kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

মনের কোণে হীরে-মুক্তো

বাজেট রঙ্গ, এর যবনিকা পতন এবং অতঃপর

ড. সা’দত হুসাইন

১৩ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বাজেট রঙ্গ, এর যবনিকা পতন এবং অতঃপর

বাজেট রচনার কাজ ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে শুরু হলেও আলোচনাপর্ব অনুষ্ঠানের রূপ নিতে শুরু করে মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে। এপ্রিল মাসের শেষার্ধ থেকে আলোচনা ঘিরে উত্সবের আমেজ সৃষ্টি হয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় আলোচনার ঢেউ আছড়ে পড়ে। ঢোল-বাদ্য না বাজলেও একটা কলতান বাতাসে ভেসে বেড়ায়। মুখর আলোচনার সুস্বাদু ঘ্রাণে কথকরা তখন মাতোয়ারা। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা পাশে বসে আলোচকদের বক্তব্য, মন্তব্য, পরামর্শ শুনছেন। ‘ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম’ আলোচনা অনুষ্ঠানে নানাভাবে রং ছড়াচ্ছে। অনুষ্ঠানগুলোকে শেষ পর্যন্ত রঙের মেলায় সাজাতে তারা আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাজেট উপস্থাপনের দিন যত ঘনিয়ে আসে, আলোচনা অনুষ্ঠানের কলেবর তত বাড়তে থাকে। অবশেষে জুন মাসের প্রথম অথবা দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার সংসদে প্রস্তাব আকারে বাজেট উপস্থাপন করা হয়। এ বছর ১৩ জুন বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপিত হয়েছে। বিস্তর প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ইচ্ছা না থাকায় অর্থমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত বাজেট উপস্থাপনে সক্ষম হননি, প্রধানমন্ত্রী নিজেই বাজেটের শেষ অংশ উপস্থাপন করেন।

অতীতে বাজেট উপস্থাপনের পর বাজেটের ওপর আলোচনা সংসদের মধ্যেই মোটামুটি সীমিত ছিল। এখন উপস্থাপিত বাজেটকে ‘বাজেট প্রস্তাব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সংসদের বাইরে জোরেশোরে আলোচনা অনুষ্ঠান চলতে থাকে। বাজেট উপস্থাপনের আগের অনুষ্ঠানের চেয়ে এর কলেবর কোনো অংশে কম নয়। সঙ্গে যোগ হয় টেলিভিশনের টক শো ও বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান। আয়োজক এবং আলোচকরা প্রায় সবাই একই বৃত্তের। সেমিনার, কলোকিয়াম, টক শো কিংবা বিশেষায়িত অনুষ্ঠান—সবগুলোতে এঁদেরকে দেখা যায়। এঁরা যুক্তি দিয়ে কথা বলেন, জ্ঞানের কথা বলেন, সাধারণ মানুষের কথা বলেন, দেশের সম্পদের সদ্ব্যবহারের কথা বলেন, সুশাসনের পক্ষে কথা বলেন। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং পেশাজীবীরা অবশ্য তাঁদের সুরে, তাঁদের স্বার্থে কথা বলেন, নানা রকম পরামর্শ রাখেন। সবার শেষে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কনভেনশন সেন্টারে উপাদেয় আপ্যায়নের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ করেন। কোনো অর্থ প্রদানকারী সংস্থা (Funding Agency) সাধারণত অনুষ্ঠানের আয়োজকদের সহযোগিতা প্রদান করে। একই সঙ্গে পার্লামেন্টের ভেতরেও বাজেটের ওপর আলোচনা চলতে থাকে। এবার ‘১৩ জুন সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পর ২৫৫ জন এমপি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে ৫১ ঘণ্টা ৫২ মিনিট আলোচনা করেন।’

অবশেষে অর্থবছরের শেষ দিন কণ্ঠভোটে বাজেট পাস হয়ে গেল। তারপর সাড়ম্বরে নৈশভোজ। এত বিদগ্ধ লোকের এত আলোচনা, এত পরামর্শের প্রায় সবই হাওয়ায় মিশে গেল। অন্যান্য বছরের মতো এবারও সরকার যে বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিল তা হলো—আমরা তোমাদের ডাকলাম, তোমাদের পাশে বসলাম, তোমাদের কথা শুনলাম এবং সব শেষে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিলাম। ১ জুলাই ২০১৯ থেকে পার্লামেন্টে পাস করা বাজেট অনুযায়ী কাজ চলছে। অবশ্য কেউ বেশি খরচ করে ফেললে আগামী জুনে সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে সে খরচ হালাল করে নেওয়া হবে।

বাজেট বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়ে গেছে। আলোচনাসভা, সেমিনার, সম্মেলনের ধারা এখন স্তিমিত হয়ে আসবে। বাজেট বাস্তবায়নের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানের জন্য অর্থায়নকারী সংগঠনগুলো সাহায্য-সমর্থন দেয় না। এখন বাজেট অনুযায়ী ব্যয় নির্বাহ করা হবে। আলোচনায় মুখর হওয়ার পালা শেষ। ভোক্তাদের জন্য যেটি রয়ে গেছে তা হলো বাজেটের চাপ। এবার বাজেট প্রস্তাবে নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং সীমিত আয়ের লোকদের জন্য কোনো আনন্দদায়ক বা স্বস্তিকর ব্যবস্থা প্রবর্তনের খবর মেলেনি। বরং পূর্বতন বাজেটগুলোয় দেওয়া কিছু সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উেস কর বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। আশা করা হয়েছিল যে করশূন্য আয়ের সীমা কিছুটা হলেও বাড়ানো হবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করা হয়নি। নতুন ভ্যাট আইন প্রয়োগের ফলে ভোক্তারা চাপের মধ্যে পড়বে। কাকতালীয় হলেও বাজেট পাসের দিন অর্থাত্ বছরের শেষ দিন আচমকা গ্যাসের মূল্য বাড়িয়ে মধ্যবিত্ত ভোক্তাদের বিপর্যস্ত করা হয়েছে। এ যেন প্রকৃতই মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। দিশাহারা মধ্যবিত্তরা ছটফট করছে, ছোটাছুটি করছে। পারত্রিক ইশারায় কোনো সুখবর পাওয়া যায় কি না তার জন্য প্রহর গুনছে।

মোটাদাগে বাজেট বলতে যেমন আয়-ব্যয়ের হিসাব বোঝায়, তেমনি বাজেট বাস্তবায়ন বলতে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহ এবং ব্যয় নির্বাহের পদক্ষেপগুলোর সক্ষমতা ও যথার্থতাকে বোঝায়। প্রাক্কলন অনুযায়ী যদি সরকারের আয়-ব্যয় এগোতে থাকে, তবে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ থাকে না। আয়-ব্যয় ও কর্মসূচির বাস্তব অগ্রগতি প্রাক্কলন রেখা থেকে দূরে ছিটকে পড়লে দেখা দেয় যত ঝামেলা। এ অবস্থা দেশের জন্য যেমন কল্যাণকর নয়, সরকারের জন্যও তা স্বস্তিকর নয়। ফলে সরকারের কর্মসূচি, কর্মপরিকল্পনা, প্রত্যাশা, সর্বোপরি জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ওলট-পালট হয়ে যায়। বিদগ্ধজন এ বাজেটকে অলীক কল্পনার স্বপ্নবিলাসী রূপকল্প হিসেবে আখ্যায়িত করে। এর অভিঘাত পড়ে প্রশাসনে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে, এমনকি সামাজিক কর্মধারায়। নানারূপ বিকৃতি মাথাচাড়া দেয়। কখনো কখনো রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সমাজে অস্থিরতা দেখা দেয়। এমন অবস্থা রাষ্ট্র, সরকার বা সমাজ কারো জন্য কাম্য হতে পারে না।

কয়েক বছর থেকে বিরাট অঙ্কের বাজেট পেশ করা হয়। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময় থেকে এ ধারা চলে আসছে। নানা জটিল প্রক্রিয়ায় কখনো কখনো ব্যক্তিবিশেষের মধ্যে Fixation বা ‘স্থিরীকৃত অযৌক্তিক ধারণার’ সৃষ্টি হয়। সে মনে করে তার পছন্দ অন্তত তার কাছে সব কিছুর ওপরে। সে নিজের সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছে বা যে পদ্ধতিতে এগোতে চাচ্ছে তার হেরফের হলে চলবে না। এভাবে এগোলে রেকর্ড সৃষ্টি হবে, তার দিকে সবাই তাকাবে। ইতিহাসে তার স্থান হবে। তার এ চিন্তা যৌক্তিক কি না, এতে গণমানুষের উপকার হবে কী, তার স্থিরীকৃত ধারণা সাধারণ মানুষের চিন্তাচেতনা ও অধিকারকে আহত করে কি না, এ কাজ ন্যায়াচরণের পরিপন্থী কি না এ বিষয়গুলো সে বিবেচনায় নিতে চায় না। স্থিরীকৃত ধ্যান-ধারণা

(fixation) তাকে অসাধারণ কীর্তিমান ব্যক্তিত্বে রূপান্তরিত করবে এটি তার বিশ্বাসের অঙ্গ (Article of faith) হয়ে যায়। এর বাইরে সে কিছুতেই যাবে না।

কাজকর্মের ধারা থেকে এমন ধারণা করা অস্বাভাবিক হবে না (ধারণা ভুলও হতে পারে) যে সাবেক অর্থমন্ত্রীর স্থির বিশ্বাস হয়েছিল যে গায়ে-গতরে বাজেট যত বড় হবে, ততই তাঁর কৃতিত্ব জাহির হবে। অতএব বাজেটের আকার বাড়াতে হবে। আর বাজেটের আকার বাড়াতে হলে রাজস্ব সংগ্রহের প্রাক্কলিত অঙ্ক বিশাল হতে হবে। অতএব রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা হবে আকাশচুম্বী। প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরা কে কী বললেন তা শুনে লাভ নেই। তাঁরা তো বাজেটকে ‘উচ্চাভিলাষী’ বলবেন, তাঁদের কথা শুনলে চলবে না। উন্নয়নশীল দেশের বাজেট উচ্চাভিলাষী হওয়া শ্রেয়; এতে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাবে। উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। এ ধারণার অনুসরণে বাজেট প্রতিবছর বিশাল থেকে বিশালতর হচ্ছে। স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে এ কথা অনেকটা নিশ্চিত করে বলা যায় যে বাজেট পুরোমাত্রায় বাস্তবায়িত হবে না। লক্ষ্যমাত্রা এবং বাস্তবায়নের মধ্যে বড় রকমের ফারাক থাকবে। এবার প্রাক্কলিত বাজেটে বিশাল ঘাটতির প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে বাস্তবে ঘাটতি আরো বাড়তে পারে। গত কয়েক বছরে বাজেট বাস্তবায়ন ৭৬ শতাংশ থেকে শুরু করে ৯০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এবারও এর বড় একটা ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকার নানারূপ বাড়তি আদায়ের প্রচেষ্টা চালাবে। তারই একটি হচ্ছে আচমকা গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। যে সংস্থার আয় গত কয়েক বছর ধরে বেড়ে চলেছে তাদের আয় আরো বাড়ানোর জন্য ভোক্তা সাধারণের ওপর কেন এই ভারী বোঝা চালিয়ে দেওয়া হলো তা সহজবোধ্য নয়। এর পেছনে কোনো গূঢ় কারণ আছে কি না তা এখনো জানা যায়নি। ভবিষ্যতে জানা যাবে কি না তা বলা মুশকিল।

সরকারের রাজস্ব আয়ের সঙ্গে চলবে ব্যয়ের পালা। যেহেতু আয় কম হবে, তাই ধরে নেওয়া যায় যে ব্যয়ও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হবে। ব্যয়ের খাত দুটি : উন্নয়ন ব্যয় ও (আবর্তক) রাজস্ব ব্যয়। গত প্রায় এক দশক ধরে উন্নয়ন ব্যয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম হচ্ছে। বছরের শেষার্ধে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা (এডিপি) কাটছাঁট করে সংশোধিত এডিপির আকার মূল এডিপির চেয়ে কমিয়ে আনা হয়। সেই হ্রাসকৃত এডিপিও পূর্ণ বাস্তবায়িত হয় না, যদিও হ্রাসকরণের কারণে ঘাটতির পরিমাণ কম দেখানো সম্ভব হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এডিপি বাস্তবায়নের ওপর একটি প্রতিবেদন একনেক সভায় উপস্থাপন করবে। সেখানে তারা বিগত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের প্রকৃত অবস্থা (অনুমানভিত্তিক নয়) তুলে ধরবে। আমি প্রায় ১৫ বছর এই সভায় উপস্থিত ছিলাম। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে দু-একবার এডিপির ব্যয় লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ অর্জিত হয়েছিল। এ ছাড়া আর সব বছর লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এডিপির ব্যয় অনেক কম ছিল। আইএমইডির প্রতিবেদনে বর্ণিত ঘাটতির কারণগুলো আইএমইডির সচিব উচ্চৈঃস্বরে আবৃত্তি করেন। একে আবৃত্তি বলাই ঠিক হবে। কারণ একই কথা প্রতিবছর বলা হয় এবং আশা প্রকাশ করা হয় যে অদূরভবিষ্যতে অসুবিধাগুলো দূরীভূত হবে। বাস্তবে তা হয় না। অপূর্ণ প্রত্যাশা নিয়ে আমরা প্রতিবছরের মতো এবারও বেঁচে থাকব। এখন আমরা মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিচ্ছি যে লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত না হলে অসুবিধা কী? চলছে তো। আমরা তো ভালোই আছি।

আগে ধারণা করা হতো যে (আবর্তক) রাজস্ব ব্যয়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হয় না। অনুন্নয়ন বাজেটে যে অর্থ বরাদ্দ থাকে সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কোনো সমস্যা ছাড়া সে টাকা খরচ করে ফেলে। এখানে টাকা খরচ করা বড় আনন্দের ব্যাপার। এখন দেখা যাচ্ছে, আবর্তক রাজস্ব বাজেটের টাকাও পুরোপুরি খরচ হয় না; এখানেও অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ চোখে পড়ার মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। অর্থ বিভাগ ব্যাপারটি খতিয়ে দেখেছে এবং সমস্যার উত্স সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করেছে। তাদের সন্ধানী প্রতিবেদন থেকে মনে হয়েছে অদূরভবিষ্যতে এ সমস্যাও দূরীভূত হবে না। এখানে হতাশার কারণ কম, রাজস্ব বাজেটে ব্যয় কম হলে সরকারের অর্থ সাশ্রয় ঘটে। ভয়ের কারণ হলো, খরচ কম হলে সরকারের কল্যাণকর কর্মসূচি ব্যাহত হতে পারে। দেশের এবং জনগণের স্বার্থে সরকার যে কর্মসূচি বাস্তবায়নের আশ্বাস বাজেট পাসের প্রাক্কালে দিয়েছিল তা পূরণ হবে না। দেশ ও জনসাধারণ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাজেট পাসের পর সবচেয়ে প্রতিকূল অবস্থার মোকাবেলা করতে হচ্ছে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীকে। তাদের সীমিত আয় আগেই কমে গিয়েছিল। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ওপরের নির্বাহী আদেশে আমানতের ওপর মুনাফার হার কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে চাহিদা সরবরাহের ভিত্তিতে আমানত এবং ঋণের ওপর সুদের হার নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে নীতি বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে উচ্চ আয়ের ঋণগ্রহীতাদের স্বার্থে। এ ঋণ নিয়ে হয় তারা খেলাপি হবে অথবা মাত্রাতিরিক্ত লাভে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাবে। ঋণগ্রহীতারা সংঘবদ্ধ, শক্তিশালী এবং প্রভাবশালীদের সঙ্গে বিভিন্ন সমীকরণে সংযুক্ত। তাদের সাহায্য করতে ক্ষমতাবানরা উদগ্রীব। পক্ষান্তরে আমানতকারীরা অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয়ের, তারা সংঘবদ্ধ নয় এবং তাদের ওপর প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া নেই। অতএব করের খড়্গ তাদের ওপর নামে, তারা ক্ষতবিক্ষত হয়। সরকারি সঞ্চয়পত্র থেকে যে সামান্য মুনাফা পেত, যা দিয়ে তাদের সংসার খরচ চলত, সে মুনাফার ওপর করের হার বাড়ানো হয়েছে। তাদের মাসিক আয় কমে গেছে। তার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। করের চাপে, গ্যাসের তাপে তাদের গলে যাওয়ার অবস্থা। সংসারের কোন খরচ কাটবে সে হিসাব কষতে গিয়ে তারা নাকাল হচ্ছে। বড় আশা ছিল এত বছর পরে হলেও এবার করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়বে। সে আশার গুড়ে বালি। করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়নি। ঘন হতাশা এখন তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

একজন সাধারণ মানুষ বাজেটকে সরকারের বাত্সরিক আয়-ব্যয়ের প্রাক্কলিত বৃত্তান্ত মনে করতে পারে। সরল বিশ্বাস তাকে সে পথে পরিচালিত করে। শাসকদলও অনেক সময় এ সুযোগ গ্রহণ করে বাজেটকে হিসাব-নিকাশের ছাপানো দলিল হিসেবে চালিয়ে দিতে প্রয়াশ পায়। প্রকৃতপক্ষে বাজেটে বিভিন্ন শ্রেণি-গোষ্ঠী এবং কর্মসূচির প্রতি সরকারের পছন্দ-অপছন্দের প্রতিফলন ঘটে। সরকারের প্রাধিকার কাগজে-কলমে প্রকাশ পায়। ২০১৯-২০ সালের বাজেটে উচ্চবিত্ত, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী-পুঁজিপতি, কালো টাকার মালিক, রেমিট্যান্সভোগীদের প্রতি সরকারের আন্তরিক টান ও সখ্য প্রকাশ পেয়েছে। এর আগের বাজেটগুলোতে একই ধারা বিরাজমান ছিল। এবারের বাজেট দেখে তা-ই মনে পড়েছে—

এপার গঙ্গা, ওপর গঙ্গা মধ্যখানে চর,

হঠাৎ দেখা আপন হলো, আপন হলো পর।

অনেক হলো জানাশোনা, অনেক হলো দেখা,

রমণী সেই বাসর খোঁজে, পুরুষ রহে একা।

অর্থাৎ Business as usual.

 

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও  পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

মন্তব্য