kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে পুকুরচুরি

ইসহাক খান

২৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে পুকুরচুরি

নেত্রকোনা শহরে এক ধরনের মিষ্টি পাওয়া যায়—নাম বালিশ মিষ্টি। দোকানের নাম ‘গয়ানাথের বালিশ মিষ্টি’। গয়ানাথ বাবুর নামানুসারে দোকানের নাম—‘গয়ানাথের বালিশ মিষ্টি’। গয়ানাথ বাবু বেঁচে নেই। তাঁর উত্তরাধিকাররা দোকানটি পরিচালনা করছেন। মিষ্টির আকার বালিশের মতো হওয়ায় সম্ভবত মিষ্টির নাম বালিশ মিষ্টি। একটি মিষ্টি এক কেজি, আধা কেজি, আড়াই শ গ্রাম থেকে এক শ গ্রাম পর্যন্ত হয়। খেতেও সুস্বাদু।

আমার আলোচনার বিষয় গয়ানাথের বালিশ মিষ্টি নয়। তাহলে এই বালিশ মিষ্টির অবতারণা কেন?

কারণ অবশ্যই আছে। ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বালিশ নিয়ে বড় বেশি কেচ্ছা-কাহিনি চলছে। নানাভাবে নানা আঙ্গিকে ঘুরেফিরে আসছে বালিশ প্রসঙ্গ। যে যেমন পারছে, তেমন করে রস ঢেলে দিচ্ছে বালিশ প্রসঙ্গে। সাধারণ একটি বালিশ লেখার বিষয় এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে না ঢুকলে বিশ্বাস করতে পারতাম না।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পে ২০ ও ১৬তলা ভবনের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা এবং ভবনে উঠানোর কাজে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। বেশি তোলপাড় এবং রসাল মন্তব্য চলছে বালিশ নিয়ে। একটি বালিশ ক্রয় করা হয়েছে ৯ হাজার ৯৫৭ টাকায়। এবং সেই বালিশ ভবনে তুলতে প্রতিটি বালিশে খরচ ধরা হয়েছে ৭৬০ টাকা। এবার ভাবুন, আলোচনায় রূপপুর প্রকল্পের বালিশের কাছে গয়ানাথের বালিশ মিষ্টি কি ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে? অনেকে এ ঘটনাকে রূপকথার গল্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কেউ বলছেন, সরকারি টাকার হরিলুট চলছে। কেউ রস করে বলছেন, ‘নালিশ করে বালিশ পেলাম’।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পের ১১০টি ফ্ল্যাটের জন্য অস্বাভাবিক মূল্যে আসবাব কেনা এবং ভবনে উঠানোর ঘটনা অনুসন্ধানে নামছে দুদক। গৃহায়ণ এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে এ ঘটনা তদন্তের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই অস্বাভাবিক খরচের বিষয়ে গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, ‘এ ঘটনা আমিও জেনেছি। জানার পর পিডাব্লিউডির চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে রবিবারের মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বলেছি। তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দিয়েছি।’

শুধু যে বালিশ ক্রয়ে অস্বাভাবিক মূল্য ধরা হয়েছে তা-ই নয়। একটি বৈদ্যুতিক চুলার দাম ধরা হয়েছে সাত হাজার ৭৪৭ টাকা। এবং উঠানোর খরচ প্রতিটি ছয় হাজার ৬৫০ টাকা। বৈদ্যুতিক কেটলি পাঁচ হাজার ৩১৩ টাকা। উঠানো দুই হাজার ৯৪৫ টাকা। রুম পরিষ্কারের মেশিন ১২ হাজার ১৮ টাকা। উঠানো ছয় হাজার ৬৫০ টাকা। ইলেকট্রিক আয়রন চার হাজার ১৫৪ টাকা, উঠানো দুই হাজার ৯৪৫ টাকা। টেলিভিশন ৮৬ হাজার ৯৭০ টাকা, উঠানো সাত হাজার ৬৩৮ টাকা। ফ্রিজ ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা, উঠানো ১২ হাজার ৫২১ টাকা। বালিশ পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা, উঠানো ৭৬০ টাকা। ওয়ার্ডরোব ৫৯ হাজার ৮৫৮ টাকা, উঠানো ১৭ হাজার ৪৯৯ টাকা। মাইক্রোওয়েভ ৩৮ হাজার ২৭৪ টাকা, উঠানো ছয় হাজার ৮৪০ টাকা। খাট ৪৩ হাজার ৩৫৭ টাকা, উঠানো ১০ হাজার ৭৭৩ টাকা। বিছানা পাঁচ হাজার ৯৮৬ টাকা, উঠানো ৯৩১ টাকা।

আমাদের নৈতিক চরিত্রের এতটাই অবক্ষয় হয়েছে যে দুর্নীতিতে আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা অন্ধ হয়ে গেছেন। তাঁরা রাতকে দিন বানাচ্ছেন আর দিনকে রাত। না হলে একটি বালিশ কিনতে তাঁদের ছয় হাজার টাকা খরচ করতে হবে। আর যিনি বা যে কর্মকর্তা এই অঙ্ক রেজিস্টার খাতায় তুলেছেন তাঁর কি একবারও মনে হয়নি এই অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে সবাই প্রশ্ন তুলবে। এমনকি তদন্ত হলে চাকরিও চলে যেতে পারে। মোদ্দা কথা, সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল—এই নীতিতে দেশ আচ্ছন্ন। যে যেখানে পারছে লুটে নিচ্ছে দেশের সম্পদ। সবাই ধরে নিয়েছে সরকারি তহবিল তছরুপ করলে কিছু হয় না। অতীতেও কিছু হয়নি। এখনো কিছু হবে না। কিন্তু সমস্যা বাধল দেশের সচেতন মানুষজনকে নিয়ে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে এই তথ্য চালাচালি করে দেশে ঝড় বইয়ে দিল। আর তাতেই সরকারের কর্তাব্যক্তিদের টনক নড়ল।

আমার বিশ্বাস, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের পুকুরচুরি নিয়ে দেশের মানুষ প্রতিবাদী না হলে এ ঘটনা স্বাভাবিক নিয়মে একদিন তামাদি হয়ে যেত। সবখানেই ম্যানেজ করে ফেলার প্রবণতা লক্ষণীয়। এখানেও সহজেই ম্যানেজ করে ফেলতেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা। যেদিন থেকে দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স শব্দ ব্যবহার শুরু হয়েছে, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুর্নীতির মাত্রাও।

ভাবা যায়, যেখানে একজন লেবারের সারা দিনের শ্রমের মূল্য ৪০০ টাকার বেশি নয়, সেখানে একটি বালিশ ভবনের কয়েক তলা ওপরে উঠানো বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ৭৬০ টাকা। এটাকে পুকুরচুরি না বলে সমুদ্রচুরি বলাই সংগত। বোধ করি ব্যাকরণে পুকুরচুরির পাশাপাশি এখন থেকে সমুদ্রচুরি শব্দটিও সংযুক্ত রাখা দরকার। যেভাবে প্রকল্পের খরচ বাড়ছে আর আমাদের কর্মকর্তারা মহানন্দে সেই অর্থ নিজেদের পকেটস্থ করছেন, তাতে সমুদ্রের চেয়ে ভারী কোনো শব্দও হয়তো আগামী দিনে ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।

আমরা ভেবে পাই না, সরকারপ্রধান যেখানে দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন, তার পরও সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতি করার সাহস পান কিভাবে?

এসবই হচ্ছে আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়ার কারণে। সর্বত্র বিশৃঙ্খলা। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতিমুক্ত নয়। ব্যাংক ফাঁকা হয়ে গেছে। একজন সচিব ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে চেতনার বিরুদ্ধে মহা অপরাধ করলেন তার কোনো বিচার হলো না। মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যে পদক দেওয়া হলো সেই পদকে যারা স্বর্ণের পরিবর্তে তামা দিয়ে দেশকে ছোট করল তাদের কোনো বিচার হলো না। অথচ একজন কৃষক সামান্য ১০ হাজার টাকা ঋণ শোধ করতে না পারায় তাকে কোমরে দড়ি বেঁধে হাজতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর যারা হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি তাদের আরো ঋণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাদের কোনো শাস্তি হচ্ছে না। শাস্তির পরিবর্তে তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এই অনিয়মের অবসান না হলে দেশ কখনো স্বাভাবিক গতিতে চলবে না। চলতে পারে না।

এখন দেখার বিষয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে যারা সমুদ্রচুরি করল তাদের কী বিচার করে সরকার। একজন সাধারণ ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লিখেছেন, যদি এই চুরির বিচার সরকার না করে, তাহলে ধরে নিতে হবে এই চুরির সঙ্গে সরকারের রুই-কাতলারা জড়িত।

আপাতত আমরা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে চাচ্ছি না। আমরা পর্যবেক্ষণ করছি সরকার কী করে তা দেখার জন্য। পূর্তমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আশা করছি, এত বড় ঘটনা বেমালুম চেপে যাবে না সরকার। তারা এই ভয়াবহ দুর্নীতির শিকড় উৎপাটন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবে। দেশবাসীসহ আমাদের এমনই প্রত্যাশা।

 

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার

মন্তব্য