kalerkantho

ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকি, সতর্ক হই

ডা. কামরুল হাসান খান

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকি, সতর্ক হই

দেশের এখন আলোচনার প্রধান বিষয় হচ্ছে ডেঙ্গু রোগ এবং এর ভয়াবহতা। বাংলাদেশের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুমের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ১৫ হাজার ৩৬৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। এ বছর এ সময় পর্যন্ত আটজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। একই সূত্রের তথ্য মতে, গত ১ থেকে ৩০ জুলাই হাসপাতালে ভর্তি হয় ১৩ হাজার ১৮২ জন। এর মধ্যে ১০ হাজার ৯৫৩ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে।

গত বছর (২০১৮) অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল, আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ১৪৮ জন। গত বছর এ বিষয় নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা-পর্যালোচনা লক্ষ করা যায়নি।

বিশ্বজুড়েই ডেঙ্গুর প্রকোপ রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকা এবং এশিয়া অঞ্চলে সর্বোচ্চ প্রকোপ লক্ষ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেশি পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবছর ১১১টি দেশে পাঁচ থেকে ৫০ কোটি মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

আবহমানকাল থেকেই বাংলাদেশে বৃষ্টির মৌসুমে জ্বর, কাশি, সর্দি, মাথা ব্যথা, শরীর ব্যথা নিয়ে কথিত ঠাণ্ডা রোগে আক্রান্ত হয় লাখ লাখ মানুষ। ডাক্তার সাধারণত প্যারাসিটামল ওষুধ সেবন, বেশি বেশি পানি পান এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরামর্শ দিয়ে থাকেন এবং বেশির ভাগ রোগী তাতেই ভালো হয়ে যায়। এ নিয়ে পরে আর কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি।

দেশের ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সচেতন হয়েছে এবং চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধাও বেড়েছে। এর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খুব একটা এ রোগ শনাক্ত করা হয়নি। কিন্তু এডিস মশাও ছিল, রোগও ছিল।

এবার প্রকোপ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পাঁচজন রোগী মৃত্যুবরণ করে। স্বাভাবিকভাবে গণমাধ্যম সতর্ক ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসকরাও জ্বর হলেই হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন। এতে মানুষ সতর্ক হয়ে ডাক্তারের চেম্বারে বা হাসপাতালে ভিড় করে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের বিভ্রান্তিকর ভূমিকা, মশক নিধনের অপর্যাপ্ত কার্যক্রম, ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে ক্ষুব্ধ, হতাশ এবং আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কিছু কিছু অস্পষ্ট এবং ভুল তথ্যও মানুষের আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হবিগঞ্জের সিভিল সার্জনের মৃত্যু পরিস্থিতিকে উসকে দেয়। আমরা নানাভাবে খোঁজ নিয়ে দেখেছি, হবিগঞ্জের সিভিল সার্জনের ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আর ডেঙ্গু রোগীর এ দুই দিনে সাধারণত মৃত্যু হওয়ার কারণ নেই। এ সময়ে ডেঙ্গুসংক্রান্ত যত পরিসংখ্যান এসেছে, সেগুলোর ভিত্তি খুব একটা জানা যায়নি। কিভাবে ডেঙ্গু রোগ শনাক্ত হলো, তার নির্দিষ্ট তথ্য খুঁজে পাওয়া কিছুটা বিভ্রান্তিকর মনে হয়েছে। উপসর্গ এবং প্লাটিলেটের সংখ্যা দিয়ে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা যায় না। এনএস-১ এবং ডেঙ্গু ভাইরাস অ্যান্টিবডি ছাড়া ডেঙ্গু রোগ শনাক্ত করা সম্ভব নয়। এ মৌসুমে অনেক ভাইরাসের কারণে মানুষ একই ধরনের উপসর্গে ভোগে এবং প্লাটিলেটের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে যায়।

ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ আছে। প্রথমবার আক্রান্ত হলে সাধারণত কোনো বড় ধরনের উপসর্গ হয় না। দ্বিতীয়বার অন্য সেরোটাইপ দ্বারা আক্রান্ত হলে বড় ধরনের উপসর্গ হতে পারে। আক্রান্ত রোগীদের ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের (Severe) উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এখন অন্যান্য উপসর্গের পাশাপাশি নাক, চোখ, মুখ, মলের সঙ্গে রক্তক্ষরণ হতে পারে। দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে জ্বরের মাত্রা কম হতে পারে। ডেঙ্গু রোগের সাধারণ চিকিৎসা প্যারাসিটামল ওষুধ এবং শরীরের পানিস্বল্পতা দ্রুত পূরণ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম। Severe পর্যায়ে চিকিৎসাও খুব জটিল নয়; কিন্তু পর্যবেক্ষণ বিশেষ করে Plasma leakage-এর অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

খুব পরিষ্কারভাবে মনে রাখতে হবে, সব জ্বরই ডেঙ্গু নয় এবং প্লাটিলেটসংখ্যা কমে গেলেই ডেঙ্গু নয়। রোগ নির্ণয়ের দায়িত্বটা চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে হবে। চিকিৎসার জন্য এমবিবিএস ডাক্তার যথেষ্ট, জটিল হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

সঠিক কর্মপদ্ধতির জন্য সঠিক পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে হবে। ধারণা থেকে বা উপসর্গ দেখে ডেঙ্গু বলা যাবে না। গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষ যেন পরীক্ষানির্ভর সঠিক চিত্রটি জানতে পারে। তাহলে আতঙ্ক বা হতাশা অনেক কমে যাবে।

জ্বর হলে বা ডেঙ্গু হলে বাড়ি যাওয়া যাবে না—এটি মোটেই সঠিক নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়িতে নিজস্ব মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে, খুব কম বাড়ি আছে, যারা সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার মশক নিধন কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে। এ ছাড়া ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই প্রতিরোধব্যবস্থা গ্রহণ করতে যথেষ্ট সক্ষম। ঈদে মানুষ বাড়িতে যাবেই—ফেরানোর কোনো সুযোগ নেই। তার চেয়ে সতর্কতা অবলম্বন করলেই যথেষ্ট হবে।

বর্তমান সময়ে জরুরি করণীয়—

১। হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিএজেন্ট সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

২। অতিদ্রুত সঠিক ওষুধ ক্রয় করে ব্যাপক মশক নিধন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।

৩। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজের সমন্বয় স্থাপন করতে হবে।

৪। যার যার দায়িত্ব পালন করতে হবে, Duplication-এর প্রয়োজন নেই। চিকিৎসার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থাকবে।

৫। এক কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন সঠিক পরিস্থিতি এবং বাস্তব নির্দেশনার প্রেস ব্রিফিং করতে হবে। বিভিন্ন ব্যক্তি বা সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন মতামত থেকে বিরত থাকতে হবে।

৬। ধারণাভিত্তিক পূর্বাভাস বন্ধ করতে হবে। জনমন অহেতুক আতঙ্কিত হয়—এমন খবর থেকে বিরত থাকতে হবে।

৭। সরকার বা সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে সামাজিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত ব্যাপক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।

যেকোনো রোগেই মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। এ দেশে নানা অসুখে মহামারি হয়েছে। ঝড়, প্লাবন, বন্যায় অসংখ্য মানুষের জীবন গেছে। আমরা সম্মিলিতভাবে যার যার দায়িত্ব পালন করে সেসব প্রতিহত করেছি। ডেঙ্গু রোগে কী করণীয়, তা আমরা সবাই জানি—মৃত্যুর হারও খুবই কম। আতঙ্কিত না হয়ে আমরা সবাই মিলে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে ডেঙ্গু রোগ পালিয়ে যাবে।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য