kalerkantho

মূল্যবোধ পালিয়ে বেড়াচ্ছে

জয়া ফারহানা

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মূল্যবোধ পালিয়ে বেড়াচ্ছে

দিবারাত্রির কাব্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, গৃহকর্মকে সুপ্রিয়া সত্যিই এত ভালোবেসেছে যে মাছের ঝোলের জন্য আলু কুটতে বসলেই তার মনের আঘাত মিলিয়ে আসে। সুপ্রিয়াদের কাল তবু ভালো ছিল। গৃহকর্মে মনের আঘাত মিলিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। এখন এমন এক গ্রহণের কালে আমরা বাস করছি যে গৃহকর্মে ডুবে থাকলেও মনের আঘাত মেলানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। সকালে পত্রিকা খুলে যে পাঠককে একজন নিরীহ তাছলিমা বেগম রেণুকে পিটিয়ে মারার সংবাদ পড়তে হয়, তার আর আলু কুটতে বসলে মনের আঘাত মিলিয়ে যাওয়ার সুযোগ কই? 

দুই.

সভ্যতার ইতিহাস অত্যাচারেরই ইতিহাস। সভ্যতা এমন এক দুর্ভাগ্যজনক সময়ের মধ্য দিয়েও গেছে যখন অত্যাচারকে অবৈধ, অনৈতিক কিংবা অন্যায় পর্যন্ত বলার উপায় ছিল না। সমাজ-সংস্কৃতির মধ্যে অত্যাচারের নৈতিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ঢ়ধমব ফবব নড়রং তার ‘টর্চার অ্যান্ড ট্রুথ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন প্রাচীন গ্রিসে ক্রীতদাসদের কাছ থেকে সাক্ষ্য আদায়ের জন্য কিভাবে তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হতো। মিশেল ফুকো তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ (পেঙ্গুইন ১৯৮৫) গ্রন্থটি শুরুই করেছেন অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফ্রান্সে প্রকাশ্যে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে নৃশংস অমানবিক কায়দায় মানুষ হত্যার বর্ণনা দিয়ে। পনেরো শতকে জোন অব আর্ককে পুড়িয়ে মারার ঘটনাটিও আমাদের তাড়িত করে। তবে ফ্রান্সে প্রকাশ্যে পিটিয়ে যাদের হত্যা করা হতো, তারা ছিল অভিযুক্ত অপরাধী। যেসব ক্রীতদাসকে হত্যা করা হতো তা করা হয়েছিল তাদের সাক্ষ্য আদায়ের জন্য। জোন অব আর্ক তৎকালীন সামাজিক প্রথার বিরোধিতা করেছিলেন বলে হত্যার শিকার হয়েছিলেন। প্রতিটি ঘটনাই নৃশংস, তবু কোনো না কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু তাছলিমা বেগম রেণু হত্যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। রেণু বিপ্লবী নয়। ‘টর্চার অ্যান্ড ট্রুথ’-এর ক্রীতদাস নয়। ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’-এর অপরাধীও নয়। নিতান্ত নির্বিরোধী রেণুর মতো একজনেরও যদি এই নগরে নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে আমরা কে নিরাপদ? আমরাও তো রেণুরই মতো। যেকোনো সময় আমরাও কি তবে রেণুর মতো এমন মবলিঞ্চিনের (গণপ্রহার) শিকার হতে পারি? এই ফোবিয়া নিয়েই আছি। জলে ডেঙ্গুর বিপদ শঙ্কা। ডাঙায় বরং ডেঙ্গুর চেয়েও বড় শঙ্কা! 

তিন.

