kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ভারতের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শঙ্কায় বড় দুই দল

সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

১৪ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভারতের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শঙ্কায় বড় দুই দল

ভারতের বিপন্ন, বিধ্বস্ত ও দিশাহীন গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী—তা নির্ধারিত হবে আরেক সপ্তাহের মধ্যে। লোকসভার সাত দফা নির্বাচনের মধ্যে ছয় দফা নির্বাচনের পরেই বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পেরেছেন এবার তাঁর বিদায় আসন্ন। ছয় দফা নির্বাচনের যেসব ইঙ্গিত এরই মধ্যে বিশেষজ্ঞরা দিয়েছেন, তাতে একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের সর্ববৃহৎ রাজ্য উত্তর প্রদেশের লোকসভার ৮০টি আসনের মধ্যে গেরুয়া বাহিনীর ঝুলিতে গিয়েছিল ৭৫টি আসন, আর এখানেই ছিল তাঁর বড় রকমের সাফল্য। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা, বিশেষ করে ভারতের নির্বাচনের ব্যাপারে যিনি সবচেয়ে বেশি ওয়াকিফহাল অর্থাৎ যোগেন্দ্র যাদব মনে করেন, উত্তর প্রদেশ থেকে মোদির ঝুলিতে এবার ১৬ থেকে ১৭টি আসন যেতে পারে অর্থাৎ এক ধাক্কায় তাঁর ৬০টি আসন কমে যাবে। আর ২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও পাঞ্জাবে তখন ছিল বিজেপিশাসিত রাজ্য সরকার। গত বছর ডিসেম্বর মাসে এই চারটি রাজ্যের নির্বাচনে কংগ্রেস জয়ী হয়। কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্বের আশা এককভাবে লড়লেও কংগ্রেস উত্তর প্রদেশে এবার ভালো ফল করবে। ২০০৯ সালেও কংগ্রেস এককভাবে লড়ে উত্তর প্রদেশে ২২টি আসন পেয়েছিল। উত্তর প্রদেশে এবার দলিত নেত্রী মায়াবতী ও যাদব সম্প্রদায়ের নেতা অখিলেশ যাদব জোটবদ্ধ হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের অনুমান এই জোটের কম করে হলেও ৫০ থেকে ৫৫টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। অখিলেশ যাদব নিজেই বলেছেন, উত্তর প্রদেশে এবার বিজেপির ডাবল ডিজিট হবে না। মহারাষ্ট্র, কেরল ও কর্ণাটকে ছয় দফা নির্বাচনের পর অনুমান করা হচ্ছে, এসব রাজ্যে বিজেপির ভরাডুবি হবে। ভারতের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে যিনিই সরকার গঠন করুন, তাঁকে আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়তে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ‘থিংকট্যাংক’-এর চেয়ারম্যান সাংবাদিক বৈঠক করে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি একটি বিবর্ণ ছবি। জিডিপি বৃদ্ধির হার শ্লথ। মোদির বন্ধুরা ব্যাংকগুলো লুট করার ফলে বর্তমানে ব্যাংকিং বেহাল হয়ে পড়েছে। এফডিআই পাঁচ বছরে সবচেয়ে কম। বিক্রি হচ্ছে না পণ্য। মৌলিক ক্ষেত্রে উৎপাদন মন্দা। বিনিয়োগ কমছে। সঞ্চয়ের অনুপাত দ্রুত কমেছে। বেকারির হার ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। মোদি জমানায় নোটবন্দি, গব্বরসিং ট্যাক্স চালু করার ফলে পরিস্থিতি এতই বেহাল, যা ভারতের পক্ষে কঠিন দুর্দিন। এই রিপোর্টটি তৈরি করেছেন থিংকট্যাংকের প্রধান ড. রথীন রায়। তাই ব্যক্তিগত গালাগাল ছেড়ে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী ক্ষমতায় এলে ‘ন্যায়’ প্রকল্প চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন বেকারদের কর্মসংস্থানের পক্ষে। তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় আছে কৃষিঋণ মওকুফ ইত্যাদি প্রকল্প দেশের সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য।

