kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

চীন-রাশিয়া কৌশলগত অংশীদার

অনলাইন থেকে

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে রাশিয়া গেছেন। মস্কোতে পৌঁছানোর পর তাঁকে স্বাগত জানান রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এর মধ্য দিয়ে দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতার একটি প্রদর্শনী হয়ে গেল—বিষয়টি এমন নয়। গত ছয় বছরে তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩০ বার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি বহুবার পুতিনকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও বন্ধু হিসেবে অভিহিত করেছেন।  

এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, দেশ দুটি কৌশলগত সহযোগী হিসেবে নিজেদের সম্পর্ক দৃঢ় করেছে। এই সম্পর্ক একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনৈতিক কাঠামো গড়ে দিতে পারে। শি ও পুতিন এ সপ্তাহে বার্ষিক সেন্ট পিটার্সবার্গ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরামের বৈঠকে অংশ নিয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি ইউরেশিয়ার উন্নয়ন এবং সার্বিকভাবে বৈশ্বিক উন্নয়নে সহায়ক হবে। 

আলাদা করে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মস্কো ও বেইজিং তাদের মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পাদন করছে। বিনিময়ের মুদ্রা হিসেবে তারা ডলার ব্যবহার করছে না। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের ‘কর্তৃত্বমূলক নিয়ন্ত্রণ’ খর্ব করতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ওয়াশিংটন বহুবার অন্য দেশের ওপর নিজের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে ডলার ছাপা বৃদ্ধি বা কমিয়ে রেখে তাদের এই সুবিধাজনক অবস্থান ব্যবহার করেছে। এই অপব্যবহার বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। এবং রাশিয়া ও চীনের আন্তর্জাতিক আর্থিক ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় এই নতুন ও অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ সে পরিস্থিতিকেই সুনিশ্চিত করতে পারে। 

সহযোগিতা ও অংশীদারির যে অবস্থান পুতিন ও শি গ্রহণ করেছেন, তা পারস্পরিক সম্মান ও শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। বিষয়টি যে শুধু এ দুটি দেশকেই উপকৃত করবে তা নয়; বরং বহুজাতিক তত্ত্বে বিশ্বাসী সব দেশই এতে সুবিধা পাবে। এভাবেই রাশিয়া ও চীনের এই জোট পৃথিবীর শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে রাখবে।

এমন একসময় বিষয়টি নজরে এলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বে তাদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে উদ্বেগ আর উত্তেজনার ভাণ্ড উপুড় করে ঢালছেন। রাশিয়া ও চীনসহ বহু দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। হুমকি-ধমকি তো চলছেই। এই তালিকা থেকে এমনকি ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলোও বাদ পড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রের এই পথ শুধু ব্যর্থই নয়, এই মানসিকতা চূড়ান্তভাবে ধ্বংস আর যুদ্ধকেই উসকে দিচ্ছে। এটি এমন একটি পথ, যেখানে কারো পক্ষেই জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। 

এই মনোভাবের পরিণতি ইতিহাস আমাদের এরই মধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে। বিংশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থপর বৈরী মানসিকতার কারণে দুটি বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গেছে। যেখানে মারা পড়েছে প্রায় ১০ কোটি মানুষ। এসব সহিংসতায় চীন ও রাশিয়া ভুগেছে সবচেয়ে বেশি। সংঘাতের ভয়াবহতার জন্য কতটা মূল্য চুকাতে হয় তা তারা জানে। শান্তি কতটা মূল্যবান তাও তাদের জানা আছে। এ কারণেই এই দুই দেশ যখন মানুষের অভিন্ন কল্যাণে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় তখন বিষয়টি উৎসাহব্যঞ্জক হয়ে দাঁড়ায়।

পুতিন আর শি যখন এ সপ্তাহে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ব্যস্ত তখন যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু পশ্চিমা দেশ সময় পার করছে অতীতের কথা স্মরণ করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও আরো কয়েকজন নরম্যান্ডিতে ১৯৪৪ সালে মিত্রবাহিনীর অবতরণের ৭৫তম বর্ষপূর্তি উদ্যাপন করছেন। পশ্চিমারা মনে করে, নাৎসি অধ্যুষিত ইউরোপে ওই অবতরণের পরই পশ্চিমাদের জয় শুরু হয়। এরই জের ধরে ১৯৪৫ সালের মে মাসে চূড়ান্ত জয় আসে। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাফল্যের সূত্র এতটা সরল নয়। নাৎসি জার্মানদের পরাজিত করতে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মি এবং দেশটির সাধারণ নাগরিকদের আত্মত্যাগও জড়িয়ে রয়েছে। যুদ্ধের মোড় ঘুরে গিয়েছিল ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ওই সময় স্তালিনগ্রাদের লড়াইয়ে সোভিয়েত সেনাদের হামলায় নাৎসি বাহিনী বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে। ডি-ডের ১৬ মাস আগের ঘটনা এটি।

পশ্চিমা নেতারা অতীতের কথা স্মরণ করে যেকোনো সময় তৃপ্তির ঢেকুর তুলতেই পারেন। তবে তা ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো পাল্টে দেবে না। সত্য সত্যই থেকে যাবে। আর যারা ইতিহাসের ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না তারা ওই ভুলগুলো আবারও করে। সমাধানহীন সমস্যায় ফেঁসে যাওয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটায় তারা। বাস্তবিক অর্থেই এরা পুরনো কালের মানুষ। অন্যদিকে পুতিন বা শি ডি-ডের স্মৃতিকাতরতায় আটকে নেই। বিংশ শতাব্দীর এই ভ্রান্ত গর্বের স্মৃতিকাতরতা পলায়নপর প্রবৃত্তিরই নামান্তর। এই বিভ্রান্তিতে পড়েননি শি বা পুতিন। তাঁরা মনোযোগী হয়েছেন একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী জোট গঠনের দিকে।  

 

সূত্র : স্ট্র্যাটেজিক কালচার

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য