নারী-শিশু ধর্ষণ এখন আর কোনো খবর নয়, যদি ধর্ষণের পরে গায়ে আগুন বা অন্য কোনো বীভৎস উপায়ে মেরে ফেলা না হয়। ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যাকাণ্ডও প্রায় ডালভাত হয়ে গেছে সংবাদমাধ্যমের কাছে। যখন এসবের সঙ্গে অবিশ্বাস্য কোনো নৃশংসতা, অসম্ভব কোনো হিংস্রতা, অকল্পনীয় কোনো ক্রূরতা যুক্ত হয়, শুধু তখনই তা সংবাদ। এ দেশে মগ, ফিরিঙ্গি, পর্তুগিজ জলদস্যুদের উত্পীড়নের কালে মায়েরা সন্তানদের ঘুম পাড়াতেন ‘বর্গি এলো দেশে’ ছড়া শুনিয়ে। এখন এই ছড়া শোনার সময় সন্তান যদি প্রশ্ন করে বসে বর্গি কারা? তবে এর কী উত্তর দেবেন মা? তিনি কি বলতে পারবেন আমরা নিজেরাই এখন বর্গি। পিটিয়ে মানুষ হত্যা, গণপ্রহারের সঙ্গেও অভিনব সব নৃশংসতা যুক্ত হচ্ছে। একটি সহিংসতা আরেকটিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিস-অর্ডারের মধ্যে আছি। মানুষ আমরা, পাপেটিয়ার তো নই যে প্রতিক্রিয়া হবে না। অবশ্য সত্যিই মানুষ কি না সে প্রশ্নও যে মাঝেমধ্যে মনে আসে না তা নয়। হয়তো সত্যিকারের মানুষ নই, হোমোসেপিয়ান প্রাণী মাত্র। মানুষ হলে চারপাশটা এত অস্থির, অশান্ত, ঝঞ্জাটময় হয় কী করে? এই যে এখন আকাশের ওপর মেঘ নয়, মেঘের ওপর আকাশ ভাসছে সেই মাধুর্য লক্ষ করি না? কেন সোঁদা বাতাসে ঝরাপাতার উদাসী ব্যঞ্জনা লক্ষ করতে পারি না? কেন বর্ষায় শত শত ফুলের উপচে পড়া মঞ্জুরি খেয়াল করি না? আমরা আছি একে অন্যের ছিদ্রান্বষণে। সবার হাতেই একটি করে কাঠি। সবাই আমরা সেই কাঠিটি ঘোরাচ্ছি সবার পিছে। এই হোমোসেপিয়ান প্রাণী আমরা নিজেদের কৃতিত্ব নিয়ে কত বড়াই না করি। বিশ্বায়নের প্রভাবে আমরা একেকজন বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠেছি বলে দাবি করি। বিশ্ব নাগরিক হয়ে ওঠার কিছু আনুষ্ঠানিক আয়োজন করেছি, তবে মানুষ হতে পারিনি। এই যে সামনে দেখছি গেল জুন মাসের বিটিআরসির প্রতিবেদন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, শুধু জুন মাসেই নতুনভাবে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন ১৭ লাখ ৫৪ হাজার সংযোগকারী। শুধু ইন্টারনেট সংযোগেই কোনো নাগরিক গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা বনে যাবে তা নয়। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির যা কিছু ভালো তা গ্রহণ করার একটা মাধ্যম তো ইন্টারনেট। সেখান থেকে তবে আমরা কী শিখছি? ভালো কিছু কি আমরা গ্রহণ করতে পারছি? পেরিয়ে এসেছি সাম্রাজ্যবাদ, পেরিয়ে এসেছি সামন্তবাদ। কিন্তু নৃশংসতার ধরন দেখে তো মনে হয় না আমরা সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ পেরিয়ে এসেছি। এত যে নিজেদের বিশ্ব নাগরিক বলে দাবি করছি, আধুনিক প্রগতিশীল বিজ্ঞানমনস্ক বলে দাবি করছি কিন্তু কই কুসংস্কার তো আমাদের ছাড়েনি। একেকটি হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার ধরন দেখে মনে হয় আমরা আছি আদিম লৌহযুগে। আদিম মানুষেরও তবু কিছু নীতি ছিল। তারা শুধু তাদেরই পিটিয়ে মেরে ফেলত, যাদেরকে নিজেদের থেকে ভিন্নতর নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের বলে মনে হতো। আর গ্লোবাল ভিলেজের আধুনিক মানুষ ঠিক তারই মতো আরেকজন মানুষকে মেরে ফেলছে। কোনো প্রাণীকেই মানুষ পিটিয়ে হত্যা করতে পারে না। অথচ মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে অবলীলায়। নাহ্, এসব হত্যার যে সামাজিক মনস্তত্ত্বের ব্যাখ্যা পড়েছি তার কোনো ব্যাখ্যাই সন্তোষজনক, গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি।

চার.

সমাজ রূপান্তরের বিশেষ কোনো পর্বকে যদি বলা হয় আধুনিকতা, তবে সেই আধুনিকতার কিছু কিছু লক্ষণ এই সমাজেও দৃশ্যমান। প্রায় প্রত্যেকের হাতে স্মার্টফোন। পুঁজি ও প্রযুক্তির বিশ্বায়নে বিভিন্ন দেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য লোপ পেয়েছে। প্রত্যেকে হয়ে উঠেছে গ্লোবাল ভিলেজের বাসিন্দা। এতে নাকি মুছে গেছে ধনী ও দরিদ্র দেশের বেড়া। যদি বলি আসলে মুছেছে আমাদের প্রয়োজনীয় মূল্যবোধের বেড়া, যা ছিল আমাদের রক্ষাকবচ, তাহলে কি ভুল বলা হবে? সাম্যবাদকে ছুড়ে ফেলা গেছে বলে যাঁরা আপ্লুত ছিলেন, তাঁরা টের পাচ্ছেন বিশ্বায়নের ফল শুভ হয়নি? পুঁজিতন্ত্রও ছুড়ে ফেলার মতো একটি তন্ত্র? পুঁজির বিশ্বায়নে ধনী দেশের মুনাফা বেড়েছে, কমেছে গরিব দেশের মূল্যবোধ। এখনো কি মনে হচ্ছে আমাদের প্রাচীন-ঐতিহ্যবান মূল্যবোধগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন ছিল?

পাঁচ.

আদিম মানুষ ঘুড়ি ওড়াত। তাতে থাকত বিচিত্র সব টোটেম, দেব-দেবতার চিত্র। আদিম মানুষ ভাবত, আকাশে দেব-দেবতারা ঘুড়িতে তাদের ছবি দেখলে খুশি হয়ে রোগবালাই এবং বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি দেবে মানুষকে। বিশ্বায়নের এই কালে এসেও সব সমস্যার সমাধানের জন্য নির্ভর করতে হচ্ছে নিয়তির ওপর। ডেঙ্গুর জন্য কেনা লিমিট লিকুইড ইনসেকটিফায়েড কাজ করছে না? তবে ডেঙ্গু থেকে মুক্তির উপায় কী? যবে ডেঙ্গু মৌসুম শেষ হবে, তবেই মিলবে মুক্তি। মানুষ কবে মানুষ হয়ে উঠবে? এখানেও শেষ ভরসা সেই নিয়তি।

লেখক : কথাশিল্পী

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা