kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

বুদ্ধপূর্ণিমার আলোকে : বৌদ্ধ ধর্ম

ভদন্ত বুদ্ধানন্দ মহাথেরো

১৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



প্রথমে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি দিয়েই শুরু করছি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আমি যাঁকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি, আজ এই বৈশাখী পূর্ণিমায় তাঁর জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি। এ কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের উপকরণগত অলংকার নয়, একান্তে নিভৃতে যা তাঁকে বারবার সমর্পণ করেছি। সেই অর্ঘ্যই আজ এখানে উৎসর্গ করি।’

শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা বিশ্বমানবের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। এই পূর্ণিমার শুভক্ষণে মহামানব গৌতম বুদ্ধ পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, আবার এই শুভলগ্নে তিনি পরম বুদ্ধত্ব এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত এই পূর্ণিমা গোটা বিশ্বের মানুষের জন্য স্মরণীয় ও বরণীয় তিথি।

জাতিসংঘ মহামানব গৌতম বুদ্ধের প্রবর্তিত পঞ্চশীলের নীতিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে মনেপ্রাণে ধারণ করে এবং সংবিধানে লিপিবদ্ধ করে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। মহামানব বুদ্ধ বিশ্বশান্তির দূত হিসেবে জাতিসংঘ শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা বা বৈশাখী পূর্ণিমাকে আন্তর্জাতিক বৈশাখ দিবস ঘোষণা করেছে।

মহামানব বুদ্ধের আবির্ভাব উপমহাদেশে এক যুগান্তকারী ঘটনা। কেননা যাক-যজ্ঞ, বলি-হোম ইত্যাদি পূজা-অর্চনায় ভারতের আকাশ ছিল ধোঁয়াচ্ছন্ন। শুধু পূজা নয়, জাতিভেদ, বর্ণবৈষম্য ও বিভিন্ন কুসংস্কার প্রথায় ভারতের বুক ছিল কলুষিত। তারই বিরুদ্ধে বিপ্লবী কণ্ঠ উচ্চারণ করে বুদ্ধ এসেছিলেন সাম্যের বাণী নিয়ে।

আজ থেকে দুই হাজার ৫৬৩ বছর আগে গৌতম বুদ্ধ বিশ্বে যে অহিংসা ও শান্তির বাণী মানবকল্যাণে প্রচার করে গেছেন, সে বাণী আজকের অশান্ত পৃথিবীর সব মানুষের বেশি বেশি অনুধাবন করা প্রয়োজন। বিশ্বে শান্তি স্থাপন করতে হলে সর্বপ্রথম ভগবান বুদ্ধ কর্তৃক প্রবর্তিত পঞ্চশীলের নীতিকে বিশেষভাবে হৃদয়ে স্থান দিতে হবে। আমরা যদি পঞ্চশীল নীতিকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করি, অনুধাবন করি, গবেষণা করি, তাহলে দেখতে পাব সব ধর্মের শান্তি ও মর্মবাণী সেখানে নিহিত আছে। যেমন—প্রাণী হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা কথা ও মাদকদ্রব্য সেবন থেকে বিরত থাকা। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ বুদ্ধের প্রবর্তিত পঞ্চশীল নীতিকে বাদ দিয়ে যদি শান্তি স্থাপনের চেষ্টা চালায়, তাহলে প্রকৃত শান্তি আসবে না। আর যা আসবে তা হবে ভোগের, শান্তির নয়। যিনি রাজপুত্র হয়েও সত্যলাভের জন্য সব পার্থিব বিত্ত-বৈভব বিসর্জন দিয়ে কঠোর সাধনার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন, তিনি হলেন মৈত্রী ও করুণার মূর্ত প্রতীক ‘গৌতম বুদ্ধ’।

