kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

দিল্লির চিঠি

ভারতের নির্বাচনে চড়ছে উত্তেজনার পারদ

জয়ন্ত ঘোষাল

১৩ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভারতের নির্বাচনে চড়ছে উত্তেজনার পারদ

সেই কবে থেকে এই ভারত নামক দেশটায় নির্বাচন শুরু হয়েছে বলুন তো! চলছে তো চলছেই। সাতটি পর্যায়ের নির্বাচন। বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে কথা। ১৯ মে শেষ হবে এই কুরুক্ষেত্র।

হে পাঠক, আপনি কি এখন ক্লান্ত! এখনো তো কবিপক্ষ চলছে, ২৫শে বৈশাখ ডাক দিয়েছে, জোড়াসাঁকো থেকে রবীন্দ্রসদন, ভোটের গনগনে আগুনের মধ্যেই গুরুদেবের স্মরণ গানে-গানে। মে মাসে দিল্লিতেও গ্রীষ্মের দাবদাহ। যেদিন বারানসিতে নরেন্দ্র মোদি রোড শো করলেন। সেদিন সাত-আট কিলোমিটার রোড শো করার পর দেখছিলাম যখন তিনি দশাশ্বমেধ ঘাটে বসে আরতি দেখছিলেন, তাঁর পাঞ্জাবিটা একেবারে ভিজে ছপছপ করছে। হাওড়া শহরে শিবপুর বিই কলেজের কাছ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদযাত্রা শুরু করলেন। থামলেন পিলখানায়। সেদিনও দুপুরবেলা কী ভয়ংকর গরম। আবার দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির জনসভার মোকাবেলায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধী করলেন রোড শো। প্রিয়াঙ্কা গরমের জন্য হালকা সবুজ রঙের সুতির শাড়ি পরেছিলেন। মানুষ কাতারে কাতারে রাস্তায় নেমেছে। বৃহত্তম গণতন্ত্রের বোধ হয় এটাই মজা। এখন তো আমরা টিভি চ্যানেলে সর্বক্ষণ নেতা-নেত্রীদের লাইভ শো দেখছি। একটা চ্যানেল তো নয়, এখন শয়ে শয়ে চ্যানেল। কত সংবাদমাধ্যম, কত অনুষ্ঠান। তবু রাজপথে মানুষ। গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের এ এক জাতীয় উৎসব।

যত দিন যাচ্ছে, ক্রমেই বিজেপি এবং তার প্রতিপক্ষ কংগ্রেস এবং অন্য বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে টেনশন বাড়ছে বৈ কমছে না। সারাক্ষণ আলোচনা চলছে। চলছে বিচার, বিশ্লেষণ। সংখ্যার হিসাব-নিকাশ। গণিত অধ্যয়ন। ঠিক কতগুলো আসন পেতে পারে বিজেপি? কংগ্রেস কি ১০০-এর ওপর যাবে? বিজেপি ২০০ ক্রস করছে? আচ্ছা এবার এতগুলো পর্যায় পার হয়ে যাওয়ার পর বলুন তো পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাস্ত করে বিজেপি মোট কতগুলো আসন পাবে? ১০ সংখ্যাটা অতিক্রম করবে কি? আচ্ছা উত্তর প্রদেশে অখিলেশ আর মায়াবতীর জোট যাকে বলছি গঠবন্ধন, সেটা কাজ করছে কি?

এবার নির্বাচনে ১৩০ কোটি মানুষের দেশের এই বিচিত্র সমাজজীবনে ভোট বাক্সের কী হবে তার গবেষণা ও বেশ কিছু প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। আসুন, আমরা সঠিক উত্তর বোঝার জন্য আগে সঠিকভাবে প্রশ্নগুলো অনুধাবনের চেষ্টা করি।

এবার ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন :

প্রশ্ন-১ : উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টির যে সমঝোতা, এর ফলে জাতপাতের ভিত্তিতে দুদলের ভোট বিনিময় এবার নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় হচ্ছে কি না। বুঝিয়ে বলছি, মানে, অখিলেশের সমাজবাদী পার্টির যাদব ও মুসলমান ভোট মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টির প্রার্থী পাবে আর মায়াবতীর দলিত ও নিম্নবর্গের ভোট সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী পাবেন। একে বলা হচ্ছে ভোট ট্রান্সফার। ২৪ বছর পর এই দুই দলের ঐক্য হয়েছে উত্তর প্রদেশের মতো এক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে। এখানে ৮০টি লোকসভা আসন আছে। ২৪ বছর আগে মুলায়ম মায়াবতীর সঙ্গে বোঝাপড়া করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে দুই দলই ভেবেছিল উত্তর প্রদেশে দুই জাতীয় দলকে অপ্রাসঙ্গিক করে আঞ্চলিক দল হিসেবে বহুজন সমাজ পার্টি আর সমাজবাদী পার্টির রাজনৈতিক মেরুকরণ হবে। রাজ্যরাজনীতি যেমনটা আছে, ডিএমকে বনাম এডিএমকে তামিলনাড়ুতে বা একদা বাংলায় ছিল সিপিএম বনাম তৃণমূলের মধ্যে। ২০১৪ সালে মোদির নেতৃত্বে বিজেপির ২৮২টি আসন লাভ করা দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রটাই বদলে দিয়েছে। মায়াবতী এবং অখিলেশ দুজনেই বুঝতে পারেন যে এই আসনে সমঝোতা বিশেষ জরুরি। তবে এই মহাগঠবন্ধনে কংগ্রেসকে অখিলেশ এবং বিশেষত মায়াবতী শামিল করতে চাননি। কারণ এই দুই নেতারই মনে হয়, এখনো রাজ্য কংগ্রেসের কোনো ক্ষমতাই নেই। এখনো কংগ্রেস উত্তর প্রদেশে ‘পুওর নম্বর ফোর।’ মায়াবতী এবং অখিলেশ বোঝাপড়া করলেন। অখিলেশ মায়াবতীর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে তাঁকে পিসি বলছেন। এসব নির্বাচনী বিনোদনের অঙ্গ। কিন্তু বাস্তবে নিচুতলায় দুদলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এই বোঝাপড়ার প্রতিক্রিয়া ঠিক কতটা সেটা বোঝা বিশেষভাবে জরুরি। কিছুদিন আগে এক জনসভায় মায়াবতী যখনই বলছেন, তখনই সমাজবাদী পার্টির কর্মীরা স্লোগান দিতে শুরু করেন, অখিলেশ যাদব জিন্দাবাদ। বেশ কয়েকবার হোঁচট খেয়ে বিরক্ত হন বহেনজি। তিনি তখন বলেন, মনে হচ্ছে সমাজবাদী পার্টির বাচ্চাদের এখনো অনেক কিছু শেখা বাকি আছে। অখিলেশ অবশ্য এই কর্মীদের নিরস্ত করেছেন। বারবার বলেছেন, আমাদের কর্মীরা তোমরাও ভোট দেবে বহুজন সমাজ পার্টিকে। এখন প্রশ্ন হলো, এবার ভোটে উত্তর প্রদেশে এই জাত-পাতের ভিত্তিতে ভোটাভুটি হবে কি? নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপি নেতৃত্ব জাত-পাতভিত্তিক এই বোঝাপড়াটাই ভাঙতে চাইছে। বিজেপির পাল্টা প্রচার হিন্দুত্ব। মোদি এবং উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ধর্মীয় মেরুকরণের ফসল তুলতে চাইছেন। আপাতভাবে অযোধ্যার রামমন্দির নির্মাণে বিষয়টি এবার ভোটের ইস্যু হয়নি। তবে তার বদলে পাকিস্তানের পুলওয়ামা আক্রমণ এবং ভারতের পাল্টা বালাকোটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক উত্তর প্রদেশে মোদির শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং অন্যদিকে হিন্দুত্ব জাগরণেও সাহায্য করতে পারে, এমনটা ধারণা বিজেপির। তবে যেহেতু ২০১৪ সালে উত্তর প্রদেশে বিজেপি ৮০টি আসনের মধ্যে বেশির ভাগ পেয়ে গেছে, ফলে আসন বাড়ানোটা খুব সহজ কাজ নয়।

এবার এই প্রশ্নের হাত ধরে এসে যায় দ্বিতীয় প্রশ্ন, যদি উত্তর প্রদেশে বিজেপির আসনসংখ্যা মহাগঠবন্ধনের ফলে কমে, তবে সেই ঘাটতি পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য থেকে পূরণ হয়ে যাবে কি না। এবার বিজেপি যেভাবে পশ্চিমবঙ্গকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তা অভূতপূর্ব। এর আগে কখনোই এতটা গুরুত্ব দিতে বিজেপিকে দেখা যায়নি। কলকাতার বিষয় নিয়ে আমরা এর আগেও আলোচনা করেছি। এই প্রশ্নটি বড় প্রশ্ন।

তৃতীয় প্রশ্ন হলো, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এত দিন ধরে যে প্রচার চালালেন, তাতে মনে হচ্ছে তিনি কি বিজেপির যে উচ্চবর্ণের হিন্দু ভোটব্যাংক আছে, তাতে ফাটল ধরাতে পারবেন? আমার মনে হয়, প্রথমেই যদি রাহুলের বদলে প্রিয়াঙ্কাকেই সরাসরি নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিত কংগ্রেস, তাহলে হয়তো ভালো হতো। প্রিয়াঙ্কার রোড শোয়ের অভিজ্ঞতা হলো যে তাঁর সভায় ম্যানেজমেন্ট এখনো ভালো নয়। অনেকে বলেছেন, কংগ্রেস এখনো রাহুল গান্ধীর জন্য যেভাবে সক্রিয়, সংগঠন এখনো সেভাবে প্রিয়াঙ্কার জন্য কাজ করছে না। এ ব্যাপারে সংশয় না রেখে হাইকমান্ডের মুখ্য নির্দেশ থাকা প্রয়োজন।

সর্বশেষ প্রশ্ন হলো, নরেন্দ্র মোদি যেভাবে রাজীব গান্ধীকে আক্রমণ শুরু করেছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে যে এই আক্রমণের প্রভাব ইতিবাচক হবে নাকি নেতিবাচক। অনেকের অভিমত হলো, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীকে টেনে আনা রাজনৈতিক দুর্বলতা ও মরিয়া মনোভাবের প্রকাশ। তা না হলে আইএনএস বিরাট রাজীব ব্যক্তিগত পরিবারের পিকনিকের জন্য ব্যবহার করেছিলেন, এ অভিযোগ তুলত না বিজেপি। আবার বিজেপির বক্তব্য হলো, রাজীব প্রয়াত হলেও বোফর্স দুর্নীতি বা সমকালীন বিষয়গুলো উত্থাপন করা সাংঘাতিক কৌশল। কারণ তখন বোফর্স দুর্নীতি বিরোধী প্রচারে বিজেপির সঙ্গে বাম এবং অকংগ্রেস বহু দল ছিল, যারা আজ মোদিবিরোধী। তাই এ হলো মারাত্মক রণকৌশল।

অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টকে উদ্ধৃত করে ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ বলার জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করলেন রাহুল গান্ধী, আবার দেখা যাচ্ছে কংগ্রেস এই স্লোগান থেকেও সরছে না। ভিন্দের এক জনসভায় রাহুল বলেছেন, চৌকিদার চোর স্লোগান আমার কিংবা কংগ্রেসের তৈরি করা নয়। এটা ভারতের যুবসমাজ ও কৃষক-শ্রমিকের স্লোগান। এটাও আমি বুঝতে পারছি না আদালতে অবমাননার হাত থেকে বাঁচতে ক্ষমা চাইতে হচ্ছে যে বিষয়ে, সেই একই বিষয়ে জনসভায় অভিযোগ তোলা কি সাধারণ মানুষ সত্যি সত্যিই গ্রহণ করছে? এ প্রশ্নের জবাবও অমীমাংসিত। মোদি নিজে কিন্তু এই চৌকিদার স্লোগানের মোকাবেলায় রাজীব গান্ধী থেকে রবার্ট বঢরা পর্যন্ত কাউকেই ছাড়েননি। ব্যক্তিগত আক্রমণও এবারের ভোটে কিছু কম হলো না। এর প্রভাব জানতেও আপাতত প্রতীক্ষা।

এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানার জন্য অপেক্ষা করুন আগামী ২৩ মে পর্যন্ত।

লেখক : বিশেষ প্রতিনিধি, কালের কণ্ঠ, নয়াদিল্লি

 

মন্তব্য