kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

সদিচ্ছার স্বাধীনতা

গোলাম কবির

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সদিচ্ছার স্বাধীনতা

সংস্কৃত স্বাধীন (স্ব+অধীন) শব্দের আভিধানিক অর্থ : স্ববশ, অনন্যপর, অবাধ, স্বচ্ছন্দ ইত্যাদি। আমরা এসব অর্থকে এক বিন্দুতে স্থাপন করে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধাগুলো জাতীয়ভাবে সমন্বিত করে উপভোগ করার অপর নামকে স্বাধীনতা বলছি। আমরা এর মর্ম বুঝি আর না বুঝি, স্বাধীনতার বোধ আমাদের উদ্বেলিত করে। প্রকৃত স্বাধীনতা যে শত শৃঙ্খলে বাঁধা, তা আমরা খতিয়ে দেখি না। নিজের বিলাসের কথা ভেবে অন্যের সর্বনাশ সাধন অবশ্যই স্বাধীনতার মূল অনুভবকে ধ্বংস করে।

মানুষের ইচ্ছা সাধারণভাবে সদিচ্ছা ও কদিচ্ছা—দুইভাবে বিভক্ত। কদিচ্ছা হলো ব্যক্তিসর্বস্ব চিন্তা। এখানে স্বাধীনতার ব্যবহার মানববিধ্বংসী। আর সদিচ্ছা হলো, ‘সকলে মিলিয়া গাহিব গান।’ এই অভিধা হয়তো সর্বদা মিলবে না। তবে মোটামুটি ‘সবারে বাস রে ভালো’ বা ‘মুক্ত কর হে বন্ধ’ যদি আমরা উপলব্ধি করতে পারি, তবে সদিচ্ছার স্বাধীনতা কার্যকর হবে।

সমগ্র জাতি কিংবা বেশির ভাগ মানুষ স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ থাকে। কবিতার ভাষায় উচ্চারণ করে, ‘হয় স্বাধীনতা দাও, নয়তো মৃত্যু।’ এই মৃত্যুভাবনা যুগে যুগে সংখ্যাতীত মানুষকে প্রাণ দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে, কী পরিমাণ সুফল মিলেছে, তার সবটুকু কালপ্রবাহ ধরে রাখেনি।

আমাদের চোখে দেখা মুক্তিযুদ্ধে কত টগবগে প্রাণ বিসর্জিত হয়েছে, কত নারী সম্ভ্রম খুইয়েছে, তার সঠিক ইতিহাস হয়তো কোনো দিন জানা যাবে না। তথাকথিত ভ্রাতৃপ্রতিম স্বধর্মের বর্গিদের লুণ্ঠন থেকে মুক্তির জন্য স্বাধীনতাপাগল মানুষ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিপজ্জনক পথে পা বাড়িয়েছে। আমরা খতিয়ে দেখিনি, সেসব ত্যাগী মানুষের কতজন স্বাধীনতার সুফল ভোগের সুযোগ পেয়েছে। নাকি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে এবং রাতারাতি ভোল পাল্টিয়ে গাছেরটা খেয়েছে, তলেরটাও কুড়িয়েছে। এখনো রাজনীতিজীবীরা সেবা করার সুযোগ ভিক্ষা করে দ্বারে দ্বারে ফেরে। ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়ে অনেকে আখের গোছানোয় মত্ত হয়ে পড়ে। কদিচ্ছা সদিচ্ছাকে পরাভূত করে। সামন্ত প্রভুদের মতো সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগিতে মত্ত হয়। যে যেখানে আছে, ত্যাগে নয়, ভোগে বলীয়ান হয়ে জারিজুরি কার্যকর করে। এই ভোগসর্বস্ব কর্তৃত্ববাদী স্বাধীনতা চিরকালই মগডালে থেকেছে, কখনো ঐশী প্রলেপ দিয়ে, কখনো বঞ্চিতদের প্রলুব্ধ করে।

জগতে কোনো মতবাদই মানবকল্যাণ বিশ্লিষ্ট নয়। প্রয়োগের ক্ষেত্রে শক্তিধর মানুষ নিজের সুবিধাটুকু বড় করে দেখে বলে সংঘাত বাড়ে, হানাহানিও কম হয় না। আজকের দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভজনালয়, বিনোদনকেন্দ্র, বিপণিবিতান ইত্যাদিতে বিবেকহীন হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হচ্ছে। এটা কদিচ্ছার স্বাধীনতা বা পাশবিকতার নামান্তর। এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্বাধীনতা মানুষকে কত দিন প্রত্যক্ষ করতে হবে!

সদিচ্ছার স্বাধীনতার জন্য একঝাঁক কর্মীপুরুষ গত শতকে এগিয়ে এসেছেন। তাঁদের কর্মসাধনা ভিন্ন হলেও লক্ষ্য ছিল শৃঙ্খলমুক্তি; যে মুক্তি অন্যের অধীনতা থেকে মুক্তি। আমরা কারো অবদানকে খাটো করে দেখার স্পর্ধা রাখি না। তবে বঙ্গবন্ধু যে পরিবেশ থেকে এ দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া রূপান্তরের ভেতর দিয়ে জাতিকে এক কাতারে সমবেত করতে সমর্থ হয়েছিলেন, তা ছিল মানবমুক্তির। এর তুলনা বোধ করি বেশি নেই। সে দীর্ঘ ইতিহাসের পানে না চেয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গবন্ধুর মাত্র সাড়ে তিন বছরের ত্যাগী কর্মযজ্ঞের দিকে ফিরে দেখলে বোঝা যাবে, তিনি কী চেয়েছিলেন। অতিকল্পনার আশ্রয় না নিয়েও ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবন তার সাক্ষ্য বহন করছে।

দেশের বাহ্যিক হানাদার বিতাড়ন করা হলেও দীর্ঘ সময় ধরে তাদের তাঁবেদারির মানসিকতা শিগগিরই মুক্ত করা যায়নি। এখনো কি গেছে! বঙ্গবন্ধু নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, স্বাধীনতা ব্যক্তির ভোগের জন্য নয়, সমষ্টির মুক্তির। রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীদের মতো সুরক্ষিত বাসভবনে তিনি বসবাস করেননি। সবার সঙ্গে এক হয়ে সবার মতো করে প্রায় অরক্ষিত ৩২ নম্বরে বসবাস করে জাতির মুক্তির ব্রতে নিমগ্ন থেকেছেন। তিনি চেয়েছেন কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে স্বাধীনতার সদিচ্ছা প্রতিষ্ঠা করতে। হায়! সেই ৩২ নম্বরের চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য কোনো কোনো ক্ষমতার অংশীদার স্বৈরাচার চেষ্টার ত্রুটি করেনি। শুধু তা-ই নয়, ‘ঝুট’ সরকারের সময় শোনা গেছে, আবাসিক এলাকায় বঙ্গবন্ধু জাদুঘর রাখা যায় কি না তার পরিকল্পনা। এরাই রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ৭ই মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার হূিপণ্ড উপড়ে ফেলে শিশু পার্ক বানিয়েছিল। কোনো কূটকৌশলই বঙ্গবন্ধুর সদিচ্ছার স্বাধীনতা দাবিয়ে রাখতে পারেনি। তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে জনকের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন।

শেষ করার আগে আরেকবার পেছনের পানে ফিরে দেখি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পর মতবাদের দাসখতে স্বাক্ষর করা ও অতিলোভী কিছু ব্যক্তি রাষ্ট্র পরিচালনা ও বঙ্গবন্ধু ভবন সম্পর্কে নানা অপবাদ প্রচার করতে থাকে। গণকণ্ঠ আর হলিডে ছিল সেসবের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম। মানুষ না বুঝে রাতারাতি আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের প্রলোভনে কোরাসে ধুয়া তোলে। সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। বঙ্গবন্ধু তা প্রতিহত করার আয়োজন মনে করেও দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রীদের নৃশংসতার শিকার হন সপরিবারে। ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে দৃশ্যপট থেকে অপসারিত করলেও তাঁর সদিচ্ছার স্বাধীনতার যে বিনাশ নেই!

চাটুকার, তদবিরবাজ, স্তাবকরা চিরকালই ক্ষমতাকে বিভ্রান্ত করে। এরা সব যুগে জোঁকের মতো কাদার মধ্য থেকে শোষণপ্রক্রিয়ার নানা মিথ্যার জঞ্জাল উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রকৃত স্বাধীনতা ভোগ থেকে জনতাকে বঞ্চিত করে। এদের অবশ্যই চিহ্নিত করতে হবে, নতুবা সদিচ্ছার স্বাধীনতা কল্পিতই রয়ে যাবে।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা