kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

উন্নয়ন ভাবনা, এসডিজি ও আসন্ন বাজেট

মোস্তফা মোরশেদ

১২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



উন্নয়ন ভাবনা, এসডিজি ও আসন্ন বাজেট

উন্নয়ন একটি বহুমুখী ধারণা। অর্থনীতির একটি নতুন শাখা হিসেবে ১৯৪০-এর দশকে এর যাত্রা শুরু হয়। খুব স্পষ্ট করে বললে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসন শেষে পরিবর্তিত পৃথিবীতে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের হাত থেকে রক্ষা করতে নতুন তত্ত্ব ও মডেলের সমন্বয়ে নতুন এ ধারার আলোচনা শুরু হয়, যাকে অনেকেই ব্রিটিশদের সৃষ্টি  (British Affair) বলে অভিহিত করেন। সংক্ষেপে বললে উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত সব চলকের ইতিবাচক পরিবর্তন এবং সামগ্রিকভাবে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। এক. উন্নয়ন জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, দুই. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উন্নয়নের জন্য প্রতিটি দেশের আলাদা আলাদা কৌশল থাকবে যদিও অনেক ক্ষেত্রেই আমরা উন্নয়নের তত্ত্ব ও মডেলকে সবার জন্য একইভাবে  (generalize) ব্যবহার করার চেষ্টা করে থাকি। সম্পদের ভিন্নতা থাকায় প্রতিটি দেশের আলাদা ভিশন থাকা স্বাভাবিক এবং সে বাস্তবতায় প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা কৌশল থাকাই যুক্তিযুক্ত। তিন. ১৯৪০-এর দশক থেকে আজ অবধি প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়নের সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়েছে। শুরুতে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্বারা উন্নয়নকে পরিমাপ করা হলেও কালের পরিক্রমায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, দারিদ্র্যের প্রভাব ইত্যাদি বিষয় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে। উন্নয়নকে টেকসই রূপ দিতে ১৯৮০-এর দশক থেকে পরিবেশ সুরক্ষার দিকটি জোরালোভাবে উঠে আসে।

প্রায় আট দশক আগে শুরু হওয়া উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বৈশ্বিকভাবে সফল রূপ দিতে ২০০১ সাল থেকে ১৫ বছর মেয়াদে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) দলিল তৈরি করা হয়, যা অনেক দিক থেকেই সমালোচিত। এমডিজির স্থলাভিষিক্ত হওয়া নতুন এ উন্নয়ন দলিলে ১৭টি গোল বা লক্ষ্যমাত্রা ১৬৯টি টার্গেট এবং ২৪১টি ইনডিকেটর নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ পর্যায়ে এসডিজির (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দ্বারা উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। কারণ বিশ্বব্যাপী এসডিজি বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালে সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীকে একটা বাসযোগ্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। এমডিজি থেকে এসডিজিতে উত্তরণের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে আমরা আংশিক থেকে সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছি।

এসডিজি হলো এমডিজির সম্প্রসারিত ও হালনাগাদ রূপ। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিসহ টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য, উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকসহ জীবনের সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। এমডিজির চেয়ে এসডিজির গোলসংখ্যা বেশি হওয়া দুটি বিষয় নির্দেশ করে—এক. উন্নয়ন যেহেতু মানুষের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সব চলকের সঙ্গে সম্পৃক্ত; তাই এসডিজিতে অনুপস্থিত অনুষঙ্গগুলো সন্নিবেশিত করা হয়েছে, যার ফলে গোলসংখ্যা দিগুণের চেয়ে বেশি বেড়ে গিয়েছে; এবং দুই. ইতিবাচকভাবে চিন্তা করলে এমডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পৃথিবীর দেশগুলো একধরনের সক্ষমতা অর্জন করেছে, যার ফলে এখন আরো বেশি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।

এসডিজি আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে যে বিষয়টি চলে আসে, তা হলো বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। প্রসংগত, এসডিজির ১৭টি গোলের মধ্যে কিছু গোল সক্রিয়করণকারী  (enabler), কিছু গোল একে অন্যকে সমৃদ্ধকারী (synergy) এবং কিছু গোল অন্য কোনো গোলের প্রতিবন্ধক (trade-off)| যেগুলো অন্য গোলকে সামনে এগিয়ে নিচ্ছে  (enabler এবং synergy) সেগুলো নিয়ে কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু যে গোলগুলো বাস্তবায়িত হলে অন্য গোল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কিংবা লক্ষ্য পূরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সেগুলো বাস্তবায়নে অধিক মনোযোগ দিতে হবে।

গোলগুলো বাস্তবায়নে আমাদের প্রচেষ্টার মাত্রা অনেক বেশি হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ এমডিজি গোল-১ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ৫০ শতাংশ হ্রাস করার যে প্রয়াস তা থেকে এসডিজি গোল অনুসারে দারিদ্র্যকে একেবারে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা অনেক বেশি কষ্টসাধ্য। অনেক স্বল্পোন্নত দেশের জন্য যা প্রায় অসম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিটি দেশকে খেয়াল রাখতে হবে যেন দেশীয় অগ্রাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লক্ষ রাখতে হবে, এসডিজিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে আমরা যেন ভিশন-২০২১ এবং ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নের রূপরেখা থেকে বিচ্যুত না হই। পরিকল্পনা কমিশন এরই মধ্যে আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজিকে সমন্বয় করেছে। এত বেশি গোল বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ সম্পদ লাগবে তা কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়ে এসডিজি আলোকপাত করেনি। সম্পদ ব্যবস্থাপনার সবটুকু কাজ নিজ নিজ দেশকে করতে হবে, যা হবে একটি অর্থনৈতিক যজ্ঞ। এমডিজি বাস্তবায়নে যেখানে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ কিংবা ওইসিডি দেশগুলোর বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভর করা হয়েছিল, সেখানে এসডিজি বাস্তবায়নে নিজস্ব সম্পদ আহরণকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এটা ভালো দিক যে আন্তর্জাতিকভাবে বৈদেশিক সহায়তা কার্যক্রম কমে যাওয়ায় সবাই নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভর করে তার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। কিন্তু স্বল্পোন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো কিভাবে এত সম্পদ আহরণ ও ব্যবস্থাপনা করবে—এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের উদাহরণ নিলে দেখা যায়, ২০১৭-৩০ সময়ে স্থিরমূল্যে (২০১৫-১৬ সালের হিসাবে) এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৯২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, যা ক্রমপুঞ্জীভূত জিডিপির ১৯.৭৫ শতাংশ।

অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় আমরা আশাবাদী, কারণ বর্তমান সরকারের নতুন মেয়াদে এটাই প্রথম বাজেট। আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য প্রাথমিকভাবে বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা; যা চলতি অর্থবছরের চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেটের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক শক্তি বিবেচনায় এ বাজেট যথার্থ, তবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বিবেচনায়, বিশেষ করে এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন খাতভিত্তিক বরাদ্দ নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এসডিজির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শিক্ষা খাতের ব্যয় ২০২০ সালে জিডিপির ৩ শতাংশ, ২০২৫ সালে ৪ শতাংশ এবং পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালে ৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। একইভাবে ২০৩০ সালে স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় জিডিপির ৪-৫ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। অনেক ক্ষেত্রেই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মোট ব্যয়ের ৬৫-৭০ শতাংশ এসডিজি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যা বাড়ানোরও তাগিদ রয়েছে। এ ছাড়া কর-জিডিপির অনুপাত এ পর্যায়ে ন্যূনতম ১৬ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ২০৩০ সালে ২৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এতে করে উন্নয়ন ব্যয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও স্বত্ব তৈরি হবে। আমাদের মোট কর্মসংস্থানের ১৫-২০ শতাংশকে শোভন হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে, যাকে ৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। চলমান অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের অধিক হবে এবং ২০৩০ সালের অনেক আগেই তা দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে যাবে, যা নিশ্চিতভাবে এসডিজি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে এ কথা মাথায় রাখতে হবে, এসডিজি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে সরকার ঘোষিত রূপকল্প-২০৪১ অর্জনেই আমাদের অধিক মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

[email protected]

 

মন্তব্য