কিন্তু কথায় বলে, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। মোদি ও তাঁর দল এই আর্থিক সংকট এড়িয়ে পাকিস্তান, বালাকোট, রামমন্দির এবং জঘন্যভাবে গান্ধী পরিবারকে আক্রমণের হাতিয়ার করেছেন। এ লেখার কয়েক দিন আগেই ভারতের শীর্ষ আদালত কতগুলো বিষয় নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন। মোদি এবং আরএসএস অভিযোগ তুলেছিল, কংগ্রেস সভাপতি ভারতের নাগরিক নন। শীর্ষ আদালত বিজেপির এই মামলা খারিজ করে দিয়েছেন। মোদি জনসভায় অভিযোগ করেছিলেন, রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি যুদ্ধজাহাজে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে নিয়ে লাক্ষাদ্বীপে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন; কিন্তু মোদির এই অভিযোগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুই সাবেক নৌপ্রধানসহ চার অবসরপ্রাপ্ত কর্তা প্রধানমন্ত্রী মোদির সব অভিযোগ পুরোপুরি খারিজ করে দিলেন, এমনকি লাক্ষাদ্বীপের তৎকালীন প্রশাসকও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য খারিজ করে দিলেন। যে চারজন মোদির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন তাঁরা হলেন সাবেক নৌকর্তা অ্যাডমিরাল এল রামডস, অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ, ভাইস অ্যাডমিরাল বিনোদ পাসরিচা ও ভাইস অ্যাডমিরাল মদনজিৎ সিংহ। আর এই চারজনই ১৯৮৭ সালে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে সফরে ছিলেন। রাজীব গান্ধী লাক্ষাদ্বীপে কোনো ছুটি কাটাতে যাননি, তিনি গিয়েছিলেন সরকারি সফরে।

প্রচারে গিয়ে তাঁর পূর্বসূরি প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যা নিয়ে মোদি এমন জঘন্যতম মন্তব্য করেছেন, যা কোনো মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে কারোরই করা উচিত নয়, আর রাজীব গান্ধী কিভাবে মারা গেছেন, তা গোটা বিশ্ব জানে। পাল্টা আক্রমণ করে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য আহমেদ প্যাটেল অভিযোগ করেছেন, ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধী যখন নির্বাচনী প্রচার করছেন তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। বিশ্বনাথ সরকারকে তখন সমর্থন করেছিল বিজেপি ও বামপন্থীরা। মোদি এসব কথা টেনে না আনলেই বোধ হয় নিজের মর্যাদা কিছুটা হলেও রাখতে পারতেন; কিন্তু নিজের আসন ধরে রাখার জন্য মোদি ও তাঁর পারিষদরা নিম্নমানের কূটকচালি করছেন। আহমেদ প্যাটেল আরো অভিযোগ করেছেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং রাজীব গান্ধীর নির্বাচনী প্রচারের নিরাপত্তা দেননি, মাত্র একজন পুলিশ কনস্টেবলকে দিয়েছিলেন।

আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের ফলে এ ধরনের পরিস্থিতি এর আগের কোনো নির্বাচনে দেখা যায়নি। ১৯৬৪ সাল থেকে ভারতের যত নির্বাচন হয়েছে, তা আমি রিপোর্ট  করেছি, রিপোর্ট করেছি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকে শুরু করে জার্মানি, জাপান এবং ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন। এ ধরনের নোংরা খেলা যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না, তা এবারই আমরা প্রথম দেখছি। এই পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনই ভারতের গণতন্ত্রের কবর হয়ে যাবে।

এবার একটু পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকানো যাক। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বেশি আসন পাওয়ার লোভে মমতা ও মোদির যে দ্বৈরথ শুরু হয়েছে, তা দেখে বাঙালিরা বিস্মিত। মমতা প্রকাশ্য জনসভায় অভিযোগ করছেন—মোদি তাঁর স্ত্রী যশোদা বেনকে নিয়ে থাকেন না, অন্য কোনো মহিলাকে নিয়ে থাকেন। আবার মোদি বলছেন, মমতার সরকার তোলাবাজ সরকার। কয়লা মাফিয়াদের মমতাই সুযোগ করে দিয়েছেন, শুধু তা-ই বালিখাদান-মাফিয়া ও সিন্ডিকেট গুণ্ডারা মমতা স্নেহচ্ছায়ায় তাদের ডালপালা প্রসারিত করে চলেছে।

শুধু ছয় দফা নির্বাচনই নয়, মমতা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে যেসব পঞ্চায়েত, বিধানসভা এবং পুরসভার নির্বাচন হয়েছে তার কোনোটিতেই মমতার গুণ্ডাবাহিনী ও পুলিশ ছাড়া সম্পন্ন হয়নি। এই ধারাবাহিকতা মমতা চালিয়ে যাবেন বলেই তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা শেষ দফা নির্বাচনের জন্য তৈরি হচ্ছে বলে বিরোধী দলগুলো মনে করে। এবারের নির্বাচনে প্রচারের জন্য মোদি সরকারের দল ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, কংগ্রেসের সেখানে বরাদ্দ ১৩৪ কোটি টাকা। একটি রাজ্যের নির্বাচনের জন্য মমতার বরাদ্দ ১৫৫ কোটি টাকা। এই তথ্য পাওয়া যায় দিল্লির একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি চ্যানেল সূত্র থেকে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে সেদিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক। ছয় দফা নির্বাচনের পরও মমতার দাবি পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে তিনি ৪২টি আসনই পাবেন। অন্যদিকে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহর দাবি উত্তর প্রদেশ ও বিহারে তাঁদের যে আসনসংখ্যা কমবে, তা তাঁরা পুষিয়ে নেবেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে। এ ব্যাপারে মমতার কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। কারণ নির্বাচনের তিন মাস আগে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সঙ্গে জোট নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। কংগ্রেস চেয়েছিল বিজেপিকে এ রাজ্যে ঢুকতে না দিতে। কিন্তু মমতার চালে বামপন্থীদের শরিক ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএমপি ও সিপিআই যাদের কোনো সংগঠন নেই, জনসমর্থনও নেই, তারা অনেক আসনের দাবি করে ফেলে। জোট কেন ভেঙে গেল—এ ব্যাপারে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন প্রবীণ সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ওই তিনটি দলকেই মমতা কার্যত কিনে নিয়েছেন বিপুল অর্থের বিনিময়ে। এটিই মমতার বিজেপিকে আসন ছেড়ে দেওয়ার চতুর কৌশল বলা যায়। এর ফলেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে বেশ কয়েকটি আসন পেতে পারে। এই আশঙ্কা সিপিএম নেতৃত্বের, যার সুফলটা কুড়াবে বিজেপি, আর এই সুযোগটা করে দিলেন মমতা। মমতার ঘনিষ্ঠ কিন্তু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, শিল্পী দেরিতে হলেও বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, দিদি দয়া করে একবার পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দিন। মমতা-মোদির যতই প্রকাশ্যে দ্বৈরথ আসুক না কেন, মমতাই প্রথম বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে ডেকে এনেছিলেন। অটলবিহারি বাজপেয়ির মন্ত্রিসভার সদস্য থাকার সুবাদে মমতা দিল্লির আরএসএসের অফিসে গিয়ে আরএসএসের প্রশংসা করেছিলেন, সে কথা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে।

যা হোক, আর মাত্র এক সপ্তাহ পরে বোঝা যাবে দেশ কোন দিকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফলাফল হবে ত্রিশঙ্কু। অর্থাৎ কোনো দলই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। যোগিন্দ্র যাদবসহ এ মতামত অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের। সুতরাং ভারতের জনগণ দেখছে যে তাদের গণতন্ত্র কি কবরে সমাহিত হবে, নাকি আবার নতুনরূপে, নতুন উদ্যমে জেগে উঠবে। কবির ভাষায় বলতে গেলে—‘ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।’

লেখক : পশ্চিমবঙ্গের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য