kalerkantho

বুধবার । ২০ নভেম্বর ২০১৯। ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

এই গোলমালের নির্বাচনেও মিলল কত কিছু

মোস্তফা মামুন

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এই গোলমালের নির্বাচনেও মিলল কত কিছু

ঘোষণার আগেই ফলটা জানা হয়ে গিয়েছিল বলে ফলজনিত কৌতূহল খুব একটা ছিল না। কৌতূহল ছিল শোভনকে নিয়ে। তাঁর নিচের বাকি সবাই জিতেছেন, তিনি পারেননি, এই দুঃখ বা লজ্জা সামাল দেন কী করে?

উপাচার্য দীর্ঘ ভূমিকা করলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কত নম্বর আইনের কত নম্বর ধারা অনুযায়ী এই ফল ঘোষণা করছেন সেটা শুনতে হলো একাধিকবার। সেই বিরক্তি শেষে ঘোষণা—ভিপি পদে নুরুল হক ১১ হাজার ৬২ ভোট এবং নির্বাচিত। সঙ্গে সঙ্গে হট্টগোল। সেই হট্টগোলের ভিড়ে দেখলাম তিনি হাত দিয়ে অনুসারীদের থামানোর চেষ্টা করছেন। চেষ্টার সঙ্গে হাত ঠিক যেন সাড়া দিচ্ছে না। মনও হয়তো চাইছে প্রতিবাদ হোক। কিন্তু আবার নেতা বলে সেই প্রতিবাদ যেন সীমা ছাড়িয়ে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হচ্ছে। আর তখনই সারা দিনের ভিলেনীয় ছবি ছাপিয়ে শোভন হয়ে উঠলেন নায়ক। আর ওই এক মুহূর্তেই মনে হলো এত গোলমাল-অভিযোগ-কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও তবু ডাকসু নির্বাচনের দরকার ছিল। এত গোলমেলে নির্বাচনের মধ্যেও কত চরিত্রের দেখা মিলছে।

যেমন অবিশ্বাস্য জয়ে সবার ওপরে উঠে গেলেন নুরুল হক। তাঁর ওপর বিরামহীন নির্যাতন হয়েছে গত এক বছর। ইদানীং যে কাউকে ধসিয়ে দেওয়ার উপায় হলো শিবির ট্যাগ লাগানো। নুর তাই শিবির হয়ে গেছেন। কিন্তু এই আক্রান্ত-অপপ্রচারবিদ্ধ নুরই শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পছন্দের। রাজনৈতিক সমীকরণ থেকে তাঁকে জেতানো হয়েছে, যাতে প্রমাণিত হয় নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে—ইত্যাদি সব তত্ত্ব ঘোরাঘুরি করছে। স্যাবোটাজের কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু খবরাখবর নিয়ে যত দূর জেনেছি, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে নুর আরো বড় ব্যবধানে জিততেন। তাঁর প্যানেলও জিতত আরো অনেক বেশি পদ।

এই নির্বাচন পুরো সুষ্ঠু হয়নি। কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা তো আছেই। ছাত্র হলগুলোতে হলের আবাসিক কর্মীদের দিয়ে লম্বা লাইন তৈরি করে অনাবাসিকদের ভোটে নিরুৎসাহ করার কৌশলটা বেশ কার্যকর হয়েছে। সমস্যা হয়েছে ছাত্রী হলগুলোতে। কুয়েত মৈত্রী হলের ওই ঘটনার কারণে অন্য কোথাও এ রকম কোনো দুর্বৃত্তপনা করার পরিকল্পনা থাকলেও সেটা বাস্তবায়নের সাহস আর কেউ করেনি। আমার দৃষ্টিতে তাই সব ছাপিয়ে এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিজয়ী আসলে ছাত্রীরা। আর পরাজিত! বলবেন, ছাত্রদল। হয়তো। কিন্তু তাদের চেয়েও বড় এক দল নির্লজ্জ হারু পার্টি আছে। নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা প্রশাসন ও শিক্ষকরা। ছাত্রীরা যতটা জিতেছে এরা ততটাই হেরেছে। যতবার ভাবি, একজন প্রভোস্টের সহায়তায় জাল ভোট ভরে রাখা হয়েছিল রাতে, তখন অসুস্থ লাগে।

এই সময়ই জাভেদ ভাইয়ের ফোন। কোনো ভূমিকা না করে বললেন, ‘চলে আসো।’

‘কোথায়?’

‘কোথায় আবার! ক্যাম্পাসে।’

ক্যাম্পাসের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে জাভেদ ভাই বললেন, ‘তোমার কাছে তাহলে এবারের ডাকসুর সবচেয়ে বড় জয়ী ছাত্রীরা?’

‘কারো তো কোনো সন্দেহ থাকা উচিত না।’

‘আমারও সন্দেহ নেই। কিন্তু ওদের একটা সুবিধা ছিল। ছাত্রী হলগুলোতে যেহেতু সিট বরাদ্দটা সরাসরি প্রশাসন করে থাকে, ফলে সরকারি দল বা ছাত্রলীগ সেভাবে গেড়ে বসতে পারে না। ছাত্রদের হলে হিসাবটা অন্য রকম। এখানে হলে উঠতে হলে সরকারি ছাত্র সংগঠনের আশীর্বাদ লাগে। তাই বেশির ভাগ ছাত্রই তাদের কথা মানতে বাধ্য।’

‘আর প্রশাসনও তাদের তাল দিয়ে গেল। বিরোধীদের একটা দাবিও মানা হলো না।’

‘বিরোধীদের হল থেকে ভোট সরানোর দাবির বিষয়ে আমি একমত নই। সব সময়ই হলে ভোট হয়, তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোটাই হলকেন্দ্রিক। ছাত্র-ছাত্রীদের পরিচয়ও হলভিত্তিক। কিন্তু ভোটের সময় বৃদ্ধি কিংবা আগের দিন ব্যালট বাক্স না পাঠানো, এই দাবিগুলো তো যৌক্তিক। অবাক ব্যাপার, এখানে একটা কথাও শোনা হয়নি। তুমি আমাকে বলো তো, ভোটের সময় দু-তিন ঘণ্টা বাড়ালে এমন কী ক্ষতি হতো?’

সত্যি বললে এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজেই পাইনি। একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে, ছাত্রলীগ যেহেতু এর পক্ষে চলে গিয়েছিল, কাজেই আর বদলানো যাবে না। এই কয়েক দিন যেন আওয়ামী লীগ নয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনই ছিল ছাত্রলীগের অভিভাবক সংগঠন।

এদের নিয়ে আর খুব আলোচনা নেই বলে জানতে চাই, ‘প্রশাসনের মতোই পরাজিত আরেকটি পক্ষ ছাত্রদল। ভাবা যায়, ওদের ভিপি প্রার্থী ভোট পেয়েছে দুই-আড়াই শ।’

জাভেদ ভাই বলেন, ‘আমি এর মধ্যেই একটা নতুন সম্ভাবনার জায়গা দেখতে পাই। আমাদের এখানে দ্বিদলীয় রাজনীতির অঙ্কটা এ রকম—আওয়ামী লীগবিরোধী ভোট মানেই বিএনপি, ছাত্রলীগবিরোধী মানেই ছাত্রদল। কিছু না করেই প্রতিপক্ষের ব্যর্থতার সুযোগটা এরা পেয়েছে। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ছাত্রলীগের বিরোধী যারা, তাদের ভোট আর ছাত্রদলের নয়। মানে ন্যূনতম বিকল্প পেলে সেই বিকল্পের দিকেই যাবে ভোট। কোটা বা স্বতন্ত্রদের মধ্যে যে বিকল্পের সন্ধান পেয়েছে ছাত্ররা। জাতীয় রাজনীতিতে এখনো বিরোধী ভোটের অঙ্কটা আওয়ামী লীগ-বিএনপিরই আছে; কিন্তু এই নির্বাচন সামান্য হলেও এটা জানিয়ে গেল, ন্যূনতম বিকল্প হিসেবে কেউ দাঁড়াতে পারলে এই বিরোধী ভোট নিজের বাক্সে নেওয়া সম্ভব।’

সেটা একটু বাড়াবাড়ি স্বপ্ন। অনেক দূরের আলো। সেদিকে না গিয়ে ডাকসুতেই থাকি।

‘যা-ই বলো ভিপিটা কিন্তু বিরাট চমক হয়ে গেছে! যে ভোট বর্জন করল সেই ভিপি। স্যাবোটাজের অভিযোগও আছে। এই যুক্তিও অনেকে দিচ্ছে, জিএস যে ভোট পেল সেই ভোট ভিপি পেল না কেন?’

‘স্যাবোটাজ আছে কি না জানি না; কিন্তু এই যুক্তির মানে নেই। এখানে দুই ধরনের ভোট আছে। একটা হচ্ছে প্যানেল ভোট মানে কর্মীদের ভোট। সেটা সব প্রার্থী পায়; কিন্তু সাধারণ যে ভোট সেটা কারো সঙ্গে যোগ হয়, কারো সঙ্গে হয় না। তাই সাদ্দামের ভোট ১৫ হাজার হয়ে যায়। বাকিদেরটা সেই জায়গায় পৌঁছে না। আর ভিপি পদটার ক্ষেত্রে অন্য কিছু বিবেচনাও আছে।’

‘কী রকম?’

‘অন্য যত পদই থাকুক শেষ পর্যন্ত ভিপি হচ্ছে ছাত্রদের চূড়ান্ত নেতা। ছাত্ররা ভোট দেওয়ার সময় অন্য ক্ষেত্রে দল-সমর্থন ইত্যাদি ভাবে; কিন্তু এই একটা ক্ষেত্রে চেষ্টা করে তাদের নেতা যেন সঠিক লোক হয়। এ জন্য বহু ক্ষেত্রে দেখবে, পুরো প্যানেল এক দল জিতেছে। ভিপি অন্য দলের। এর পেছনে আরেকটা কারণও কাজ করে।’

‘কী কারণ?’

‘নির্বাচনে নেমেই তো মোটামুটি দলগুলো বুঝতে পারে কার কী অবস্থান। যারা দেখে পুরো প্যানেল জেতা সম্ভব না, তারা মনোযোগটা দেয় ভিপি পদের দিকে। ভিপিটা জিতলে প্যানেলে সংখ্যালঘু হলেও আধিপত্য করা যায়। সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এটা জেতার জন্য। ফলও পাওয়া যায় অনেক ক্ষেত্রে। এই এবারই ধরো, সব ছাত্রলীগের; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবার ওপরে তো নুর।’

হাঁটতে থাকি। মনে মনে হিসাব মেলাই। নুরের সবার ওপরে ওঠা, শোভনের নেতা হওয়া, অরণীর ব্যক্তিত্ব, লিটনের মুখরতা মিলিয়ে এই গোলমালে ভরা ডাকসু নির্বাচনও তো কম কিছু দিল না।

 

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা