kalerkantho

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

ডা. ফেরদৌস খন্দকার

১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডেঙ্গুর ভয়াবহতা, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা

বিশেষ করে, প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। কখনো কখনো এই রোগের প্রকোপ মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, নেয় ভয়াবহ আকার। চলতি বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুর যে মাত্রা দেখা যাচ্ছে, তা অনেকের মনেই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে এই রোগে আক্রান্ত মানুষ ও মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। ডেঙ্গু রোগের হাত থেকে বাঁচার অন্যতম উপায় হলো রোগটি প্রতিরোধ। রাষ্ট্রের তো অবশ্যই এ নিয়ে দায়িত্ব রয়েছে, সেই সঙ্গে নাগরিকদেরও অনেক কিছু করণীয় আছে।

ডেঙ্গু এডিস মশাবাহিত একটি রোগ, যেটি ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত।  রোগটি চার ধরনের হতে পারে। টাইপ এক থেকে চার পর্যন্ত। যদি কারো একবার টাইপ ওয়ান হয়ে থাকে, তাহলে আর একই ধরনের হবে না। তবে অন্য রকম হতে পারে। সাধারণত এমনটিই হয়ে থাকে। তবে যদি এক রকমের ডেঙ্গু হয়, তাহলে পরের টাইপটি হয় মারাত্মক।

আগেই বলেছি সাধারণত গ্রীষ্মকালে এই রোগ দেখা যায়। ট্রপিক্যাল কান্ট্রিগুলোতে সাধারণত এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। যেমন মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে বেশি হয়। এর মধ্যে রয়েছে মেক্সিকো, বেলিজ ও কোস্টারিকা। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশ এই চেইনেও ডেঙ্গুর বিস্তার রয়েছে। সাধারণত এডিস মশা বেশি উচ্চতায় যেতে পারে না, যে কারণে আমরা সমতলভূমিতে এই রোগ  বেশি দেখে থাকি; যেখানে পানি বেশি থাকে। সাধারণত মশার কামড়ে এটি হয়ে থাকে। তবে মনে রাখবেন, শারীরিক মেলামেশায় এটি ছড়ায় না। একই সঙ্গে বুকের দুধ খাওয়ানোর মধ্য দিয়েও ছড়ায় না।

ডেঙ্গু ও এর লক্ষণ : তিনটি ভাগে এই রোগের লক্ষণকে ভাগ করা যেতে পারে—এসিমটোমেটিভ অর্থাৎ কোনো লক্ষণ ছাড়াই ডেঙ্গু হয়ে গেছে। আপনি টেরও পাননি। মাইল্ড সিম্পটম বা ফ্লু লাইক সিম্পটম। এতে মনে হবে জ্বর জ্বর, সর্দি-কাশি, প্রচণ্ড ব্যথা, ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর হতে পারে। লিম্পনোট ফুলে যাওয়া, গ্ল্যান্ট ফুলে যাওয়া, গিরায় গিরায় ব্যথা, স্কিনে র‌্যাশ হতে পারে। ব্রুচ হতে পারে। চামড়ার নিচে রক্তক্ষরণও হতে পারে। আর সিরিয়াস লক্ষণের মধ্যে যেটি রয়েছে, সেটি হেমোরেজিক ফিবার। অর্থাৎ শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়া শুরু হবে। নাক দিয়ে রক্ত, গলা দিয়ে রক্ত, কাশির সঙ্গে রক্ত, পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাবে। জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, পেট ফুলে যাওয়া, যেখানে পানি চলে আসবে। আরেক ধরনের লক্ষণ, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। অর্থাৎ শরীর থেকে এতই পানি চলে গেছে, ব্লাড প্রেসার আর ধরে রাখতে পারেনি শরীর। আইসিইউতে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে তখন। এই লক্ষণগুলো দেখলে সাবধান হতে হবে। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। মেডিক্যালের ভাষায় ডেঙ্গুর তিনটি পর্যায় রয়েছে। ফেব্রায়েল ফেজ। প্রথম পর্যায়। শরীরে ব্যথা। পরের ধাপটি হচ্ছে ক্রিটিক্যাল ফেজ। যেমন—রক্তক্ষরণ, ক্যাপিলারে লিক হচ্ছে, ব্লাড প্রেসার কমে যাওয়া। লাস্ট স্টেজ হচ্ছে ডেফারওয়েজ। মানে সব চলে গেছে, এখন রোগটি থেকে সেরে ওঠার পালা।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা : কিছু লক্ষণ দেখলে ডেঙ্গু রোগের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা নিতে হবে। যেমন—পেট ফুলে যাওয়া। অর্থাৎ পেটের মধ্যে পানি চলে এসেছে। শরীরে ব্লাড ভ্যাসেলের মধ্যে পানি নেই, এটি পেটে চলে এসেছে। এটিকে আমরা বলি অ্যাসাইটিস। আবার পেট ফুলে যেতে পারে, যদি লিভারে প্রদাহ হয়। ক্রমাগত বমি হচ্ছে, থামছেই না। সেটিও একটি সিরিয়াস বিষয়। শরীরের বিভিন্ন অংশে পানি জমে যাওয়া। যেমন—জয়েন্টে পানি জমে যাওয়া, ফুসফুসে পানি জমে গিয়ে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্তক্ষরণ হলেও সতর্ক হতে হবে। রক্তের মধ্যে অণুচক্রিকা বা প্লাটিলেট কমে যাওয়াও মারাত্মক একটি বিষয়। আবার রক্তকণিকায় হিমোগ্লোবিন হিমাটোক্রিট বেড়ে যেতে পারে। এগুলো হচ্ছে ওয়ার্নিং সাইন। এগুলো দেখলে অবশ্যই ভালো কোনো হাসপাতালে দ্রুত যেতে হবে।

ডেঙ্গু থেকে নানা জটিলতা : মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্গে প্রদাহ হতে পারে। ব্রেইনে যদি প্রদাহ হয়, যেটিকে মেনিনজাইটিস এনসেফালাইটিস বলি আমরা। ফুসফুসের চারপাশে যদি পানি জমে, যাকে প্লুবাল ইফিওশন বলি। শ্বাসকষ্ট হতে পারে। হার্টের মাসলে প্রদাহ মায়োকাডেটিস চেস্ট পেইন, শ্বাসকষ্ট, শক হতে পারে। শরীর ফুলে যেতে পারে। জয়েন্টগুলোতে ব্যথা হতে পারে। রক্তক্ষরণ হবে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে। সেটি শরীরের ভেতরেও হতে পারে, সেটি বাইরে দৃশ্যমানও হতে পারে। এসব জটিলতা ডেঙ্গু আক্রান্তকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।

ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা : সেই অর্থে ডেঙ্গু রোগের তেমন কোনো চিকিৎসা এই মুহূর্তে নেই। তবে কিছু বিষয় জেনে রাখলে হয়তো নিজেদের এই রোগ থেকে বাঁচানো সম্ভব। প্রথমত, প্রতিরোধ করাই ভালো। এর জন্য কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যদি জ্বর এসেই যায়, তাহলে প্রচুর পানি খেতে হবে। অ্যাসিটামিনোফেন বা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট খেতে হবে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খাওয়াই ভালো। ডেঙ্গু হলে আমরা মরটিন, আইবুপ্রোফিন বা অ্যাসপিরিনের মতো ওষুধগুলো খেতে নিষেধ করি। কেননা এগুলো থেকে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবারও বলছি, প্রচুর পানি খাবেন। জ্বরটি নিয়ন্ত্রণে রাখুন। তাহলেই হবে।

কিভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করবেন : এখন পর্যন্ত এই রোগের কোনো ভ্যাকসিন তৈরি হয়নি। তার পরও প্রতিরোধব্যবস্থা নিতে হবে। মশা থেকে দূরে থাকতে হবে। মশারির ভেতরে থাকাই ভালো। মশার নিয়ন্ত্রণও জরুরি। বাইরে গেলে ফুলহাতা জামা পরে যাওয়া উচিত। ডেঙ্গুপ্রবণ জায়গায় হাফপ্যান্ট ব্যবহার পরিহার করুন। পুরনো টব, ডোবা, নালা পরিষ্কার করতে হবে। ডাবের খোসা, পুরনো ক্যান হয়তো কোথাও পড়ে রয়েছে, আপনি খেয়ালই করেননি। সেগুলো থেকেও মশার বিস্তার হতে পারে। যেখানে পানি জমে থাকে, সেই পানি সরিয়ে ফেলা উচিত।

আরো কিছু পরামর্শ : ১. বাসার চারপাশে নেট দিয়ে রাখা। ২. আমেরিকা বা ইউরোপ থেকে মশা প্রতিরোধক স্পেশাল স্প্রে নিয়ে যেতে হবে, যা বিভিন্ন ফার্মেসিতে পাওয়া যায়। এর জন্য কোনো প্রেসক্রিপশন প্রয়োজন হয় না। বিশেষ রকমের তেল পাওয়া যায়, সেটিও মাখতে পারেন। ৩. ফুল স্লিভ জামা পরতে হবে। ফুলপ্যান্ট পরে থাকাই ভালো। ৪. কোনো ধরনের জ্বর হলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। চিকিৎসক যদি বলেন, ভাইরাস জ্বর এবং এর পরও যদি তিন দিনে সেটি না কমে, আবার চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। ৫. যেহেতু এখনো এই অসুখ ঢাকা এবং বড় বড় শহরকেন্দ্রিক, গ্রামে থাকার প্ল্যান থাকলে, সেটি আগেই সেরে নিন। তত দিনে মশার প্রাদুর্ভাব কিছু কমে আসবে। ৬. আমেরিকায় মশা প্রতিরোধক লাইট পাওয়া যায়। সেগুলো আশপাশে রাখবেন। ৭. সঙ্গে প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ রাখবেন। জ্বর যদি আসে, প্যারাসিটামল বা অ্যাসিটামিনোফেন-জাতীয় ওষুধ ছাড়া প্রাথমিকভাবে অন্য কোনো ওষুধ খাবেন না। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এমনিতেই আসবে আবার এমনিতেই চলে যাবে। মাঝখানের সময়টুকু কিভাবে সতর্কতার সঙ্গে পার করা যায়, সেটিই হবে চ্যালেঞ্জ। ৮. ভালো হাসপাতালে চিকিৎসা নেবেন। ঢাকায় বেশ কিছু ভালো হাসপাতাল রয়েছে, নাম বলছি না, যেসব হাসপাতালে পাশ্চাত্যের মতোই চিকিৎসা দেওয়া হয়। যদিও খরচ একটু বেশি, তার পরও আমি মনে করি, তাদের অধীনেই থাকা উচিত। যদি কোনো জটিলতা হয়, তাহলে তারাই বেটার ম্যানেজ করতে পারবে। ৯. দেশে যাওয়ার সময় অবশ্যই আপনার এবং আপনার শিশুর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে যাবেন, যেন যেকোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হলে সরাসরি যোগাযোগ করে পরামর্শ চাইতে পারেন।

লেখক : বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা