kalerkantho

মানবতার ওই মিছিলটা গেল কোথায়

রেজানুর রহমান

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানবতার ওই মিছিলটা গেল কোথায়

আমাদের অনুভূতির জায়গাটি কি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে? আমরা কি দেখেও না দেখার ভান করছি? মানুষ মানুষের জন্য এই বিশ্বাস কী এখন মানুষের প্রতি করা যায়? অতীতকালে দেখা যেত বন্যা, ঝড়, মহামারি অথবা এজাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন পরিস্থিতি মোকাবেলায় তৎপর হয়ে উঠত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রী ও সংস্কৃতিকর্মীরা পথে নামত, ক্যাম্প গঠন করে সাধারণ মানুষকে ভালো-মন্দ বোঝাত। শিল্পীরা গান গেয়ে মোটিভেশনাল স্পিচ দিতেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, পথনাটক পরিষদসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন কখনো এককভাবে অথবা যৌথ প্রক্রিয়ায় মানুষের পাশে দাঁড়াত। দেশের একটি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। ঢাকাসহ গোটা দেশে ডেঙ্গু রোগ বলা যায় মহামারি আকারে রূপ নিয়েছে। অথচ এ ব্যাপারে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিশেষ করে জোটভুক্ত সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে অনেকেই যেন নির্বিকার। দেরিতে হলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ঢাকায় পথসভা করার কর্মসূচি শুরু করেছে। অভিনয়শিল্পী সংঘের ব্যানারেও পৃথক কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে অন্য সংগঠনগুলোর এ ব্যাপারে কোনোই তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে না। ফলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অতীতকালে দেশে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেই সবচেয়ে সরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে সংস্কৃতিকর্মীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ক্যাম্প গঠন করে পরিস্থিতি মোকাবেলার লক্ষ্যে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হতো। এবার যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু কেন? প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ দেশের সব সংকট মোকাবেলায় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সংগঠিত করে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। অতীতকালে দেখা গেছে, দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকেই জনসচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি শুরু হতো। এবার যেন অবস্থাটা ভিন্ন। ডেঙ্গুর থাবায় রাজধানী শহর এই যে এত ভীতিকর হয়ে উঠেছে, সে জন্য তো সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সোচ্চার ভূমিকা নেওয়ার কথা। অতীত সময়ের তুলনায় এবার যেন চিত্রটাই ভিন্ন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্যাপারে অনেকেরই যেন তাড়না নেই। মায়া নেই। মমতাও নেই। পরিস্থিতি দেখেও না দেখার ভান করছেন অনেকে।

উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধাসহ বিস্তৃত অঞ্চলের বন্যার কথা না-ই বা বললাম। আমাদের মানসিকতাটাই এমন—ঢাকা ও এর আশপাশের মানুষ আক্রান্ত না হলে আমরা সেটাকে কোনো দুর্যোগই ভাবি না। বন্যায় ঢাকা আক্রান্ত হলে ঠিকই সবাই সরব হতো। টিএসসির ভেতর ক্যাম্প বসত। রাস্তায় হারমোনিয়াম নিয়ে নেমে পড়ত সংস্কৃতিকর্মীরা। ঢাকায় বন্যা হয়নি। কিন্তু বন্যার চেয়ে আরেক মহাদুর্যোগে পড়েছে ঢাকার মানুষ। এ জন্য সুচিকিৎসার পাশাপাশি মোটিভেশনাল কার্যক্রমও দরকার। বিপদে সাধারণ মানুষ সাহস চায়। এমন যদি হতো, প্রতিটি ছাত্রসংগঠনের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে নির্দেশ জারি হয়েছে যে পড়াশোনার পাশাপাশি তোমরা নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পরিষ্কার রাখো। ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করো। বোধকরি তাহলেই ভীতিকর পরিবেশ দূর হতো। পাঠক, ভাবুন তো একবার শুধু ডেঙ্গু প্রতিরোধে সারা দেশে নিজ নিজ বাসস্থান, স্কুল-কলেজ, মাদরাসাসহ সব অফিস-আদালতের চারপাশ পরিষ্কার রাখার ক্ষেত্রে একটা সমন্বিত কর্মসূচি শুরু হলো। পাড়া-মহল্লায় জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র চালু হলো। তাহলে পরিবর্তন কি আসবে না। এ জন্য কী অর্থ লাগবে, না অর্থ লাগবে না? শুধু প্রয়োজন একটি ঘোষণা। কে দেবে সেই ঘোষণা? বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন অথবা সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ জোটবদ্ধ হয়েও এ ঘোষণা দিতে পারে। সে জন্য কাউকে না কাউকে উদ্যোগী তো হতেই হবে। বহু বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ অর্থাৎ ডাকসু সচল হয়েছে। এ ঘোষণার দায়িত্ব তো ডাকসুও নিতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের ভূমিকাও কম নয়। নাটক, সিনেমা দেখার জন্য আমরা সাধারণ মানুষকে মাঝেমধ্যেই আহ্বান জানাই। কিন্তু সাধারণ মানুষের সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের সম্পর্ক কী আদৌ সুন্দর? কেন নাটক ও গান শুনতে আসবে তারা। বিপদের সময় আমরা কি তাদের পাশে আদৌ দাঁড়াচ্ছি? অর্থ সহায়তা দিতে না পারি; কিন্তু বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ালেও তো তারা সাহস পায়। একক উদ্যোগের যে কাজটা কঠিন, যৌথ উদ্যোগে সেটাই সহজ। রাস্তায় এককভাবে দাঁড়িয়ে কেউ যদি বলে, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলবেন না...তাকে অন্যরা গুরুত্ব দেবে না। হয়তো পাগল বলবে। আর যদি একই কথা অনেক লোক যৌথভাবে বলে, তার মানে দাঁড়ায় ভিন্ন। কথাটা তখন গুরুত্ব পায়।

অবশেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন স্বীকার করেছেন যে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ পরিস্থিতির মোকাবেলা করবেন বলে নতুন করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। কাউকে দোষারোপ না করে ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে সবার ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ প্রয়োজন। এককভাবে উদ্যোগ নিলে ডেঙ্গু সমস্যার কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন যৌথ উদ্যোগ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। তাই বলে কি আমরা বসে থাকব? সরকারের কর্মসূচির সঙ্গেও তো আমরা সম্পৃক্ত হতে পারি। যৌথ কণ্ঠে তো বলতে পারি, আসুন, আজ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখি। কালের কণ্ঠেই পড়লাম দেশের ৫৯ জেলায় ডেঙ্গু হানা দিয়েছে।

বিভিন্ন হাসপাতালে ১৫ হাজার ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। কাজেই এ দুর্যোগ মোকাবেলায় একটা সমন্বিত মোটিভেশনাল কর্মসূচির প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মানবতার পক্ষের ওই মিছিলটা গেল কোথায়? এ কথা ভেবে আসুন সমবেত হই। মানুষ মানুষের জন্য—এ বিশ্বাসটাকেই অর্থবহ করে তুলি।

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক-আনন্দ আলো

 

মন্তব্য