kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

ভিন্নমত

পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকার কী করতে পারে

আবু আহমেদ

২১ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



পুঁজিবাজার উন্নয়নে সরকার কী করতে পারে

এখন চারদিকে অনেক শিক্ষিত লোক, তাঁদের বেশির ভাগই বাজার অর্থনীতির আবহে শিক্ষিত হয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, এই বেশির ভাগ শিক্ষিত লোক পুঁজিবাজারের গুরুত্বটা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং বুঝলেও অনেক দেরিতে বুঝেছেন। যেসব শিক্ষিত লোক পুঁজিবাজারের প্রয়োজনীয় আইন সম্পর্কে গভীরে যাননি, তাঁদের বেশির ভাগের কাছেই পুঁজিবাজার হলো ফাটকা বাজার বা জুয়াড়িদের আড্ডাখানা। এই ভাবনা হলো পুঁজিবাজার থেকে দূরে থাকার দরুন। এই শ্রেণির শিক্ষিত লোকেরা সঞ্চয় বলতে ব্যাংকের বা সঞ্চয়পত্র কেনার মাধ্যমে সঞ্চয়কে বুঝে থাকেন এবং এঁদের এই ধারণা সমাজে গভীরতা পাওয়ার কারণে আজও আমাদের অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদের অর্থায়নের জন্য ব্যাংকনির্ভর সংস্কৃতি বজায় আছে। এতে ব্যাংকগুলো বড় বেকায়দায় পড়েছে। কুঋণের ৯০ শতাংশ এসেছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে দীর্ঘ মেয়াদের অর্থায়নের জন্য। আরো  বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এসব শিক্ষিত লোক অনেক বড় বড় পদে বসে আছেন, কিন্তু আশপাশের অর্থনীতিগুলো শিল্প-ব্যবসা বা দীর্ঘ মেয়াদের পুঁজি সরবরাহের জন্য কী কৌশল গ্রহণ করেছে, তা জানতে নারাজ। ফল হয়েছে বছরের পর বছর আমরা পুরনো পদ্ধতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যকে অর্থায়ন করেছি। এতে আমাদের অর্থনীতি আজকে যে অবস্থানে থাকার কথা সে অবস্থানে নেই। আজও আমরা ছোট দুটি ব্রিজ নির্মাণ করার জন্য কথিত দাতাদের অর্থ প্রদানের দিকে চেয়ে বসে থাকি। ফল হয় এই যে দাতারা যখন অর্থ দেন, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। এবং আমরা একটি প্রজেক্ট শেষ করে অন্য প্রজেক্টের কাজ শুরু করতে অনেক দেরি করে ফেলি। অথচ এ দেশের জনগণই প্রজেক্টগুলোর জন্য অর্থ দিতে তৈরি।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা যে পদ্ধতিতে জনগণ থেকে অর্থ নেওয়া যায়, সেই পদ্ধতি সম্পর্কে যেন জ্ঞানের ঘাটতিতে ভুগছেন। সমৃদ্ধ পুঁজিবাজার, সমৃদ্ধ অর্থনীতি—এ ধরনের একটা স্লোগান আজকাল শুনি। কিন্তু যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে অর্থনীতি একটি সমৃদ্ধ পুঁজিবাজার পেতে পারে, সেসব ক্ষেত্রে উচ্চ পদের লোকেরা যেন একধরনের অন্ধকারে আছেন। কথা শুনি অনেক, কিন্তু একটা সমৃদ্ধ পুঁজিবাজার বিনির্মাণের লক্ষ্যে কাজ করতে অনেক কম দেখি। বাজার অর্থনীতিতে সঠিকভাবেই সম্পদের সর্বোচ্চ (Maximum) ব্যবহার হওয়ার কথা। সে জন্য বাজারগুলোকে মুক্তভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সম্পদের দক্ষ ব্যবহার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যক্তি খাতের মাধ্যমে সম্ভব। তবে সরকার যখন নিজে ব্যবসা করতে যায় অথবা শিল্প-কারখানা চালাতে যায় তখন সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা আশা করা যায় না। সরকার অর্থনীতির সরাসরি যদি ২৫ শতাংশও নিয়ন্ত্রণ করে আর ওই ২৫ শতাংশ যদি অদক্ষ হয়, তাহলে সে অদক্ষতা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। তখন পুরো অর্থনীতিতেই একটা সাব-অপটিমাল  (Sub-optimal) স্তরে অবস্থান করে। বাংলাদেশ অর্থনীতির সর্বোচ্চ স্তরে দক্ষভাবে সম্পদের ব্যবস্থাপনা হচ্ছে, এটা কেউ বলবে না। বেশির ভাগ লোক এটা বলছে যে সরকার কম রাজস্ব আহরণ করছে, এই অর্থনীতিতে কর-জিডিপি অনুপাত অনেক কম। কিন্তু এটা খুব কম লোকই বলছে, সরকার যে রাজস্ব আহরণ করছে তার দক্ষ ব্যবহারটা হচ্ছে কি? সরকারি ব্যয় যে জলে যাচ্ছে তার তো অনেক নমুনা আমরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দিকে নজর দিলেই বুঝতে পারি। অনেকেই উচ্চ বেতন-ভাতা পাচ্ছেন কিন্তু কাজ না করেই। সরকারি পদগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে নামের আগে-পরে কিছু টাইটেল অর্জন করার জন্য, আর অন্য কিছু লোক ওই পদগুলো নিজ স্বার্থে অপব্যবহার করে চলেছেন।

সরকারি ব্যয় দক্ষ না হলে সরকার যত রাজস্বই আহরণ করুক না কেন, রাজস্বের একটা অভাব থেকে যাবে। সেই অভাব থেকে সরকার ঘাটতি বাজেটের দিকে যায়। যে বাজেট অন্য দিক দিয়ে অর্থনীতিতে আরো অদক্ষতা নিয়ে আসে। সরকারের অধিক ব্যয়ের ফল যদি নিরপেক্ষ না হয়, তাহলে ব্যক্তি খাতের কিছু লোক চাইবেই সরকার আরো ব্যয় করুক, তবে শুধু তাঁদের মাধ্যমে। অন্যদিকে এটাও দেখতে হবে যে সরকার আজও যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছে সেসব ব্যবসা থেকে সরকার আদৌ কোনো Profit বা মুনাফা পাচ্ছে কি না। আমার জানা মতে, শত শত কোটি টাকা পুঁজি ব্যবসাগুলোয় ব্যয় করেছে, সে তুলনায় সরকারের মুনাফা প্রাপ্তি অতি নগণ্য। সত্য হলো, বেশির ভাগ ব্যবসা থেকে সরকার কোনো লাভই পাচ্ছে না, উল্টো প্রতিবছর কয়েক শ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। ভর্তুকি দিয়ে ব্যবসা চালানোর সংস্কৃতি সরকার আজও শক্তভাবে ধরে রেখেছে। অন্য দেশগুলোর সরকার সিরামিকশিল্প, কাপড়ের কল, ছোট ইস্পাত কারখানা, কেবলস ফ্যাক্টরি, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, জুট মিলস—এসব চালনা থেকে অনেক আগেই সরে এসেছে। শুধু সরতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদকে নষ্ট হতে দিচ্ছে সরকার অথবা ব্যবহার করতে গিয়ে চরম অদক্ষভাবে ব্যবহার করছে কিন্তু এই ক্ষতির দায় কাদের ওপর বর্তাচ্ছে? সাবেক অর্থমন্ত্রী মনে হয় এক ডজনবার বলেছিলেন, অমুক মাসের মধ্যে অমুক সরকারি কম্পানির এত এত শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বেচা হবে, কিন্তু সত্য হলো, গত ১০ বছরে সরকার থেকে একটি শেয়ারও বিক্রি করা হয়নি বা সম্ভব হয়নি। অথচ অন্য অনেক দেশ অচল বা অদক্ষ ব্যবস্থাপনা থেকে বাঁচতে সরকারি সম্পদগুলোকে বাজারদরে বিক্রি করে সংগৃহীত সেই অর্থ দিয়ে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিনির্মাণে হাত দিয়েছে। অবস্থা হলো, সরকারি কলকারখানার শেষ সম্পদটাও নষ্ট আর প্রাকৃতিকভাবে মরিচা পড়ে শেষ না হওয়া পর্যন্ত সরকার যেন সেগুলোকে বুক-এন্ট্রিতে  (book-entry) রেখে  দেবে। একদিন কোনো সার্ভেয়ার এসে যখন রিপোর্ট করবে ওগুলোর অস্তিত্ব নেই, তখনই শুধু সরকার সেগুলোকে বইয়ে লিখিত সম্পদের বিবরণী থেকে বাদ দেবে!

সময় থাকতে যারা সম্পদ বাঁচাতে জানে না, তাদের সম্পদ প্রকৃতিতে হারিয়ে যায়। তবে এমন বোকা লোক বা বোকা সরকার বিশ্বে এখন নেই বললেই চলে। আমাদের পুঁজিবাজারের একদিকে উন্নতি হলো তো অন্যদিকে ক্ষয় হয়। ১০ বছর আগেও দেশীয় কিছু কম্পানি বিনিয়োগকারী থেকে ভালো মুনাফা দিত, এখন সেগুলো পেছনে চলে গেছে। গত সাত-আট বছরে  IPO (Initial Public Offering) বেচে পুঁজিবাজারে অনেক  ক্ষত্রেই তালিকাভুক্ত হয়েছে। কিন্তু নিরেট সত্য হলো, ওগুলো দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত কোনো স্টকস  (stocks) নয়। আমাদের শেয়ারবাজারে কমবেশি ৩০০ কম্পানি তালিকাভুক্ত আছে। এসব কম্পানির মধ্যে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ কম্পানির স্টকস বা শেয়ার নিয়ে কিছু লোক শুধু জুয়া খেলে। কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে ওগুলোর মূল্য বাড়ানো হয়। যারা জুয়া পছন্দ করে, তারা ওই খেলায় অংশ নেয়, হারজিত তাদেরই। কিছু বিদেশি বিনিয়োগকারীও আমাদের বাজারে বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু তাদের পছন্দের তালিকায় বড়জোর ১০-১২টি স্টকস আছে। অন্য স্টকসগুলো তাদের বিশ্লেষণে ভুসি। তাদের অবস্থানই সত্য। আমরা ভুসি মার্কা  স্টকস দিয়ে আমাদের পুঁজিবাজারকে চালাতে চাচ্ছি। ভালো স্টককে বাজারে আনার জন্য কোনো প্রচেষ্টাই লক্ষ করা যায়নি। ফলে অবস্থা হলো জুয়াতাড়িত বাজার যেমন অতিসহজেই উত্তপ্ত হয়, অন্যদিকে এই বাজার শীতল হতেও বেশি দেরি লাগে না। শেয়ারবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেশির ভাগ লোক চায় যে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পাক। কিন্তু এরা যে ভুলের মধ্যে আছে এই অর্থে যে ঊর্ধ্বমুখী বাজার, এই বাজার টিকবে না। শুধু কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি করে বাজারকে ওপরে রাখতে গেলে সেই বাজারের উচ্চ অবস্থান ধরে রাখা কিছুতেই সম্ভব হবে না।

শেয়ারের মূল্য কোন স্তরে থাকবে সেটা মূলত নির্ভর করে কম্পানির আয় ও লভ্যাংশ প্রদানের ওপর। অন্য উপাদানগুলো অর্থনীতির সামগ্রিক চালচিত্র। এবং অন্য একটি উপাদান হলো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদের

(expectation) অবস্থান, শেয়ারের মূল্য পড়ে গেলে আমাদের মনে কষ্ট পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আসল কথা হলো, যে স্তর থেকে মূল্যটা পড়েছে ওই মূল্যই সেই স্তরে যাওয়া উচিত হয়েছে কি না সেটা দেখা। শেয়ারবাজারে শেয়ারের মূল্য সূচকে ওঠা-নামা হতে পারে, বরং ওঠা-নামার মধ্যেই বিনিয়োগকারীরা বেশি উৎসাহ পায় এবং যারা বিনিয়োগ করতে চায়, তারা তাদের কৌশলকে বাজারের উত্থান-পতনের আলোকে সাজিয়ে নেয়। মূল্য সূচকের ওঠা-নামা নিয়ে সরকারের মাথা ঘামানো উচিত নয়।  যেটা নিয়ে মাথা ঘামানো উচিত সেটা হলো বাজারটা সঠিকভাবে চলছে কি না সেটা দেখা। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাজারে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের জন্য অধিকসংখ্যক ভালো শেয়ার আছে কি না সেটা দেখা। আমাদের এই বাজারে ভালো শেয়ারের অভাবটাই বাজারের এই সময়ের জন্য বড় ইস্যু হওয়া উচিত। ২০০৯ সালের পর থেকে একটিও বহুজাতিক কম্পানির শেয়ার বাজারমুখী হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান রেগুলেটরি অনুশাসন অনুসারে তারা তাদের পরিশোধিত মূলধনের মাত্র ১০ শতাংশ

IPO-এর মাধ্যমে জনগণের কাছে বিক্রি করে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারে। সরকারকে অনুরোধ করব, তারা কেন শেয়ারবাজারে আসছে না সেটা দেখার জন্য। তারা যদি কিছু বাড়তি সুবিধা চায় সেটাও বিবেচনা করা হোক।

ভালো শেয়ারের সরবরাহের ভালো উৎস হলো বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ভালো ব্যবসা করছে এমন কম্পানিগুলোর শেয়ার। করপোরেট আয়কর বাংলাদেশে বেশিই বটে। অনুরোধ করব, অন্য দেশগুলো এ ক্ষেত্রে কী করছে সেটা দেখার জন্য। বেশি করহার বেশি রাজস্ব আয় আনবে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং উল্টোটাই সত্য। আশা করি, যেসব কম্পানি শেয়ারবাজারে আছে বা ভবিষ্যতে আসবে তাদের করপোরেট আয়কর কমানো হবে। শেয়ারবাজারটাকে অংশগ্রহণমূলক করতে হলে এর গভীরতা বাড়াতে হবে। বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সরবরাহ বাড়াতে হবে। আমরা শেয়ারবাজারের কথা বলি শুধু পুঁজি সংগ্রহের ভালো উৎস হিসেবে নয়, বরং এই বাজারই হলো একমাত্র মাধ্যম, যার মাধ্যমে অর্থনীতিতে লাভজনক ব্যবস্থাগুলোর অংশীদারি উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে দেওয়া যেতে পারে। যত দিন শেয়ারবাজারকে অংশগ্রহণমূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য করা না যাবে, তত দিনই উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণির সদস্যরা উচ্চ সুদ আয়ের আশায় সরকারের সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য অতি আগ্রহ দেখাবে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের যে বর্ধিত দায় জমা হচ্ছে, এর থেকে বাঁচার ভালো পথ হলো শেয়ারবাজারকে বিশ্বাসযোগ্য করা।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য