kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

মিশেল খসুদভ্‌স্কি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ‘বৃহৎ ইসরায়েল’

১৩ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ‘বৃহৎ ইসরায়েল’

‘ওদেদ ইনন পরিকল্পনা’য় বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এটি বর্তমান নেতানিয়াহু সরকার ও লিকুদ পার্টির বিভিন্ন গোষ্ঠীর আদর্শিক ভিত্তি; ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও।

‘শতকীয় সমঝোতা’য় (ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি) বৃহৎ ইসরায়েল প্রকল্পের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের স্বদেশে ‘প্রত্যাবর্তনের অধিকার’-এর দাবিকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। (প্রস্তাবিত) সমঝোতায় লেবাননে, জর্দানে, সিরিয়ায় ও ইরাকে বা অন্য দেশে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব দিতে বলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা শুধুই একটি জায়নবাদী পরিকল্পনা নয়, এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর উদ্দেশ্য মার্কিন আধিপত্যের বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিখণ্ডীকরণ (বলকানাইজেশন)। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ট্রাম্পের স্বীকৃতির উদ্দেশ্য হলো গোটা অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি। জায়নবাদের জনক থিওডর হার্জলের ধারণা অনুযায়ী, ইহুদি রাষ্ট্র ‘মিসরের নদী’ (নাহাল মিজরাইম; বেশির ভাগ পণ্ডিতের মতে, এটি ওয়াদি এল-আরিশ; প্রথাগত ইহুদি ধারণা অনুযায়ী এটি নীল নদ—বি.স.) থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত। রাব্বি ফিশমানের মতে, প্রতিশ্রুত ভূমি ‘মিসর নদী’ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত; সিরিয়া ও লেবাননের অংশবিশেষ এর অন্তর্ভুক্ত।

বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে (গাজা অবরোধের ঘটনাসহ), মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জায়নবাদী পরিকল্পনার সঙ্গে ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসন, ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধ, ২০১১ সালের লিবিয়া যুদ্ধ এবং সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরবের রাজনৈতিক সংকটের কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন নেই।

আরব দেশগুলোকে দুর্বল করে ক্রমান্বয়ে বিখণ্ডিত করা ‘বৃহৎ ইসরায়েল প্রকল্প’-এর অংশ। এতে ন্যাটো ও সৌদি সমর্থন রয়েছে। এটি মার্কিন-ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদী প্রকল্পেরই অংশ। সৌদি-ইসরায়েলি সুসম্পর্ককে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলি প্রভাববলয় বাড়ানোর এবং ইরানের সঙ্গে বিরোধ বাধানোর উপায় হিসেবে দেখেন নেতানিয়াহু।

স্টিফেন লেন্ডমানের মতে, প্রায় এক শতাব্দী আগে ‘ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন’ একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিল। সে রাষ্ট্রে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন (ব্রিটিশ ম্যান্ডেট); সিদন ও লিতানি নদী পর্যন্ত দক্ষিণ লেবানন; সিরিয়ার গোলান মালভূমি, হাওরান সমতল ও দেরা এবং দেরা থেকে আম্মান পর্যন্ত হেজাজ রেলওয়ের নিয়ন্ত্রণসহ জর্দান ও আকাবা উপসাগর অন্তর্ভুক্ত। কিছু জায়নবাদী বলে, নীল নদ উপত্যকা থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় পশ্চিম সিরিয়া ও তুরস্কের দক্ষিণাংশও পড়ে।

ইহুদি বসতি নির্মাণ জায়নবাদী প্রকল্প-সমর্থিত। এ প্রকল্পের মূলনীতি হলো ফিলিস্তিনকে ফিলিস্তিনিশূন্য করা এবং ক্রমান্বয়ে পশ্চিম তীর ও গাজাকে ইসরায়েলভুক্ত করা। বৃহৎ ইসরায়েল বেশ কয়েকটি ‘নকল’ (প্রক্সি) রাষ্ট্রের জন্ম দেবে। ইরাক ও সৌদি আরবের বেশকিছু অংশও এর অন্তর্ভুক্ত হবে।

২০১১ সালে গ্লোবাল রিসার্চে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মাহদি দারিয়ুস নাজেমরোয়া বলেছিলেন, ইনন পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী নকশার ধারাবাহিকতা। এটি আঞ্চলিক আধিপত্য নিশ্চিত করার ইসরায়েলি কৌশলগত পরিকল্পনা। এতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলকে অবশ্যই তার ভূ-রাজনৈতিক প্রতিবেশ পুনর্বিন্যস্ত করে নিতে হবে—বলকানাইজেশন প্রক্রিয়ায় আশপাশের আরব রাষ্ট্রগুলোকে ক্ষুদ্র ও দুর্বল রাজ্যে বিখণ্ডিত করে।

ইসরায়েলি কৌশলবিদরা মনে করেন, ইরাক বড় কৌশলগত বাধা। তাই মধ্যপ্রাচ্য ও আরব ভূমির বিখণ্ডীকরণের জন্য ইরাককেই মূল লক্ষ্য গণ্য করা হয়। ইরাককে একটি কুর্দি ও দুটি মুসলিম রাষ্ট্রে ভাগ করার আওয়াজ তোলেন ইসরায়েলি কৌশলবিদরা। দুটি মুসলিম রাষ্ট্রের একটি সুন্নিদের, অন্যটি শিয়াদের জন্য। এ লক্ষ্যেই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইরাক ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বাধানো হয়।

ওদেদ ইনন পরিকল্পনায় লেবানন, মিসর ও সিরিয়ার বিভাজনের কথাও বলা হয়েছে। ইরান, তুরস্ক, সোমালিয়া ও পাকিস্তানের খণ্ডীকরণও ইনন-পরিকল্পনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ওই পরিকল্পনায় উত্তর আফ্রিকার বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর অবসানের কথা রয়েছে। প্রথমে মিসর, অতঃপর সুদান, লিবিয়া ও অবশিষ্ট অঞ্চলের বিলুপ্তি ঘটবে। পরিকল্পনাটির দুটি প্রেক্ষিত। টিকতে হলে ইসরায়েলকে অবশ্যই ১) আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হতে হবে এবং ২) বিখণ্ডীকরণ করে সব আরব রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটাতে হবে। এ বিভাজন নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিভাজন রেখা বরাবর হবে। এসব ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের ‘আশ্রিত’ হবে। ইসরায়েল হবে সেগুলোর নৈতিক বৈধতার উৎস। এটি নতুন কোনো ভাবনা নয়; বরং একটি চলমান পরিকল্পনা। সিরিয়া ও ইরাকে চলমান যুদ্ধ ইসরায়েলের সম্প্রসারণবাদী প্রক্রিয়ারই অংশ। রাশিয়া, ইরান ও হিজবুল্লাহর সহায়তায় সিরীয় বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র (ও ইসরায়েল) সমর্থিত সন্ত্রাসীদের (আইএস, আল নুসরা) পরাজিত করে ইসরায়েলের পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছে।

লেখক : কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক; সেন্টার ফর রিসার্চ অন গ্লোবালাইজেশনের সভাপতি ও পরিচালক

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য