kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

নারীর ক্ষমতায়নে গণমাধ্যমের সংবেদনশীলতা

দিল মনোয়ারা মনু

৮ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নারীর ক্ষমতায়নে গণমাধ্যমের সংবেদনশীলতা

এবার ৮ মার্চ স্লোগানের মূল প্রতিপাদ্য ‘পরিবর্তনের জন্য চাই সম-অধিকার চেতনা ও সৃজনশীল নেতৃত্ব।’ বিশ্ব নারী দিবস এবার পালিত হবে নতুন তাৎপর্য, নতুন অঙ্গীকার ও নতুনভাবে মূল্যায়নের আলোকে। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে আশা করা যায় নানা কর্মসূচি, আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে নারী আন্দোলনকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা হবে। আমরা জানি, আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলন এ দেশের সব নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রচার ও আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা, বিচ্ছিন্ন কোনো সংগ্রাম নয়। এবারও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ভিন্ন মাত্রায় গণমাধ্যম, নারী মানবাধিকার সংগঠন ও উন্নয়ন সংগঠন বহুবিধ কর্মসূচি পালন করবে। এর সঙ্গে এ বছর যুক্ত হয়েছে নতুন কিছু গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যু এবং এ দেশের নারী আন্দোলন সেই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু প্রশ্নও রেখেছে।

এ দেশের নারী আন্দোলন দেশের আর্থ-সামাজিক সমস্যা সমাধানের দাবি, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে দেশজুড়ে দীর্ঘদিন নানা কর্মসূচি পালন করে চলেছে। দেশে ৭২-এর সংবিধান অনুযায়ী অসাম্প্রদায়িক চেতনার পূর্ণ প্রতিষ্ঠা, রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকসহ সব শ্রমিকের জীবনের নিশ্চয়তা নিরাপত্তা, তাদের বেতন-ভাতা লেবার কোড অনুযায়ী প্রদান করা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সর্বপ্রকার নির্যাতন, বৈষম্য দূর করা এবং নির্যাতনকারীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা প্রভৃতি দাবি ঘিরেই এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। নারী কৃষি শ্রমিকদের পূর্ণ স্বীকৃতি, অভিবাসী নারীদের বর্তমান জীবন সংকটের সমাধানের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এবং পূর্ণাঙ্গ কৃষি শ্রম আইন প্রণয়ন সহায়ক কর্মসূচিও এসবের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রক্রিয়াতেই সমাজ থেকে নারী নির্যাতন চিরতরে বন্ধ করার পথ প্রশস্ত ও আন্দোলনসহ দুর্বার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। আশা করা হয়, প্রতিষ্ঠিত হবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ দেশের সব নাগরিকের জন্য গণতান্ত্রিক মানবিক সংস্কৃতির বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ সরকার জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নের কথা বললেও বাংলাদেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়াকে বাধামুক্ত করাসহ উন্নয়নের অনেক শর্তই এখনো পূরণ হয়নি। নারী-পুরুষের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির বাঁধ ভেঙে অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় নারীকে কিভাবে সার্থকভাবে যুক্ত করা যায়, তা বিবেচনায় রেখেই এ দেশের গণমাধ্যম তাদের নানা কর্মসূচি দীর্ঘদিনের কার্যক্রমে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা অব্যাহত রেখেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, নারী উন্নয়ন নীতির কর্মকৌশলকে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এ সমস্যা অনেক কমে যেত। ইদানীং পারিবারিক সহিংসতা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, স্বজনের হাতে স্বজন খুন, গুম, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, শিশু-কিশোরসহ আত্মহননের মর্মান্তিক সব ঘটনা সমাজে আতঙ্ক তৈরি করে চলেছে। নিরাপত্তা নেই ঘরে, কর্মস্থলে, বাইরে পথে। যা বন্ধ না হলে সমাজপ্রগতির পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। এ সত্যকে গণমাধ্যম উপলব্ধি করে আরো অগ্রসর হতে হবে।

বিশ্ব যখন ক্রমেই অর্থনৈতিক মন্দার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে, তখন বাংলাদেশেরও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে, যেখানে নারীর অবদান উল্লেখযোগ্য। সঙ্গে যুক্ত আছে সরকারি-বেসরকারি-নাগরিক-ব্যক্তির উদ্যোগসমূহ। জিডিপির হার গত বছর ৭ শতাংশ অতিক্রম করেছে। অচিরেই আরো ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অগ্রগতি আরো বেশি হওয়া সম্ভব হতো, যদি কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ, গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত হতো। অর্থনৈতিক সামাজিক সূচকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নারী আন্দোলন, মানবাধিকার আন্দোলন প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ব্যক্তির নিরাপত্তা অধিকার, মত প্রকাশের, অবাধ চলাচলের অধিকার, ভীতিমুক্ত পরিবেশে বসবাসের অধিকার, রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করাসহ সব ক্ষেত্রে নাগরিকের মানবাধিকার রক্ষা ও প্রতিষ্ঠায় সরকারের সদিচ্ছাসহ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। তা না হলে মুক্তচিন্তার প্রসার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার সংকুচিত হওয়ায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, অগ্রসর রাষ্ট্র গঠন চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

এ দেশের নারীসমাজের প্রাণের দাবি জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন এবং জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনসংখ্যা এক-তৃতীয়াংশে বাড়ানো। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ করতে হবে। এই দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশের নারীসমাজ ও সংগঠনগুলোর সঙ্গে গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলতে হবে।

সৃজনশীল কিন্তু চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীর আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্য লক্ষ করা যায়। বৈষম্য হয় পদোন্নতিসহ নানা ক্ষেত্রেই। বেতনবৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা, যৌন হয়রানি, কর্মসহায়ক পরিবেশের অভাব এখনো বিদ্যমান। যদিও বাংলাদেশ সরকার নারীসমাজের স্বার্থে বেইজিং ঘোষণা, সিডওসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি ও আইন প্রণয়নসহ বেশ কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপ ও বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা তাদের পেশায় ভিন্ন রকমের সমস্যার সম্মুখীন হয়। প্রথমত তারা নারী হিসেবে এ সমস্যার মোকাবেলা করে এবং দ্বিতীয়ত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে। আজকের সময়ে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সহকর্মীদের মানসিকতা পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু মফস্বলের নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে শুধু আশপাশের পরিবেশ থেকেই নয়, স্বয়ং পরিবার থেকেও তারা নানা রকম বাধার সম্মুখীন হয়। তাই এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য জরুরি ইতিবাচক পদক্ষেপ সব ক্ষেত্রেই নেওয়া প্রয়োজন। তা হলেই গড়া সম্ভব আধুনিক মানবিক সংস্কৃতির বাংলাদেশ।

লেখক : সাংবাদিক ও নারী অধিকারকর্মী

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা