kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

প্রিয়া সাহার বক্তব্যে ষড়যন্ত্রের আভাস

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রিয়া সাহার বক্তব্যে ষড়যন্ত্রের আভাস

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো। বিগত দীর্ঘ সময়ে বড় ধরনের কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। আর এ অবস্থা কিংবা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও সতর্কতার ফলে। আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জিত সারা দেশে যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সুবাতাস বইছে, সেটিকে সরকারবিরোধীরা ভূলুণ্ঠিত করতে চায়। আমাদের দেশে যে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র হচ্ছে, তা আমরা সরকারের উচ্চমহলের বক্তব্য থেকে প্রায়ই শুনতে পাই। ষড়যন্ত্রের শঙ্কা আছে এ জন্যই সরকারের পক্ষ থেকে সদা সজাগ ও সতর্ক অবস্থান তৈরি হয়েছে। এমন সতর্কাবস্থার মধ্য দিয়েও নানা অসতর্ক পরিস্থিতি আমাদের ভাবিয়ে তোলে। এ কথা সত্য যে ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে এখনো বাংলাদেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র থামেনি। বিশেষ করে যখনই বাংলাদেশ উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পথে ধাবিত হয়, ঠিক তখনই কোনো না কোনো ষড়যন্ত্র শুরু হয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিগত সাড়ে ১০ বছরে বাংলাদেশে নানা সেক্টরে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুত্, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থা থেকে শুরু করে তথ্য-প্রযুক্তিসহ সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণ।

কিন্তু গত ১৬ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হোয়াইট হাউসে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশি নাগরিক প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যে ধরনের মন্তব্য পেশ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে উসকানিমূলক এবং গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। দীর্ঘদিনের ভিন্ন ভিন্ন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা থেকে সৃষ্ট এমন পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের বিরোধী শক্তি, যারা নানা সময়ে বর্তমান সরকারের পতন চায়, বিশ্ব মাতবরদের তাদের চেতনার পক্ষে আনার কৌশলগুলোর অন্যতম; এই কৌশল সরকার উত্খাতের গভীর ষড়যন্ত্র কি না এ বিষয়ে যথেষ্ট ভাবার সুযোগ রয়েছে। প্রিয়া সাহা ভুলভাবে ভুল তথ্য দিয়ে গোটা জাতির মাথাকে অবনত করেছে। সংগত কারণেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ইস্যুটি ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে এ বিষয়টি যথেষ্ট উসকানিমূলক হওয়া সত্ত্বেও কোনো সহিংসতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। এটিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকার অন্যতম দৃষ্টান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্মেলনের প্রতিনিধিদের সামনে হোয়াইট হাউসে প্রিয়া সাহা বলেন, এরই মধ্যে তিন কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু ‘ডিস-অ্যাপেয়ার্ড’ বা নিখোঁজ হয়ে গেছে। এখন যে এক কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু আছে, তাদের রক্ষায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চান। প্রিয়া সাহার দাবি অনুযায়ী ৩৭ মিলিয়ন বা তিন কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু নিখোঁজ হয়েছে এবং এক কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু অস্তিত্ব সংকটে আছে। বাংলাদেশ সৃষ্টির সময় এ দেশে তিন কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘু ছিল কি না তা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে যথেষ্ট প্রশ্ন উঠেছে। গত ২১ জুলাই কালের কণ্ঠ’র ‘বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচার’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। ওই সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘১৯৭০ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল ১৯ থেকে ২০ শতাংশ। সে সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটি। তাতে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা ছিল দেড় কোটির মতো। তাহলে এই বিপুলসংখ্যক নিখোঁজের ঘটনা কবে, কখন ঘটল, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে?’ এ প্রশ্নগুলোর উত্তর পাঠকরা নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থান যেকোনো সময়ের চেয়ে যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক—এ কথাটি সর্বজনস্বীকৃত। বাংলাদেশে প্রায় ৯০ শতাংশই মুসলিম, বাকি ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মের লোক। জাতি, ধর্ম ও ভাষার পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশে তাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সাধারণত বিঘ্নিত হয়নি। নৃ-গোষ্ঠীগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। যেমন—উত্তরে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী আর পার্বত্যাঞ্চলে চাকমা, মারমা, মুরং, হাজং প্রভৃতি বসবাস করে। যুগ যুগ ধরে পারস্পরিক প্রতিবেশীস্বরূপ সমপ্রীতির সঙ্গে বাঙালিদের পাশাপাশি বসবাস করছে তারা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে পাওয়া বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানকে পাল্টে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। অসামপ্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে পরিবর্তন করে জেনারেল জিয়া-এরশাদ ও খালেদা গং। বাংলাদেশকে একটি সামপ্রদায়িক ও জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত করার পাঁয়তারাও শুরু হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরে এসেই বাংলাদেশে হারিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আর রাজনীতিতে অসামপ্রদায়িক সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার সংগ্রামের সূচনা করেন। তাঁর সরকার ধর্মভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতির বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করেন।

বিশেষ করে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের আওয়ামী লীগের বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে এই সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা হয় এবং পুনর্বাসন করা হয় নানাভাবে। অন্ততপক্ষে আমরা লক্ষ করেছি, কোনোভাবেই সংখ্যালঘুদের জামায়াত-বিএনপি তথা বর্তমান সরকারবিরোধী বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায় না। এমনকি এই সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুরা নানাভাবে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে। এ কারণেই হয়তো আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে চলে গেলে সংখ্যালঘুরা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়। যেমনটি আমরা লক্ষ করেছি ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর। বলা যায়, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০১ সালে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। অবশ্য এ কথা সত্য যে বর্তমান সময়েও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো খুব বেশি উল্লেখযোগ্য নয়। সংঘটিত বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো প্রিয়া সাহা কর্তৃক উত্থাপিত তথ্যের সঙ্গে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে বিভিন্ন ধর্মের লোকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধান সবাইকে যেকোনো ধর্ম গ্রহণ, চর্চা ও পালন করার অধিকার দিয়েছে। আরো বলেছে, প্রত্যেক ধর্মীয় সমপ্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করার অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের মধ্যে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ ও জন্মস্থানভেদে কোনো প্রকার বৈষম্য করবে না। স্বাধীনতার পর থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর তেমন কোনো বড় ধরনের ধর্মীয় বা জাতিগত আঘাত আসেনি। বাংলাদেশ তার অমলিন সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক সাম্যের জন্য সব রাষ্ট্রের কাছে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আইন প্রয়োগকারী সব কর্তৃপক্ষ সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা প্রতিরোধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ ব্যাপারে তারা কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সব ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদের উৎসবগুলোকে শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপন করছে। বিভিন্ন ধর্ম ও সমপ্রদায়ের লোকদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও বন্ধন দিন দিন সুদৃঢ় হয়েছে। ধর্মীয় ও সামপ্রদায়িক কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ ও সংঘাত থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির বন্ধন ধরে রেখেছে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

মন্তব্য