kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

গণতন্ত্র ও উন্নয়নে সমান গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন

এম হাফিজউদ্দিন খান

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



গণতন্ত্র ও উন্নয়নে সমান গুরুত্ব থাকা প্রয়োজন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সারা দেশের উপজেলা নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এতে সরকারদলীয় বা  আওয়ামী লীগ সমর্থকরাই বেশি আসনে জয় পেয়েছেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিরোধী দলগুলো ভালো করতে পারেনি। আর বিএনপি তো নির্বাচনে অংশই নেয়নি। কারণ এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির মনোবল এখন আর অতটা চাঙ্গা নেই। বর্তমান নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে দলটি নানা রকম জটিলতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। বিএনপি চেয়ারপারসন দীর্ঘদিন ধরে জেলে আছেন। তাঁর মুক্তিপ্রক্রিয়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়া, না নেওয়া এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বিষয়ে তাঁদের মধ্যে উদ্দীপনার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এটা সংগত কারণেই হচ্ছে। কিন্তু তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দর্শন ও উঠে দাঁড়ানোটা কিভাবে হবে—সেটা নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।

শক্তিশালী কোনো বিরোধী দল ছাড়া তো একটি স্বাধীন দেশের রাজনীতি বা গণতন্ত্র চলতে পারে না। কাজেই সার্বিকভাবে বলতে গেলে শুধু বিএনপির জন্যই নয়, দেশের জন্যই এটা মঙ্গলজনক নয়। দেশ চলবে, উন্নয়ন হবে—কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে বলে মনে করি না। এমনিতে গণতন্ত্রের যে এলিমেন্ট—সুন্দর ও সুসংহত গণতন্ত্রের যে উপাদান, তা তো এখন নেই। বাংলাদেশের দুটি বড় রাজনৈতিক দলের একটি সংসদে আছে, অন্য দলটি বাইরে আছে। বড় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনা করছে এবং তারা সংসদে আছে। আর বিএনপির রাজনৈতিক দুর্বলতা এবং আন্দোলনকে কার্যকর করতে না পারা; এসব কারণে তারা পিছিয়ে আছে। এটা কোনো ভালো বিষয় নয়।

বিএনপি এখন নানাভাবে বিপর্যস্ত। তাদের টপ অব দ্য পার্টি খালেদা জিয়া জেলে আছেন এবং তিনি খুবই অসুস্থ। এখন তো হাসপাতালেই কাটছে তাঁর দিন-রাত। তাঁর এক ছেলে মারা গেছেন এবং আরেক ছেলে তারেক রহমান বিদেশে, যিনি দেশে পা দিতে পারছেন না, কিন্তু দায়িত্বে আছেন। তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি বলা যায় একরকম নির্বাসিত। এভাবে হয় নাকি? এসব ঠিক না। কাজেই মনে হয় না যে যাঁরা দলের উচ্চ পদে আছেন তাঁরা জোরালো কোনো ভূমিকা এখন রাখতে পারবেন। তেমন সম্ভাবনাও দেখছি না। দলের সিনিয়র ও জুনিয়রের নেতৃত্বে কোনো ঐক্য নেই। আন্দোলনের সংঘবদ্ধ শক্তি ও ধারাবাহিকতা নেই। ফলে শিগগিরই কোনো দাবি নিয়ে অবস্থান তৈরি করতে পারবে—এমনটা মনে হয় না। বড়জোর প্রেস ক্লাবে বক্তৃতা দেওয়া এবং দলীয় কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক মিটিং ও আলোচনা ছাড়া মাঠপর্যায়ে কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মযজ্ঞ নেই। এভাবে চলতে থাকলে ভালো কিছু কি আশা করা যায়? এটা অত্যন্ত চিন্তার বিষয়।

আমরা কেউ বিএনপিকে পছন্দ করি বা না করি, এটা স্বীকার করতে হবে যে দেশে একটি বড় রাজনৈতিক বিরোধী দল দরকার। সেই বিবেচনায় আমরা বিএনপিকে সামনে দেখতে পাই। কিন্তু তারা তো সেভাবে কিছুই করতে পারছে না। এত বড় একটি দল, যারা সারা  দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তারা কয়েক দফা সরকার পরিচালনায় ছিল। কিন্তু আজকের যে অবস্থা তা দেখে তো হতাশ হতে হয়।

বিএনপি প্রথম যে বড় ভুলটি করেছে, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এটা তারা কত বড় ভুল করেছে, বুঝতে পারেনি। এর ধারাবাহিকতায় তারা আরো কিছু ভুল করেছে। এভাবে তারা নিজেরাই নিজেদের পিছিয়ে দিয়েছে। এরপর নির্বাচনোত্তর ও পরবর্তী সময়ে অসহযোগ আন্দোলনের নামে নানা ধরনের হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলল। তাদের ওপর সেসবের দায় ও অভিযোগ এসে পড়ল। তারা কিন্তু নিজেদের সেই অভিযোগ ও কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত করা বা তারা দায়ী নয়—তা প্রমাণ করতে পারেনি। বিএনপির কোনো নেতা সরাসরি যুক্ত কি না পরিষ্কার না হলেও অনেক নেতাকর্মী পুলিশের কাছে আটক হয়েছে। তবুও অভিযোগের তীর তাদের ওপর পড়েছে। ফলে নানা ধরনের মামলা ও তদন্তে তাদের নেতাকর্মীদের নাম আসতে দেখা গেছে। এখনো তাদের অনেক নেতাকর্মী সেসব মামলার জালে আটকে আছে। এভাবে নানা দিক থেকে বিএনপি একরকম কোণঠাসা হয়ে আছে। সংগঠিতভাবে ভালো কিছু করতে সক্ষম হয়নি।

খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া নিয়ে কিছু কথা ও উড়ো কথা শোনা যাচ্ছে। শর্ত সাপেক্ষে প্যারোলে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার কথা এসেছে। কিন্তু খালেদা জিয়া সেটা নিতে চান না। এটা আমি মনে করি, ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু আইনি লড়াই চালিয়ে তারা কত দূর এগোতে পারবে, কিংবা সেই পর্যায়ে যেতে কত সময় লাগবে, আদৌ সম্ভব হবে কি না—বলা যায় না। কিন্তু তাদের দলীয় সিদ্ধান্তটি ভালো। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

এখানে আরেকটি বিষয় আছে। যদিও এটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলেছে, জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি থেকে যে ছয়জন সদস্য এমপি নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁরা চাইলে সংসদে নিয়মানুযায়ী যোগ দিতে পারবেন। কিন্তু ৩০ এপ্রিলের মধ্যে যদি যোগ না দেন, তাহলে তাঁদের পদ বা সুযোগটি রহিত হয়ে যাবে। এখানে এমন প্রশ্নও তোলা যায়—এই নগণ্যসংখ্যক সদস্য সংসদে গিয়ে করবেনটা কী? তাঁরা কি কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন? কোনো প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাবেন? আবার এখানে একটি অসুবিধাও আছে—তাঁরা যদি বিএনপি থেকে যান সংসদে, তাহলে গত জাতীয় নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়া হয়। বিএনপি তো নির্বাচন বর্জনই করেছে। তাহলে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলে একটা স্ববিরোধী এবং সাংঘর্ষিক ব্যাপার হয়ে যায় না? এসব জটিলতা আছে। ফলে বিএনপি কী করবে এবং নির্বাচিতরা কী করতে চাইছেন, দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আবার তাঁরা না গেলে কী হবে? সেটাও খুব একটা পরিষ্কার নয়।

আমাদের এখানে নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নৈতিক ভিত্তি আস্থা হারিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের যে নির্বাচন পূর্বাপর শৃঙ্খলা ও পদ্ধতি দেখা যায়, তার সঙ্গে এর কোনো বৈশিষ্ট্যগত মিল নেই। ফলে পরবর্তী সময়ে এই কমিশনের অধীনে নির্বাচন সম্ভব হবে কি না তা ভেবে দেখতে হবে। এমনকি ভারতে যে এত জনসংখ্যা, সেখানে ৯০ কোটি ভোটার, তারাও কিন্তু একটি নিয়মের অধীনে সুশৃঙ্খলভাবে নির্বাচন করতে পারছে। প্রভাব ও জোরজবরদস্তি থাকলেও সেটা গৌণ। সেখানে নির্বাচনকেন্দ্রিক কোনো সহিংসতা হয় না, হামলা ও মামলা হয় না, মানুষ মারা যায় না—এমন নয়। কিন্তু মূল নির্বাচনে সেসব খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে না। আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে—আগামী দিনে নির্বাচনটা কিভাবে হবে। কিভাবে সুষ্ঠু, অবাধ এবং  গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।

শেষ কথা হচ্ছে, বিএনপি কোনো সুযোগ পাচ্ছে না বা বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না, তারা কোণঠাসা হচ্ছে—এটা একটি দিক। কিন্তু বিএনপি থাকল কী না থাকল, সেটাও কোনো কথা নয়। কথা হচ্ছে, দেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে একটি শক্তশালী বিরোধী দল থাকতে হবে। না হলে গণতন্ত্রের চর্চা ও পরিবেশ ব্যাহত হবে। এটা মস্তবড় ক্ষতি। এই ক্ষতিটা শুধু বিএনপির নয়। সার্বিকভাবে এটা দেশের ক্ষতি। উন্নয়ন যেমন দরকার দেশকে এগিয়ে নিতে, দেশকে সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য গণতন্ত্র আরো বেশি জরুরি। বিরোধী দলসহ একটি চলমান সংসদ থাকতে হবে। সেটা আমাদের নেই।

এখন তো সরকারের মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, তারা বিরোধী দল থাকুক তা চায় না। বিরোধী দল থাকার উপকারিতা হলো, যখন কোনো কাজ হবে, কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে, সেটার ভালো নিয়ে যেমন কথা হবে; মন্দ দিক নিয়েও কথা হবে। ভুল ও অসংগতিগুলো তারা ধরিয়ে দিতে পারবে। সার্বিকভাবেই এটা দরকার এবং জরুরি। সব মিলিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার দরকার, বিরোধী দলও দরকার। বিএনপির জন্য এখন জরুরি হচ্ছে তাদের সংগঠনকে ঢেলে সাজানো এবং মানুষের কাছে পৌঁছানো। নিজেদের পক্ষে জনমত গড়ে তুলে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে।

 

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

 

মন্তব্য