kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১         

মেং, হুয়ায়েই গ্রেপ্তার এবং বাণিজ্য যুদ্ধ

স্টিফেন লেন্ডমান

৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মেং, হুয়ায়েই গ্রেপ্তার এবং বাণিজ্য যুদ্ধ

চীনের প্রভাবশালী বিভিন্ন কম্পানি, বিশেষ করে যেসব কম্পানি বিভিন্ন ক্ষেত্রে (বিশেষত উচ্চ প্রযুক্তি) মার্কিন কম্পানিগুলোর সমকক্ষ বা অতিক্রমণে সক্ষম, সেগুলোকে টার্গেট করা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশলের অংশ। চীনের হাইটেক জায়ান্ট কম্পানি হুয়ায়েই টেকনোলজিসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝাউকে টার্গেট করার কারণ এটাই।

হুয়ায়েই পঞ্চম প্রজন্মের (ফাইভজি) মোবাইল ফোন প্রযুক্তিতে বিশ্বসেরা। উচ্চ প্রযুক্তি খাতে হুয়ায়েই ও জেডটিই বড় অংশীদার। ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থীদের মনে বড় ভয়, ফাইভজি প্রতিযোগিতায় মার্কিন কম্পানিগুলোকে হারিয়ে দেবে এরা। এদের ফাইভজি প্রযুক্তি সর্বাধুনিক নগরের ও চালকবিহীন গাড়ির ইন্টারনেটযুক্ত ডিভাইস ইনফ্রাস্ট্রাকচার সচল রাখতে সক্ষম।

চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি একটি গৌণ বিষয়। মূল বিষয় হলো, চীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি হওয়ার দিকে ধাবমান; শিল্প ও প্রযুক্তির পাওয়ার হাউসও হতে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন তাদের এ যাত্রায় বাদ সাধতে চায়।

মেংকে গ্রেপ্তার করা এরই অংশ। ওয়াশিংটনের হয়ে নোংরা কাজটি করেছে কানাডা। অযৌক্তিকভাবে তাঁকে গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দি করা হয়েছে। ইরানের ওপর জারি করা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার ষড়যন্ত্র করছে হুয়ায়েই—এই ফালতু অভিযোগে।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন মন্ত্রণালয়ের ১৩ দফা অভিযোগপত্রে হুয়ায়েইর বিরুদ্ধে অনলাইন জালিয়াতি, অর্থপাচার, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ চুরি ও বিচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগও করা হয়েছে। হুয়ায়েই এবং তাঁর একটি সহযোগী কম্পানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) লঙ্ঘন করার অভিযোগও করা হয়েছে।

যুক্তরষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো রাষ্ট্রের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ জারি করা এবং এর ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন রয়েছে এ আইনে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি এমন হুমকি কেউ দেয়নি। রাশিয়া, চীন, ইরান অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তন নীতির শিকার কোনো রাষ্ট্রই এমন হুমকি দেয়নি।

মেংয়ের বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি, অনলাইন জালিয়াতি এবং এসবের জন্য যড়যন্ত্র করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে চালান করার জন্য কানাডাকে বলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ১০ দফা অভিযোগপত্রে হুয়ায়েই ও তার মার্কিন সহযোগী কম্পানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের টি-মোবাইল কম্পানির গোপনীয় বাণিজ্যিক তথ্য চুরি, অনলাইন জালিয়াতি ও বিচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগ তোলা হয়েছে। চীন এবং হুয়ায়েই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে চীনা কম্পানিগুলোর, বিশেষ করে হুয়ায়েই ও জেডটিইর কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে। এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশে গৃহান্তরীণ মেংকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর বিষয়টি অনুমোদন করেছে কানাডীয় কর্তৃপক্ষ। তাঁর আইনজীবী ডেভিড মার্টিন বলেছেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সেগুলো কানাডায় বেআইনি অভিযোগ নয়। তবে তাঁকে হস্তান্তর করা হলে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত বন্দি হস্তান্তর চুক্তি লঙ্ঘিত হবে। তিনি জানান, তাঁর মক্কেল মেং নিজের বক্তব্যে স্থির রয়েছেন। তিনি বলছেন, কোনো অন্যায় বা অপরাধ তিনি করেননি। তিনি নির্দোষ। যুক্তরাষ্ট্রের বিচারের উদ্যোগ এবং তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর সিদ্ধান্ত আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার।

বলা যায়, দীর্ঘ আইনি লড়াই বাধতে যাচ্ছে। চীন ও হুয়ায়েই জাতির স্বার্থ এবং কম্পানি ও মেংয়ের স্বার্থ রক্ষার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। প্রসঙ্গত, আদালতে মেংয়ের পরবর্তী হাজিরার দিন ৬ মার্চ (কানাডা সময় অনুযায়ী)। গত শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোকে একহাত নিয়েছেন। তিনি বলেন, মেং ইস্যুতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ধসের সম্মুখীন। সব অভিযোগ খারিজ করে মেংকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ট্রুডো সরকারের প্রতি আহ্বান জানান মুখপাত্র।

গত ২ মার্চ চীনের গ্লোবাল টাইমসে বলা হয়েছে, মেং ওয়ানঝাউয়ের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অতএব কানাডাকে এ বিষয়ে নাক গলানো বন্ধ করতে হবে। বেইজিং মনে করে, যা ঘটছে তার নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত চীন-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে হতে হবে, আদালতের মাধ্যমে নয়। আইনজীবী লং লিউ মেংকে আটক করার কানাডীয় পদক্ষেপকে ভুল ও বাজে পদক্ষেপ আখ্যা দিয়েছেন। বেইজিং মেংকে দ্রুত মুক্তি দেওয়ার পুনরায় আহ্বান জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞ লি হাইদং মেংকে গ্রেপ্তার করা, গৃহবন্দি করা এবং যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে দুঃখজনক আখ্যায়িত করে বলেছেন, এর ফলে চীন-কানাডা সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনীতির বিশ্লেষক মেই শিনয়ুর মতে, কানাডার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত। যদি বিষয়টির নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু সমাধান না হয়, তাহলে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরো খারাপ হবে।

লেখক : সেন্টার ফর রিসার্চ অন গ্লোবালাইজেশনের গবেষণা সহযোগী

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা