kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

আল-কায়েদার বিপজ্জনক উসকানি

বাহারউদ্দিন

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আল-কায়েদার বিপজ্জনক উসকানি

কাশ্মীর সমস্যায় সরাসরি নাক গলাচ্ছে আল-কায়েদা আর ইসলামিক স্টেট। সম্প্রতি আল-কায়েদার প্রধান আইমান আল জাওয়াহিরি বিবৃতি ছড়িয়ে বলেছেন, ‘কাশ্মীরকে ভুলবেন না’। ‘আসসাহাব’-এ প্রকাশিত তাঁর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে আঘাত হানতে হবে। জঙ্গি অভিযানের লক্ষ্য হোক ভারতীয় অর্থনীতি। এখানকার সামরিক ও অসামরিক প্রতিষ্ঠানে হামলার নেতৃত্ব দিতে হবে কাশ্মীরি মুজাহিদদের।’

আল-কায়েদা কাশ্মীরে ‘আনসার-এ-গুয়াহত অল হিন্দ’ (আইজিএইচ) নামে একটি শাখা সংগঠন গড়ে তুলেছে। এর দায়িত্বে ছিল জাকির মুসা। মুসার মৃত্যুর (সংঘর্ষে) সঙ্গে সঙ্গে শাখা পরিচালনার ভার নেয় আবদুল হামিদ লেহারি। লেহারি স্বীকার করেছেন, তাঁদের পেছনে পাকিস্তানের ইন্ধন রয়েছে। জাওয়াহিরি অবশ্য অভিযোগ করেছেন, ‘পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য নয়। পাকিস্তানের সেনা ও সরকার মার্কিন গোয়েন্দাদের নির্দেশে পরিচালিত।’

‘আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পর পাকিস্তান কাশ্মীরে আরব মুজাহিদিনদের ঢুকতে দেয়নি’—বলেছেন জাওয়াহিরি। ১৯৯৮ সালে মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলার পর আল-কায়েদা ও আইএসের দূরত্ব বেড়ে যায়। এর আগে ওরাই আফগানিস্তানে কাশ্মীরি জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল। মার্কিন চাপে পাকিস্তান হাত গুটিয়ে নেয়।

আল-কায়েদা কাশ্মীর, ফিলিপাইন, চেচনিয়া, মধ্য এশিয়া, ইরাক, সিরিয়া, সোমালিয়া, তুরস্কসহ বহু দেশে তথাকথিত ধর্মযুদ্ধকে শুধু সমর্থনই নয়, অস্ত্রও জোগায়। বিশ্বজুড়ে তারা গড়তে চায় ধর্মীয় রাষ্ট্র। পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মির কয়েক বছর আগে খবর করেছিলেন, আল-কায়েদা কাশ্মীর দিয়ে ঢুকছে। তাদের যুদ্ধের মানচিত্র পশ্চিম থেকে পূর্ব ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের অনুমান, বাংলাদেশেও ঢোকার চেষ্টা করেছে। পারেনি। হাসিনা সরকারের ‘জিরো টলারেন্স অন টেররিজম’ নীতির জন্য হালে পানি পায়নি। জেএমবির সঙ্গে তাদের যোগসূত্র প্রমাণিত। ওদের সহযোগিতা ও মদদে পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে শাখা বিস্তারের চেষ্টা করে। জেএমবি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ। চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে জামায়াতে ইসলামী ও শিবিরের মতো ওদের কোমর গুঁড়িয়ে দিয়েছে ঢাকা। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে গোপন পথে ভারতে প্রবেশ করলেও ভারতীয় সমাজের প্রত্যাখ্যান আর দিল্লির কঠোর সতর্কতায় ওরা নাস্তানাবুদ। নিষিদ্ধ মুজাহিদুন আল হিন্দের (সিমির রূপান্তরিত সংগঠন বলে সন্দেহ) সঙ্গে আঁতাত গড়ে তোলার প্রয়াস চালায়। এ প্রয়াসও ব্যর্থ। তবু হাল ছাড়েনি। ‘কাশ্মীরি মুজাহিদিন’রাই এখন ওদের ভরসা। এখানেও সাফল্য নিয়ন্ত্রিত। প্রথমত সামাজিক ভিত তৈরি করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান বাধ্যতামূলকভাবে ওদের আমল দিচ্ছে না। দিলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরো কোণঠাসা হয়ে পড়বে। তৃতীয়ত, কাশ্মীরের হিজব-এ-মুজাহিদিন ও অন্যান্য জঙ্গিসংগঠন, যারা বৃহত্তর কাশ্মীরকে নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ, তারা ওদের এলাকায় বিদেশি আল-কায়েদা অথবা আইএসের উপস্থিতি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ঘোলাজলে মাছ ধরার অভিসন্ধি ভাবছে। এ কারণেই সুপুর, বারামুলা ও পুলওয়ামায় পরস্পরবিরোধী জঙ্গিদের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষ পরিলক্ষিত হচ্ছে। জঙ্গিদের একাংশের রটনা, এ ধরনের আঘাত-প্রত্যাঘাত ভারতীয় গোয়েন্দা ‘র’-এর ষড়যন্ত্র। কিন্তু বাস্তব সত্য এই যে আল-কায়েদার কাশ্মীরি শাখার ধীর উত্থানে উপত্যকায় হিজবুল মুজাহিদিনের প্রভাব ক্রমে লঘু হয়ে ওঠে। জিহাদমুখর ‘আজাদির লড়াই’-এর পূর্ব আবেগ আর জেদ ফিরিয়ে আনতে বিদেশি আল-কায়েদার স্বদেশি বিরাদরদের ওপর হামলা চালাচ্ছে হিজব ও অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন। সম্ভবত এ কারণেই আল-কায়েদা প্রধান আল জাওয়াহিরিকে বিবৃতি দিয়ে বলতে হলো, কাশ্মীরকে ভুলে যাওয়া চলবে না। তাঁর বিবৃতির দ্বিতীয় কারণ, সাধের ধর্মযুদ্ধ ইরাকের আবু বক্কর আল বাগদাদির আইএসের দখলে চলে গেছে। ইরাক থেকে সিরিয়া—‘ক্রিসেন্ট এলাকা’জুড়ে  বিস্তৃত ওদের আধিপত্য। বহু আল-কায়েদা সদস্য আইএসে যোগ দিয়েছে। তৃতীয়ত, কাশ্মীরকেও টার্গেট করেছে ইরাকের স্বঘোষিত খালিফা আল বাগদাদির অতি আগ্রহ। আইএস এর প্রভাব রুখতেই আল-কায়েদার আল জাওয়াহিরি কাশ্মীরসহ সন্ত্রাস-উপদ্রুত বহু ভূখণ্ডকে ঘিরে বিশ্ব জিহাদের ডাক দিয়েছেন। স্বেচ্ছায় পাক-ভারত উপমহাদেশে কিছু কিছু অতি উৎসাহী নিজেদের আইএস কিংবা আল-কায়েদার যোদ্ধা বলে দাবি করলেও বৃহত্তর সমাজ কী পাকিস্তানে, কী বাংলাদেশে, কী ভারতে ধর্মযুদ্ধের আহ্বানকে অবাস্তব, হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। এ রকম সশস্ত্র কিংবা চিন্তার সন্ত্রাস যে ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনবে, আনছে—এ ব্যাপারে সমাজের সচেতন-নির্বিশেষ অতন্দ্রপ্রহরীর মতো সতর্ক। এমনকি যারা রামের নামে, গো-মাতার নামে এখানে-ওখানে প্রহার চালিয়ে পরিস্থিতিকে ক্রমাগত জটিল করে তুলছে, তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার আমাদের বিবেক, আমাদের যুক্তিবোধ এবং বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের বলিষ্ঠ উত্তরাধিকার। এ ক্ষেত্রে পশ্চিম বাংলা আর বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে অনুকরণযোগ্য দুই দিশারি। যেমন গঠনশীল রাজনীতিতে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরে, আলোকিত চৌহদ্দির সর্বত্র।

লেখক: ভারতীয় সাংবাদিক, আরম্ভ পত্রিকার সম্পাদক

[email protected]

 

মন্তব্য