কুমার সিদ্ধার্থ বুদ্ধত্ব লাভের পর নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন দেশ ও কালের সীমারেখা পেরিয়ে। তাঁর কাছে ছিল না কোনো জাতিভেদ; তাই তিনি সব মানুষের আত্মার আত্মীয় হয়ে গিয়েছিলেন। ভারতের বুদ্ধ হলেন জগতের বুদ্ধ। এই মহামানবের স্মৃতিচারণার মধ্যে আমরা নিশ্চয়ই খুঁজে পাব দুঃখ মুক্তির উপায়, চিত্ত হবে কলুষমুক্ত এবং দিব্যজ্ঞানের শুভ্রতায় সমুজ্জ্বল। ভগবান বুদ্ধ সব প্রাণিজগতের প্রতি অপরিমেয় মৈত্রী পোষণ করেছেন। তিনি প্রচার করেছিলেন অহিংসা, সাম্য, মৈত্রী এবং জীব হত্যা মহাপাপ। তিনি ঈশ্বর বা কোনো অলৌকিক শক্তিকে বিশ্বাস করতেন না। তাই তিনি জীবন-দুঃখের জন্য কাউকে দায়ীও করতেন না। বুদ্ধ বলেছেন, মানুষের কৃত অকুশল কর্মই সব দুঃখের কারণ। দুঃখের হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে চিত্ত থেকে কামনা-বাসনা সম্যক বিলোপ সাধন অপরিহার্য। ভগবান বুদ্ধই সাধনা বলে নির্বাণ লাভ করে মানুষের ললাটে চিরকালের জন্য বিমুক্তির বিজয় টিকা পরিয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির চিত্ত বিশুদ্ধি ও ত্যাগকর্মের মধ্যেই সমাজ ও জাতির মুক্তি নিহিত। বুদ্ধ মানবের দুঃখ মুক্তি ও নির্বাণ শান্তির জন্য যে সত্যের পথ দেখিয়ে গেছেন, তা বৌদ্ধ ধর্মে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামে অভিহিত করা হয়েছে। একটি লক্ষ্যস্থানে পৌঁছতে যেমন কতগুলো পথ বা নীতির অনুসরণ করা প্রয়োজন, ঠিক তেমনি দুঃখ নিবৃত্তির উপায়ের মধ্যে রয়েছে কতগুলো পথ বা নিয়ম। সেই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গগুলো হলো—১. সম্যক দৃষ্টি, ২. সম্যক সংকল্প, ৩. সম্যক বাক্য, ৪. সম্যক কর্ম, ৫. সম্যক জীবিকা, ৬. সম্যক ব্যায়াম ও প্রচেষ্টা, ৭. সম্যক স্মৃতি ও ৮. সম্যক সমাধি।

সম্যক দৃষ্টি : সম্যক দৃষ্টি কী, এটি প্রথমেই বিশ্লেষণ করা যাক। সম্যক দৃষ্টি হচ্ছে যথার্থ জ্ঞান। আমরা মিথ্যার বলে অনেক কিছু করি। অনেক সময় মিথ্যাকে সত্যরূপে জানি। সেই ভ্রান্তি দূরীভূত করার জন্য প্রয়োজন সম্যক দৃষ্টি বা বিশুদ্ধ দৃষ্টি। এই দৃষ্টিতে সত্যজ্ঞান উদ্ভাসিত হয়, ভালো-মন্দ জ্ঞান নির্ধারিত হয়।

সম্যক সংকল্প : সম্যক সংকল্প হচ্ছে উত্তম সংকল্প। সত্যের মধ্যে জীবন প্রতিষ্ঠিত করার নামই সম্যক সংকল্প। এতে কাম-ক্রোধ, ভোগ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ বিদূরিত করে। পক্ষান্তরে জীবের প্রতি মৈত্রী-করুণা সম্প্রসারিত হয়।

সম্যক বাক্য : সত্য বাক্য বলাকেই সম্যক বাক্য বলে। মিথ্যা, কর্কশ, অপ্রিয় ও বৃথা বাক্য পরিহার করে সত্য, মধুর, প্রিয় ও সুভাষিত বাক্য বলাকেই সম্যক বাক্য বলে। সম্যক বাক্যের দ্বারা বাক্য সিদ্ধ হয় এবং মানুষের মধ্যে মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

সম্যক কর্ম : সম্যক কর্ম হচ্ছে পবিত্র কর্ম। বাক সংযমের ন্যায় দৈহিক ও মানসিক কর্মকে সংযত করতে হয়। চৌর্যবৃত্তি, মিথ্যা কামাচার বা ব্যভিচার এবং মাদকদ্রব্য সেবন ইত্যাদি বর্জন করে উত্তম কর্মের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখা।

সম্যক জীবিকা : এর অর্থ হচ্ছে নির্দোষ জীবিকা। যে জীবিকায় কোনো অসদুপায়ের স্পর্শ নেই, সেই রকম জীবিকা নির্বাহকেই নির্দোষ জীবিকা বা সম্যক জীবিকা বলা হয়। অস্ত্র, বিষ, নেশা ও প্রাণী বাণিজ্য ইত্যাদি জীবিকা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।

সম্যক ব্যায়াম বা প্রচেষ্টা : সম্যক ব্যায়াম বা প্রচেষ্টা হচ্ছে সাধনার পথে বা সাধন মার্গে অগ্রসর হতে যে উদ্যম বা প্রচেষ্টা, তাকে সম্যক ব্যায়াম বলে। সাধনার পথে শত বাধা-বিপত্তি এলেও একে অতিক্রম করতে হবে। মানবিক সর্বপ্রকার পাপকর্ম থেকে বিরতি, উচ্চতর সত্কর্ম সম্পাদন এবং পরিশুদ্ধির জন্য প্রয়োজন প্রবল অধ্যবসায় ও সম্যক প্রচেষ্টা। সম্যক ব্যায়াম বা প্রচেষ্টার মাধ্যমে আসে সাধকের সিদ্ধি জীবের মুক্তি।

সম্যক স্মৃতি : সম্যক স্মৃতি মানে জাগ্রত মনে অথবা অপ্রমাদের সঙ্গে কর্ম সম্পাদন করা। দৈহিক ও মানসিক সব ধরনের অবস্থা সন্তর্পণে পর্যবেক্ষণ বা স্মরণই হলো সম্যক স্মৃতি। এই স্মৃতির মাধ্যমে চিত্ত কুশল কর্মে নিবিষ্ট থাকে। বুদ্ধ বলেন, স্মৃতিবিহীন চিত্ত কর্ণধারহীন তরণির মতো। এ জন্য উন্নত জীবন গঠনের জন্য সর্বদা স্মৃতির প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

সম্যক সমাধি : চিত্তের একাগ্রতাই সম্যক সমাধি। চিত্তকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সঠিকভাবে ধ্যান-সাধনা অনুশীলন ও পরিচালনা করাই হলো সম্যক সমাধি।

বুদ্ধের এ নীতিগুলো অনুশীলনের মধ্যেই রয়েছে জীবনের পরিপূর্ণতার পথ। আমরা যদি প্রত্যেক অষ্টাঙ্গিক মার্গের নীতিগুলো অনুসরণ করি, তাহলে আমাদের জীবন হবে মহিমান্বিত এবং শুভ্রতায় সমুজ্জ্বল।

ভগবান বুদ্ধের অসীম করুণা ও অহিংসার আদর্শে পৃথিবীর অশান্তি বিদূরিত হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক সত্য সুন্দর ও মঙ্গল-মৈত্রী এবং প্রেমের বন্ধনে (বাঁধনে) আবদ্ধ হোক বিশ্বের মানবসমাজ। আজকের বুদ্ধপূর্ণিমার এই শুভ দিনে এটিই আমাদের প্রার্থনা।

শান্ত হে, মুক্ত হে,

হে অনন্ত পুণ্য,

করুণা ঘন বরণীতল

কর কলঙ্ক শূন্য।

জগতের সব প্রাণী সুখী হোক, দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করুক। বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক।

 

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা উপাধ্যক্ষ, ঢাকা আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ বিহার ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট ফেডারেশন

[email protected]

 

মন্তব্য