kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

ব্রিটেন ও ইরান ব্যর্থদের লড়াই

অনলাইন থেকে

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ‘এটা একটা ভয়ংকর খেলা।’ তিনি ব্রিটেনের প্রতি গত সপ্তাহে জিব্রাল্টারে আটক ইরানি ট্যাংকার ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। ইরানি তেলের ট্যাংকার আটকে জিব্রাল্টার কর্তৃপক্ষ ব্রিটিশ নৌবাহিনী গত সপ্তাহে সহায়তা করে। তবে ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট করে জানান, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তৃতীয় কোনো শক্তির পক্ষে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।

জাতিসংঘের পরমাণুবিষয়ক নজরদারি সংস্থা আইএইএর প্রধান মোহামেদ এলবারাদেই ইরাকে হামলার আগের পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়ে তীক্ষ সতর্কতা উচ্চারণ করে বিবিসিকে বলেন, ‘এখন যা শুনতে পাচ্ছি তার প্রায় সবই ইরাক যুদ্ধের আগেও শুনেছিলাম।’ ইরানি প্রশাসনের রেকর্ড ঘরে এবং অঞ্চলে খুব একটা সুবিধার নয়। তবে এই সংকটের সূচনা তাদের তরফ থেকে হয়নি। এটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ধ্বংস করে দেওয়ার গোঁয়ার্তুমির কারণে সৃষ্টি হয়েছে। ওই চুক্তিটি ইরান মেনে চলছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের পর তাঁদের অর্থনীতি চরম পরিস্থিতির মধ্যে গিয়ে পড়ে। এটি তেহরানে কট্টরপন্থীদের অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় করেছে। তারা এমনিতেই ‘যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না’ বলে প্রচারণা চালিয়ে বেড়ায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত তাদের হাতে জুতসই অস্ত্র তুলে দিয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন শক্ত অবস্থান নিতে শুরু করলেও তারা ঠিক কী চাইছে, তা স্পষ্ট নয়। জন বোল্টন ইরানের ক্ষমতাসীনদের পরিবর্তনে যতটা আগ্রহী, ট্রাম্পকে ঠিক ততটা মনে হয় না। তিনি ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়াতেও আগ্রহী নন। কারণ বিষয়টি তাঁর পুনর্নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাগড়া দিতে পারে। গত মাসে একেবারে চূড়ান্ত সময়ে পৌঁছার পর তিনি ইরানের ওপর একটি বিমান হামলা বাতিল করে দেন। আবার অন্তত এই মুহূর্তের জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফকে কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এসেছেন তাঁরা। এতে সংলাপের সুযোগটুকু অন্তত রক্ষা পেয়েছে।

ইউরোপ জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশনকে (জেসিপিওএ) রক্ষার প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ওই তৎপরতা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এর আগে গত বুধবার তারা জানায়, হরমুজ প্রণালিতে ব্রিটেনের রাজকীয় নৌবাহিনী একটি তেলের ট্যাংকার আটক করার ব্যাপারে ইরানের চেষ্টার কথা জানায়। তেহরান এ অভিযোগ নাকচ করে দেয়। কিন্তু ব্রিটেন ইরানের কথায় কান না দিয়ে উপসাগরে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পাশাপাশি আরেকটি যুদ্ধজাহাজ পাঠায়।

এরই প্রতিক্রিয়ায় ইরানি ট্যাংকার আটকের ঘটনা ঘটে। ব্রিটেন জানায়, তারা জিব্রাল্টার কর্তৃপক্ষের অনুরোধে কাজটি করেছে। তাদের আশঙ্কা ছিল, ট্যাংকারটি সিরিয়ার দিকে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ইইউয়ের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর সে কারণেই তারা কাজটি করেছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রেরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে ব্রিটেনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা ইরানের ট্যাংকারটি আটক করেনি।

তেহরানের ‘বৈরী আচরণের’ কারণে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইরানের দৃষ্টিতে এরপর সংলাপের আর কোনো পথ খোলা রইল না, যদিও যুক্তরাষ্ট্র বারবারই সংলাপের আবেদন জানিয়ে আসছে। এর মধ্যে ইরানও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চুক্তিতে বেঁধে দেওয়া মাত্রার চেয়ে বাড়িয়ে জেসিপিওএর শর্ত লঙ্ঘন করেছে। এটি এবং এর পাশাপাশি গত দুই মাসে কয়েকটি তেলের ট্যাংকারে ইরানের হামলা (যদিও ইরান স্বীকার করেনি) ও মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করা—সবই তেহরানের প্রতীকী ব্যবস্থা। এর চেয়ে বহুগুণ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে যদি তারা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শন ও নজরদারি বন্ধ করে দেয়।

ইরান মনে করে, শ্বাসরুদ্ধকর এই নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর জন্য তাদের আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে একই সঙ্গে তারা এ নিয়েও সতর্ক যে পদক্ষেপগুলো যেন ট্রাম্পকে যুদ্ধের দিকে উসকানি না দেয়। ঝুঁকির বিষয়টি হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে না চাইলেও পরিস্থিতির অবনতি হলে তাঁর আশপাশের লোকজনের প্রভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসের প্ররোচনায় ব্রিটেনও সেই লড়াইয়ে নেমে যেতে পারে।

এর মধ্য দিয়েই ধীরগতিতে চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে বৈঠকে বসে গেছেন ইউরোপীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। ইইউ নিজের মতো কিছু ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান উদ্যোক্তা ফ্রান্স। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনা নিরসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

ইইউয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের উচিত ফ্রান্সকে সমর্থন অব্যাহত রাখা। উত্তেজনা কমে যাবে এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে এর বিকল্প হিসেবে যা রয়েছে, তা কল্পনাতীত।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য