোচনার বিষয়টি কাকতালীয় নয়; সব দেশের পররাষ্ট্র বিভাগে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা হচ্ছে।

ইউরোপীয় দেশগুলো ইরান চুক্তি টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে বা নিতে চায়। কোনো যুক্তি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে এ চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। এরপর তারা যেসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের ওপর জারি করেছে ইউরোপীয় দেশগুলো তা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। জাতিসংঘে বা আইএইএতে এসব দেশের প্রভাব রয়েছে। তাদের বক্তব্যই প্রতিফলিত হয়েছে আমানোর মন্তব্যে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি ইরান চুক্তি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এ কথা বিবেচনায় নিলে বলা যায়, পরে যে-ই আইএইএর প্রধান হোন, প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান প্রায় একই থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সহযোগীরা এজাতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়মিতই অগ্রাহ্য করে বা এড়িয়ে যায়। এতটা মাত্রায় তারা এ কাজ করেছে যে এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহ্যতা, বৈধতা ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরান চুক্তি অব্যাহত রাখার বিষয়ে আইএইএর কথা যত না গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে ওই সব দেশ কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে এড়িয়ে চলা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতির চর্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যদি আইএইএর শীর্ষপদে তাদের স্বার্থের ধারক কাউকে বসানোর চেষ্টা করে এবং সফল হয়, তাহলে ইরান চুক্তি বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার প্রক্রিয়া আরো ত্বরান্বিত হবে।

ইরান চুক্তির ভবিষ্যৎ আইএইএর হাতে নেই; এটি চুক্তির অন্য স্বাক্ষরকারীদের ওপর নির্ভরশীল। ইরানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আন্তর্জাতিক আইন এড়িয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ইরানের ভেতরে-বাইরে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড—এসবে যদি আইএইএ সমর্থনও দেয় (প্রাসঙ্গিক কারণে হলেও), তাহলেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড চাপা দেওয়ার সুযোগ নেই।

আইএইএর শীর্ষপদে নতুন কেউ নিযুক্ত হলেও ইরান চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তার প্রভাব সামান্যই পড়বে। চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ইরানের বাণিজ্য সহযোগী ও চুক্তির বাকি স্বাক্ষরদাতাদের ভূমিকার ওপর। তারা যদি চায় এবং যদি তারা এ চুক্তিকে অকার্যকর করার ব্যাপারে মার্কিন কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে পারে, তাহলেই ইরান চুক্তি টিকবে। ইরানের নেতৃত্বকে কূটনৈতিক তৎপরতা সর্বোচ্চ মাত্রায় চালাতে হবে। ওয়াশিংটনের চাপের ব্যাপারে দেশটিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। এমন ধারণা সৃষ্টি করতে হবে যে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর জন্য ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা লাভজনক; যুক্তরাষ্ট্রের মর্জিমাফিক বিভাজিত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য লাভজনক নয়।

লেখক : ব্যাংককভিত্তিক ভূ-রাজনীতি বিষয়ক গবেষক ও লেখক

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা