kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

টেলিভিশনে ঈদের অনুষ্ঠান

ফরিদুর রহমান

৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টেলিভিশনে ঈদের অনুষ্ঠান

সত্তরের দশকের শেষ ভাগ থেকে আশির দশকের পুরোটা জুড়েই দুটি ঈদে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠানমালা দেশের মানুষের ঈদ উৎসবের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছিল। সব আয়োজনের প্রধানতম আকর্ষণ ঈদের আনন্দ মেলা এবং ঈদের বিশেষ নাটক প্রচারের দীর্ঘ সময় আগে থেকেই অসংখ্য দর্শক টেলিভিশন সেটের সামনে ভিড় জমাত। সে সময় ঘরে ঘরে টেলিভিশন সেট ছিল না। ফলে প্রতিবেশীর বাড়িতে, পাড়ার ক্লাবঘরে, এমনকি গ্রামের কোনো স্কুলে টিভি সেট এবং বিদ্যুতের অভাবে চাঁদা তুলে ব্যাটারি ভাড়া করে এনে ঈদের অনুষ্ঠান দেখার ব্যবস্থা করা হতো। বিজ্ঞাপনের দীর্ঘ বিরতির অপেক্ষা সত্ত্বেও গভীর রাত পর্যন্ত এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করেছে অসংখ্য দর্শক।

টেলিভিশন সম্প্রচারের সাদা-কালো যুগে অথবা সবে সাদা-কালো থেকে রঙিন জগতে উত্তরণের সেই সদ্য শৈশব পেরোনো টেলিভিশনমাধ্যমে দর্শক আকর্ষণের প্রধানতম কারণ ছিল বিষয় নির্বাচনে অভিনবত্ব, সৃজনশীলতা এবং পেশাদারির সমন্বয়। অতীতের ঈদের অনুষ্ঠানসূচির দিকে ফিরে তাকালে চোখে পড়ে, সর্বোচ্চ তিন দিন ধরে প্রচারিত এসব অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও নির্মাণে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতিজগতের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক, পাণ্ডুলিপি রচয়িতা, সংগীত পরিচালক ও অংশগ্রহণকারীদের জনপ্রিয়তা এবং নিজস্ব প্রতিভার সঙ্গে প্রযোজকের মেধা ও নির্মাণকুশলতা যুক্ত হয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব অনুষ্ঠান দর্শকের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে।

সংগীতানুষ্ঠানে প্রায় নিয়মিতই নতুন গান নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন বা রুনা লায়লার মতো বরেণ্য শিল্পী। আনন্দ মেলাগুলো উপস্থাপন করেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আনিসুল হক, জুয়েল আইচ, আফজাল হোসেন কিংবা আবেদ খান। নাটক লিখেছেন আবদুল্লাহ আল মামুন, হুমায়ূন আহমেদ ও মামুনুর রশীদের মতো নাট্যকার। আমজাদ হোসেন ঈদে তাঁর ‘জব্বর আলী’ সিরিজের নাটক পরিবেশনের মধ্য দিয়ে একটি ধারার সৃষ্টি করেছিলেন। এ ছাড়া তারকাদের কথোপকথন, ব্যান্ড শো, হাস্যকৌতুক এবং ছোটদের অনুষ্ঠান নির্মাণেও সৃজনশীলতা, রুচি ও বৈচিত্র্যের ছাপ বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।

নব্বইয়ের দশকের প্রায় শেষ দিকে এসে টেলিভিশন সম্প্রচারের ক্ষেত্রে যুক্ত হতে থাকে নতুন নতুন স্যাটেলাইট চ্যানেল। এসব টেলিভিশন যেহেতু প্রধানত বাণিজ্যিক কারণে প্রতিষ্ঠিত, সে ক্ষেত্রে সহজেই অনুমান করা যায়, স্বল্প ব্যয়ে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনই এসব চ্যানেলের প্রধান লক্ষ্য। তবে প্রকৃতপক্ষে ৩০ থেকে ৩২টি চ্যানেল নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে মুনাফা অর্জন তো দূরের কথা, অনেকের পক্ষে টিকে থাকাও বর্তমানে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রচারের ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে চ্যানেলগুলোর আয়ের প্রধান উৎস বিভিন্ন পণ্য ও সেবার বিজ্ঞাপনের অর্থ। একটি নির্ধারিত অঙ্কের বিজ্ঞাপন প্রতিযোগীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়ে নিত্যদিনের সম্প্রচার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় বরাদ্দের সংগতি অনেক চ্যানেলেরই নেই। নেহাত অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনে ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী ১০ দিন ধরে অনুষ্ঠান প্রচারের যে প্রতিযোগিতা চলে, তার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আছে বলে আমার জানা নেই।

প্রশ্ন হলো, ৩০টি টেলিভিশন চ্যানেলে ১০ দিন ধরে লাগাতার মানসম্পন্ন বিনোদনের জোগান দেওয়ার মতো বিপুলসংখ্যক নাট্যকার, অভিনেতা, সংগীতশিল্পী, পরিচালক ও কলাকুশলী কি গত ৩০ বছরে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নিয়ে প্রস্তুত হতে পেরেছেন? যদি সত্যি তা না হয়ে থাকে, তাহলে শুধু টেলিভিশনের পর্দা পূর্ণ করার জন্য বিনোদনের এই আদিখ্যেতা কেন? স্বল্পসংখ্যক ব্যতিক্রম বাদ দিলে নিম্নমানের গতানুগতিক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, অক্ষম নাট্যকারের কষ্টকল্পিত নাটক, হাস্যরসের নামে স্থূল ভাঁড়ামি এবং সংগীতের ক্ষেত্রে পরিবেশিত কণ্ঠের চেয়ে শিল্পীর চেহারা, সাজপোশাক ও সেট-লাইটের জাঁকজমকই প্রাধ্যান্য পেয়ে আসছে। এসব অনুষ্ঠানের নির্মাণপ্রক্রিয়ায় প্রকৃত নির্মাতা ও সৃজনশীল মানুষদের যুক্ত না করে টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই পরিকল্পনা, গ্রন্থনা, উপস্থাপনা এবং অনেক সময় সংগীত পরিবেশন ও নাটক রচনায় নেমে পড়েছেন। এর ফলে অবশ্য ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি এসব বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব বছরে অন্তত এক-দুইবার নিজেদের ক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ গ্রহণ করেন।

মিডিয়াজগতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছাড়াও আজকাল প্রায় প্রত্যেকেই জানেন, টেলিভিশনকে বলা হয়ে থাকে ইলেকট্রনিক হাঙর। একটি অনুষ্ঠান একবার প্রচারের পরপরই তা পুরনো হয়ে যায়; কিন্তু দর্শক সব সময়ই নতুন অনুষ্ঠান এবং আরো নতুন কিছু চায়। নিয়মিত দর্শকের এই বিপুল চাহিদা পূরণ করে একটি টেলিভিশনকেন্দ্র সচল রাখা সত্যি চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। অন্যদিকে প্রচলিত সম্প্রচার ব্যবস্থার বাইরে নিউ মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান শক্তি টেলিভিশনের অস্তিত্বই বিপন্ন করে তুলেছে। সে ক্ষেত্রে ঈদের সময় সাত থেকে ১০ দিন ধরে লাগাতার দর্শকের বিরক্তি উৎপাদন না করে বিকল্প কিছু অবশ্যই ভাবতে হবে। আর তা সম্ভব না হলে যেসব দর্শক ঘন ঘন চ্যানেল পরিবর্তন করে হলেও অনুষ্ঠানে চোখ রাখছে, তারা হয়তো একসময় শুধু রিমোট কন্ট্রোল নয়, পুরো টেলিভিশন সেটই ছুড়ে ফেলবে!

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান), বাংলাদেশ টেলিভিশন 

 

মন্তব্য