kalerkantho

আমাদের বড় সমস্যা দুর্নীতি

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমাদের বড় সমস্যা দুর্নীতি

আমাদের অর্থনীতি আজ ঊর্ধ্বমুখী। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। আমরা অনেক পণ্য এখন রপ্তানি করছি। এত কিছুর পেছনে যাদের অবদান তারা আমাদের কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষ। কিন্তু তারা কঠোর পরিশ্রম করে ফসল ফলালেও ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না। বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে আমাদের রেমিট্যান্সকে সচল রাখছে। একঝাঁক তরুণ তারা তথ্য-প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের ব্যবসায়ীদের অবদানও কম নয়। তারা দেশের কর্মসংস্থানে অবদান রাখছে। কিন্তু এর পরও আমাদের যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা, তা হচ্ছে না। তার অন্যতম কারণ দুর্নীতি। দুর্নীতি মোকাবেলায় আমরা কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিলেও কোনোভাবেই দুর্নীতি কমাতে পারছি না; বরং বেড়েই চলছে।

স্বাধীনভাবে কাজ করার মাধ্যমে দুর্নীতি কমিয়ে আনার এক বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদককে মনে করা অবান্তর নয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ায় দুর্নীতি লাগামহীনভাবে বেড়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে দুদকের কর্মকাণ্ডের মধ্যে তেজিভাব লক্ষ করা যায়। তারা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানকাজ পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি ঢাকা ওয়াসার দুর্নীতি অনুসন্ধান করতে গিয়ে ১১টি উেসর সন্ধান পায় এবং তারা ১২টি সুপারিশ করে। তাদের তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রকল্পের ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি, অপচয়, সঠিকভাবে কাজ না করাকে দুর্নীতি হিসেবে দেখানো হয়। এর আগে তারা রেলওয়েতে প্রায় একই ধরনের দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে। দুদক দৃশ্যমান কিছু কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে; কিন্তু তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে সরকার নড়েচড়ে না বসলে দুর্নীতি দূর হবে কিভাবে। 

আমরা বেশ কয়েক বছর দুর্নীতিতে এক নম্বর ছিলাম কিন্তু বর্তমানে সূচকে কিছুটা উন্নতি হলেও তার অর্থ এই নয় যে আমরা দুর্নীতি দমনে সফল হয়েছি। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের প্রতি পদে পদে দুর্নীতি। কোথাও আর্থিক, অন্যত্র অন্য রকম। মোটা দাগে দুর্নীতির বড় দুটো ক্ষেত্র রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প আর মানুষের সেবা খাতে দুর্নীতি। উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতিতে রাষ্ট্রের বড় ক্ষতি হয়, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ জনগণের ওপর। মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবনমানের ওপর এর প্রভাব অপরিসীম। বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি বর্তমানে কম থাকায় জনগণের কষ্টার্জিত আয়ের ওপর কর ও অন্যান্য উৎস থেকে আসা অর্থে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা যখন দুর্নীতির মাধ্যমে কিছু মানুষের কাছে চলে যায়, তখন উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। সেবা খাতের দুর্নীতিতে জনগণ সরাসরি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। কোনো একটি সেবা পেতে হলে ঘুষ দিতে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি ঘুষ না দেবেন, আপনার কাজ হবে না। এতে জনগণ সরাসরি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। হয়তো কোনো কোনো সেক্টরে আপনি ধৈর্য ধরলে কিংবা বড় ব্যক্তি হলে ঘুষ ছাড়া আপনার কাজ হবে কিন্তু আপনাকে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এর মধ্য দিয়ে আপনার অনেক ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে। বেশির ভাগই সাধারণ ধারণা থেকে সাত-পাঁচ না ভেবে ঘুষ দিয়েই সেবা নিয়ে থাকে। আমাদের ধারণা ছিল সব কিছু ডিজিটাল হওয়ায় দুর্নীতি কমে আসবে কিন্তু তা আমরা লক্ষ করছি না। সরকার সব সেবা খাতকে ডিজিটাইজ করার পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে দুর্নীতি কতটুকু কমবে তার জন্য আমাদের আরো অপেক্ষা করতে হবে।

দুর্নীতি শুধু আর্থিকই নয়, দায়িত্বে অবহেলা, জবাবদিহি না করাও দুর্নীতিভুক্ত। নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করাও দুর্নীতির মধ্যে পড়ে। শিক্ষকদের হয়তো আর্থিক দুর্নীতির সুযোগ কম কিন্তু শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো পাঠদান না করা, রীতিমতো ক্লাস না নেওয়া, প্রাইভেট টিউশনিতে লিপ্ত থাকাও দুর্নীতির মধ্যে পড়ে। খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের কারো কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। আরো রয়েছে তদন্তের অবহেলা কিংবা ভুলের কারণে একজন নিরপরাধ ব্যক্তির দীর্ঘদিন কারাভোগের অভিযোগ। একটি স্বাধীন কমিশন হিসেবে দুদকের কর্মকাণ্ড এমন হওয়ার কথা নয়। আমরা দুদককে আরো দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ডের মধ্যে দেখতে চাই। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গীকার ছিল দুর্নীতির জন্য জিরো টলারেন্স। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সেক্টর ও মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির বড় বড় অভিযোগ ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। আমরা সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন চাই। শুধু অনুসন্ধান ও সুপারিশই যথেষ্ট নয়, সুপারিশগুলো যেন নিজ নিজ মন্ত্রণালয় গুরুত্ব সহকারে নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করে, নইলে কখনো দুর্নীতি দমন করা সম্ভব হবে না।     

লেখক: অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য