kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

সাদাকালো

ঔদার্যে নিজেকে হারাই

আহমদ রফিক

১৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঔদার্যে নিজেকে হারাই

স্কুলপাঠ্য কবিতার একটি লাইন : ‘মানুষ আমরা নইতো মেষ’—এককথায় মানবতাবাদী চেতনার প্রকাশ। বিশ্বে মাঝে মাঝে বর্বর সমরশক্তির আবির্ভাব ঘটে, যার ফলে মানবিক মূল্যবোধ পদদলিত হয়, কখনো মানব রক্তে মানবতার চরম অপমান ঘটে। বাস্তুত্যাগী মানুষ তখন প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে যেদিকে সম্ভব ছুটে যায় আশ্রয়ের খোঁজে।

বিভিন্ন কালপর্যায়ে বিশ্বের একাধিক দেশে এমনটি ঘটেছে যেমন গত শতকে ইউরোপে ইহুদি বিতাড়ন, তার আগে ফিলিস্তিনি বিতাড়ন, ভারতীয় উপমহাদেশে ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের কালে ঘটেছে বাস্তুত্যাগী শরণার্থীদের ঢল—পাঞ্জাব-করাচি-দিল্লি থেকে বঙ্গদেশ অবধি। নেপথ্য কারণ যেমন ফ্যাসিবাদী বর্বরতা কিংবা রাজনীতির কূটনীতি, তেমনি সামরিক দুঃশাসনের বর্বরতা—পাকিস্তান থেকে সম্প্রতি মিয়ানমার।

১৯৪৭-৪৮ সালে বিহার থেকে বিপুলসংখ্যক উর্দুভাষী বিহারি পূর্ববঙ্গসহ পশ্চিম পাকিস্তানের একাধিক অঞ্চলে শরণার্থী তথা মোহাজেররূপে আশ্রয় নেয়। সিন্ধুর রাজধানী করাচি তার মধ্যে ছিল একটি বড় মোহাজের বসতিস্থল। সিন্ধিরা তাদের ভাই বলে গ্রহণ করেছিল ধর্মীয় ঐক্যবোধের কারণে। যেমন—পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন শহরে বিহারিদের বসতি। বিশেষ করে ঢাকায় মিরপুর-মোহাম্মদপুর বিহারি কলোনি।

নানা রাজনৈতিক ঘোরপ্যাঁচে এ ধরনের শরণার্থী আবাসন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা তৈরি করে—যেমন মধ্যপ্রাচ্যে তেমনি ভারতীয় উপমহাদেশে। উল্লেখযোগ্য বিশেষ উদাহরণ করাচি, ঢাকা-চট্টগ্রামের কক্সবাজার-উখিয়া-রামু অঞ্চল। শেষোক্ত অঞ্চলগুলো সাম্প্রতিক ঘটনার অন্তর্গত।

সিন্ধুর জন্য (করাচি) দেশভাগ এমনি সামাজিক-রাজনৈতিক ও জাতিগত সমস্যা তৈরি করেছে যে করাচিস্থ সিন্ধিরা এখন মর্মবেদনায় ভুগছে—ঐতিহাসিক নিজ শহর পরদেশির হয়ে যাওয়ার কারণে। করাচি আর সিন্ধিদের নেই। মোহাজের বিহারিদের জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কল্যাণে করাচিতে সিন্ধিরা নিজ দেশে এখন সংখ্যালঘু, নানাদিকে বিহারিদের প্রবল উপস্থিতিতে চাপের মুখে তারা। সিন্ধিদের মর্মবেদনা—নিজ দেশে পরবাসী হওয়ার মতো ঘটনার কারণে।

বেশ কিছুদিন ধরে শুরু হয়েছে সিন্ধি বনাম বিহারি সংঘাত এমনকি রাজনৈতিক-সামাজিক দাঙ্গা। নিজ মাটিতে রক্ত ঝরছে সিন্ধিদের ধর্মভাইদের আশ্রয়দানের উদারতার কারণে। বিহারিকুল রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করে রীতিমতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে (এমকিউএম), বলতে হয় মানবিক উদারতার প্রতিফল।

পূর্ববঙ্গের একাধিক শহরসহ (সৈয়দপুর, ঈশ্বরদী ইত্যাদি) মিরপুর-মোহাম্মদপুরের বিহারি অধ্যুষিত এলাকা অবশ্য সিন্ধুর মতো নয়, অন্য ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে। প্রসঙ্গত, একটি বাস্তব নৃতাত্ত্বিক সত্য উল্লেখযোগ্য যে ভাষিক জাতি চেতনা এতটা প্রখর যে ভিনদেশি শরণার্থীরা স্থানীয় মূল জাতিস্রোতে মিশে যায়নি—বজায় রেখেছে নিজস্ব জাতিগত স্বতন্ত্র সত্তা—যেমন করাচিতে তেমনি পূর্ববঙ্গে, ঢাকায়। ঢাকায় তৈরি হয়েছিল কথিত বিহারিস্তান।

রক্তাক্ত একাত্তর (১৯৭১) প্রমাণ করে যে ধর্মীয় ঐক্যবোধের চেয়েও শক্তিমান ভাষিক জাতিসত্তা এবং সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক ভিন্নতা। ফলে রাজনৈতিক স্বার্থের কূট কারণে ধর্মীয় ঐক্যবোধ ভেসে গেছে প্রতিহিংসাবাদী সংঘাত ও দাঙ্গায়। বাঙালি ও বিহারি হয়ে ওঠে পরস্পরের শত্রু। অবশ্য রাজনৈতিক কারণে বাঙালি বনাম বাঙালির শত্রুতাও কম ছিল না একাত্তরে, যেখানে ধর্মীয় চেতনা ও গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক চেতনা হয়ে ওঠে পরস্পরের শত্রু।

দুই.

দীর্ঘ প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপট মূল বক্তব্যে আসতে। কারণ ঘটনাগুলো পরস্পর-সংশ্লিষ্ট এবং সমান্তরাল চরিত্রের। এখানে মানবিক চেতনার সাময়িক পরাজয়। উদারতা আত্মঘাতী। যেমন দেখা গেছে মধ্যযুগে, বিশেষত মোগল ভারতে শ্বেতাঙ্গ বিদেশি বণিকদের প্রতি বাদশাহ-মহারাজাদের ইহজাগতিক উদার আচরণের ফলে।

আলোচ্য ঘটনা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সীমান্ত অঞ্চলে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের শরণার্থী অবস্থানসংক্রান্ত সমস্যা। গত কয়েক বছরে কয়েক দফায় লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে বিশাল বিশাল শিবির তৈরি করে। চীন, রাশিয়া, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো মিলে যে রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করেছে, তা ছিল কারো কারো বক্তব্যে ভবিষ্যদ্বাণীর মতো।

ফলে জাতিসংঘের দুর্বল, অসহায় ভূমিকা। রাজনৈতিক চাতুর্যে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সমাধান দূরে থাক, সমস্যাই সৃষ্টি করে চলেছে। সে সমস্যা চতুর নীরবতা ও তৎপরতাহীনতার। সময় এগিয়ে চলেছে। সেই সঙ্গে জটিল হয়ে উঠেছে সামাজিক সমস্যা। এর মধ্যে বাড়তি উপদ্রব উদ্দেশ্যমূলক এনজিও তৎপরতা। এরা বরাবরই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তল্পিবাহক—এ প্রসঙ্গ বহু আলোচিত।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে যে সমস্যা-সংকট তৈরি হবে, সে কথা সূচনালগ্নে কেউ কেউ উল্লেখ করলেও অন্যদের মানবিক চেতনা তার বিরোধিতা করেছে। এখন বছর কয়েক কেটে যাওয়ার পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে না দেখে তারা কী ভাবছেন জানি না, কিন্তু সমস্যা নানামাত্রিক আকার ধারণ করছে, ভবিষ্যৎ বিবেচনায় বিপজ্জনকও বটে। তার কিছু কিছু আলামত সম্প্রতি দেখা দিতে শুরু করেছে। জানি না শেষ পর্যন্ত ঘটনা করাচির কাছাকাছি না পৌঁছে চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে।

বিশেষ করে কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে স্থানীয়রা ক্রমে সমস্যার সম্মুখীন হতে চলেছে। উল্লেখযোগ্য একটি দৈনিক পত্রিকার চমকপ্রদ শিরোনাম : ‘আমরা নিজেরাই এখন রোহিঙ্গা’, ‘তীব্র বঞ্চনাবোধে ধুঁকছে টেকনাফ-উখিয়াবাসী বাংলাদেশি মানুষ।’ বঞ্চনা ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক-সামাজিক সমস্যা ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে উল্লিখিত জনগোষ্ঠীর জন্য।

গুরুত্বপূর্ণ এ সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও সমাজের সুধীজন কতটা ভাবছেন জানি না। কিন্তু ভাবা জরুরি বলে মনে করি। তা না হলে আবারও তুলনা টানি—কক্সবাজার না হলেও টেকনাফ-উখিয়া ও সন্নিহিত অঞ্চল ভবিষ্যতে করাচির বিহারি-সিন্ধির সমস্যার আকার ধারণ করতে পারে।

এরই মধ্যে তুলনামূলক জনসংখ্যাগত বিচারে তেমন আলামত দেখা দিতে শুরু করেছে। প্রথমত উল্লিখিত অঞ্চলে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ঠাঁই দিতে বিশাল আশ্রয়শিবির তৈরি করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, আশ্রয়শিবিরের আশপাশ এলাকায় গত এক দশকে বিভিন্ন দফায় আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা এখন ১০ লাখের মতো। এ সংখ্যা আরো বাড়বে শুধু শরণার্থী আগমনেই নয়, রোহিঙ্গাদের বিস্ফোরক প্রজনন হারের কারণে।

অন্যদিকে ‘এখানকার স্থায়ী বাসিন্দাদের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ’ (কালের কণ্ঠ, ৭.৩.২০১৯)। তা ছাড়া সামান্য সংখ্যায় হলেও রোহিঙ্গা আগমন এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। স্বভাবতই স্থানীয় বাসিন্দার মনে নানা প্রকার আশঙ্কা এবং ভীতিও কাজ করছে। সমস্যাও তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের।

যেমন রোহিঙ্গাদের প্রতি স্থানীয় এনজিওদের পক্ষপাতিত্ব, তুলনায় স্থানীয়দের প্রতি উপেক্ষা। এমনকি পূর্বোক্ত দৈনিকের প্রতিবেদকের উদ্ধৃতি মতে, ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় রোহিঙ্গাদের দিনমজুর হিসেবে নিয়োগ স্থানীয়দের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে চলেছে। এমনজিওদের যুক্তি সম্ভবত এ রকম যে ওরা অসহায় শরণার্থী, বিশেষ সুবিধা ওদের প্রাপ্য।

কিন্তু ভুখ মানে না এসব মানবিক যুক্তি। তারা এসব আচরণের পেছনে দেখতে পায় ভিন্ন রকম উদ্দেশ্য। আর রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য সাম্রাজ্যবাদ প্রভাবিত এনজিওদের নিয়ে ভিন্ন রকম। এর প্রভাব পড়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তাদের মতে রোহিঙ্গাদের স্বভূমিতে ফেরত পাঠাতে শাসক কর্তৃপক্ষের চেষ্টা যথেষ্ট নয়। এভাবে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হচ্ছে বিভাজন। কখন যে বিস্ফোরণ ঘটে কে জানে।

কারণ জীবন-জীবিকা নিয়ে প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব চরিত্র ধর্মে বড় স্পর্শকাতর। এর সঙ্গে যদি রাজনীতির, বিশেষ করে স্বার্থপর রাজনীতির যোগসাজশ ঘটে তাহলে এর পরিণাম বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যেমন আমরা দেখেছি অবিভক্ত ভারতে, বঙ্গে দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে। ফলে রক্ত ঝরেছে, প্রাণহানিও ঘটেছে, যা অবাঞ্ছিত চরিত্রের।

চট্টগ্রাম সীমান্ত এলাকায় রোহিঙ্গাদের নিয়ে সমাজ ও রাজনীতির অবাঞ্ছিত চরিত্র বদল মোটেই শুভ পরিণাম তৈরি করবে না। আমরা মনে করি, সময় থাকতে শাসকশ্রেণির এ বিষয়ে সতর্কতা ও ব্যবস্থা অবলম্বন করা দরকার। দরকার অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখা। সর্বোপরি রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য সর্বমাত্রিক প্রচেষ্টা জোরদার করা দরকার।

যে মানবিক ঔদার্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, সেই যুক্তিতেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির সাহায্য নিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো দরকার মিত্র দেশ ভারত ও চীনের সাহায্য নিয়ে। ভেবে দেখা দরকার, সময় থাকতে ব্যবস্থা না নিলে ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী একদিন টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলকে রোহিঙ্গাস্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিও তুলতে পারে—যা হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। তখন মানবিক উদারতা রক্ষিত হবে নিজেকে হারিয়ে। স্মরণ করতে পারি শ্রীলঙ্কায় সিংহলি বনাম তামিল জাতিগোষ্ঠীর সংঘাত ও পরিণামের কথা।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

 

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা