kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

স্মরণ

অবিশ্বাস্য কর্মতৎপর জীবন কাটিয়ে গেল মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

আহমদ রফিক

১৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অবিশ্বাস্য কর্মতৎপর জীবন কাটিয়ে গেল মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

কাল (মঙ্গলবার) রাতের বেলা মেঘাচ্ছন্ন বিষণ্ন আবহে চলে গেল পরম স্নেহাস্পদ লেখক-সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে তার শেষ যাত্রা, যা প্রতিটি মানুষের জন্য এক অবধারিত নির্মম সত্য। আমিও তো অপেক্ষমাণ একই লক্ষ্যে।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে আমার পরিচয় ওর তারুণ্যে, যখন ওর সাংবাদিক জীবন শুরু। ওরা দুই বন্ধু জাহাঙ্গীর ও ভুইয়া ইকবাল, দুই চট্টলবাসী মেধাবী তরুণ একটি সাহিত্য সংকলনগ্রন্থ সম্পাদনায় ব্যস্ত, তাতে আমার একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ, মনে হচ্ছে যেন এই সেদিনের কথা। এরপর ওরা যে যার পথে—একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাহিত্য গবেষক, দ্বিতীয়জন সাংবাদিকতার টানে ঢাকায় থিতু।

আর ঢাকায় থাকার টানে সংস্কৃতি অঙ্গনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এক অনিবার্য বাস্তবতা, বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুরাগী মেধাবীজনের পক্ষে। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর সেই আকর্ষণ আমৃত্যু হৃদয়ে লালন করেছে, এর প্রকাশ ঘটিয়েছে নানা মাধ্যমে, হোক তা রবীন্দ্রচর্চার সংগঠন রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র কিংবা নৃত্যকলার অভিনব প্রকাশের মাধ্যমে নৃত্যাঞ্চল। এসব অবশ্য বেশ কিছুকাল পরের কথা।

দুই.

ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সুবাদে, নিকট আত্মীয়তার সূত্রে তাকে গভীরভাবে দেখেছি, চিনেছি। অবাক হয়েছি সাদামাটা সাংবাদিকতার ঊর্ধ্বে তার উদ্ভাবনী মেধার বৈচিত্র্যে ও বৈশিষ্ট্যে, তার মধ্যে সংগুপ্ত সাহিত্য সাধকের একটি অন্তর্নিহিত রূপ দেখে। সাংবাদিকতা তার তাত্ক্ষণিক পেশা, জাগতিক প্রয়োজনের পেশা বা জীবিকাও হতে পারে, কিন্তু নান্দনিক নেশা ছিল না।

ওটা ছড়িয়ে ছিল সাহিত্যে, যদিও জাহাঙ্গীর তার সাহিত্য মেধার প্রতি অবিচার করেছে অন্যান্য কারণের টানে অতি কম লিখে। অথচ সে অতি সামান্য লেখায় তার শক্তির বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেছি। রাজনীতি তার নেশা ছিল না, তবু গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ তার গভীর বিশ্লেষণের বিষয় ছিল। এ বিষয়ে তার কয়েকটি লেখা পড়েই এমন ধারণা হয়েছে আমার।

তবে পূর্বোক্ত নেশার প্রকাশ সুষ্ঠুভাবে তাৎপর্যময়ভাবে প্রকাশ পেয়েছে সংস্কৃতি অঙ্গনে, সংস্কৃতির নানামুখী চর্চায় তার গভীর মনোনিবেশে, অতন্দ্র তৎপরতায়। এদিক থেকে অবিশ্বাস্য রকম পরিশ্রমী ছিল মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। এক অনুষ্ঠান থেকে আরেক অনুষ্ঠানে, সকালে বেরিয়ে রাত করে ঘরে ফেরা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। সুগৃহিণী হয়েও অপেক্ষমাণ স্ত্রী ক্ষুব্ধ, গম্ভীর।

মধ্যবয়স থেকে সাংবাদিকতা তার জন্য পরোক্ষ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, সংস্কৃতিচর্চাই সেখানে প্রধান। সাহিত্য সম্পাদনা থেকে সংস্কৃতির নানা অঙ্গনে তার বিচিত্র অভিসার। রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল—কোনো ক্ষেত্রেই তার আগ্রহের অভাব ছিল না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে যদি বলি, তাহলে রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের নাম বিশেষ তাৎপর্যে উঠে আসবে।

গত শতকের আশির দশকের শেষ দিকে রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র গঠনের প্রথম থেকে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর এ সংগঠনের সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানে জড়িত। রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রের প্রচার ও সাহিত্য সম্পাদক মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর বরাবর অভিনবত্বের প্রকাশে রেখেছিল অগ্রচারীর ভূমিকা। তাঁর চিন্তার ফসল ‘রবীন্দ্রচর্চা’ বুলেটিন, তাঁর সম্পাদনায় হয়ে উঠেছিল বিশিষ্ট।

তাতে ছিল রবীন্দ্রবিষয়ক ছোট ছোট নিবন্ধ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ স্বদেশ-বিদেশভিত্তিক রবীন্দ্রবিষয়ক নানাবিধ টুকরো খবর। একবার শংঘ ঘোষ সম্পাদিত ‘সূর্যাবর্ত’ নিয়ে বিশেষ আলোচনা। রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্রকে গতানুগতিকতা থেকে মুক্ত রাখতে বরাবর তাকে দেখেছি নানাবিধ পরিকল্পনা তুলে ধরতে।

রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র যখন অর্থাভাবে সংকটাপন্ন, তখনো এতে তার উৎসাহের অভাব দেখা যায়নি। বরং নানা পরিকল্পনায় একে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টায় আন্তরিক ছিল মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। পরবর্তীকালে যখন সেখানে দেখা হয়েছে, তার প্রথম ও প্রধান জিজ্ঞাসা : চর্চাকেন্দ্রটিকে কি নতুন করে গড়ে তোলা যায় না? এবং সেই সঙ্গে তার যথারীতি উদ্ভাবনী চিন্তার প্রকাশ।

রবীন্দ্র সাহিত্যে তার আগ্রহ ছিল অকৃত্রিম ও গভীর। আমাদের বাসায় যখনই এসেছে, জানতে চেয়েছে রবীন্দ্রবিষয়ক আমার নতুন কী বই বের হলো এবং অবশ্যই তাকে এক কপি। দুই খণ্ডে প্রকাশিত ‘নানা আলোয় রবীন্দ্রনাথ’ সম্পর্কে একদিন মৃদু হাসিতে মন্তব্য : ‘কই, এ বই দুটো তো আমি পাইনি’। অতএব তার নাম লিখে দুই খণ্ড হস্তান্তর মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে। আমার নতুন লেখা সম্পর্কে তার আগ্রহ ছিল পূর্বাপর, হোক তা রবীন্দ্রনাথ বা ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন নিয়েও তার বিচিত্র ভাবনার প্রকাশ দেখেছি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায়। এ বিষয়ে তার চিন্তাভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছে জাহাঙ্গীর।

প্রেস ক্লাব সম্ভবত তার সবচেয়ে প্রিয় একটি সময় কাটানো স্থান; অকারণে নয়, কারণে ও গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাগুলো খুঁটিয়ে পাঠের প্রয়োজনে। উদ্দেশ্য সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবনাগুলোকে গুছিয়ে নেওয়া, কিছু লেখা ও কিছু পরামর্শের টানে। তাই দেখেছি জাতীয় জীবনের সমস্যা নিয়ে তার বিচক্ষণ কথাবার্তা, সৎপরামর্শে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি।

তিন.

মধ্যবয়স-উত্তরকালে মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের বড় পরিচিতি একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং টিভির অনুষ্ঠান পরিচালক হিসেবে। বাংলাদেশে যে বিরলসংখ্যক মেধাবী ও মননশীল টিভি অনুষ্ঠান পরিচালক খ্যাতি অর্জন করেছে, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর তাদের অন্যতম। এদিকে তার আকর্ষণ ছিল যথেষ্ট। বিচিত্র বিষয় নির্বাচন, সঠিক বক্তা নির্বাচন এবং আকর্ষণীয় উপস্থাপনে জাহাঙ্গীরের কৃতিত্ব আমি লক্ষ করেছি।

এদিক থেকে বিষয় তাকে জয় করতে পারেনি। বরং বিষয়কে জয় করেছে জাহাঙ্গীর তার উদ্ভাবনী শৈলীর পারঙ্গমতায়। তার উপস্থাপিত গুটিকয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে, অনেকগুলো দেখে এমনই ধারণা হয়েছে আমার। এ বিষয়ে মধ্যরাত বা অতি ভোর তার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, দেখে অবাক লেগেছে।

একইভাবে নৃত্য সংগঠনসহ একাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের তৎপরতা নিয়ে ব্যস্ত সময় কেটেছে জাহাঙ্গীরের। মনে আছে একবার দিল্লির রবীন্দ্রনাট্যমের মূল কর্তা বাল্মীকি ব্যানার্জির ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য ভিন্ন আঙ্গিকে পরিবেশন নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিষয়টির বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

যেমন আমার রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র নিয়ে, তেমনি বাংলা একাডেমির অমর একুশের অনুষ্ঠানমালাসহ বইমেলা নিয়ে তার কিছু নিজস্ব চিন্তাভাবনা ছিল, যে বিষয়ে আমি তার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছি। তাকে কথা বলতে বলেছি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের সঙ্গে। যদিও জানা ছিল তাতে ভিন্নমতের বরফ গলবে না। জাহাঙ্গীর একটু তির্যক হেসে বলেছিল, এটাই আসলে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় সমস্যা। কেউ তার অন্ধ অবস্থান থেকে কিছুতেই সরে দাঁড়াবে না।

‘নৃত্যাঞ্চল’ নিয়ে জাহাঙ্গীর কতটা সফল, তা আমার জানা নেই। কারণ ওই বিশেষ দিকে আমার আগ্রহ অপেক্ষাকৃত কম। বাল্মীকি ব্যানার্জির রবীন্দ্রনাট্যম নিয়ে কথা বলেছিলাম প্রধানত বাল্মীকিবাবু এবং বিশেষভাবে আমার প্রিয়জন প্রাণতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রমান্বয় অনুরোধে।

চার.

একটা দারুণ কর্মময় জীবন কাটিয়ে গেল মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর তাঁর অকালপ্রয়াণ সত্ত্বেও। বৈনাশিক রোগ ক্যান্সার প্রায় জোর করেই তার জীবনটা কেড়ে নিল। তবে এ রোগের সঙ্গে একটা কঠিন লড়াইও চালিয়ে গেল জাহাঙ্গীর বেশ কয়েক বছর ধরে। আশ্চর্য, হতাশা তাকে গ্রাস করেনি। আর এ লড়াইয়ে বলিষ্ঠ সহযোদ্ধা তার জীবনসঙ্গিনী ঝর্ণা—সেই সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক থেকে ঢাকা অবধি, আমার একদা সহপাঠী ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ করিমের চেম্বারও বাদ যায়নি। আমি বিশ্বাস করি, ঝর্ণার একনিষ্ঠ শ্রম জাহাঙ্গীরের শেষ কয়টা বছরের জীবনসীমা বৃদ্ধি করেছিল।

তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা বাংলা একাডেমির বিগত বার্ষিক সাধারণ সভার অনুষ্ঠানে। শরীর অবিশ্বাস্য রকম শীর্ণ, কিন্তু কণ্ঠস্বরের সজীবতায় সেই জীর্ণতার আভাস নেই। বলেছে, শিগগিরই আপনার বাসায় যাব, কথা হবে রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র নিয়ে। ওটা ছিল তার একধরনের ‘অবসেশন’। সে যাওয়া হয়ে ওঠেনি যদিও।

তবে এর মধ্যে একাধিকজনের কাছে শুনেছি ‘খামখেয়ালি সভা’ থেকে নানা অনুষ্ঠানে তার যোগদানের কথা। এমন জীর্ণশীর্ণ শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকার বদলে কর্মতৎপর সময় কাটিয়ে গেছে সাংস্কৃতিক বিশিষ্টজন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। ভাবতে গেলে অবাকই লাগে। একজন সফল সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর—বলার অপেক্ষা রাখে না, তার কর্মে তার স্মৃতি সজীব থাকবে।

 

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

মন্তব্য