kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ১৭ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৭ সফর ১৪৪১       

ট্রাম্পের কূটনীতির ব্যর্থ প্রদর্শনী

অনলাইন থেকে

৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মাত্র এক বছর আগেও অনেকেরই আশঙ্কা ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কিম জং উনের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত সংঘাতে গিয়ে ঠেকবে। এর পরই সিঙ্গাপুর শীর্ষ সম্মেলন। ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন, তাঁরা ‘পরস্পরের প্রেমে পড়েছেন’। উত্তর কোরিয়া আর কোনো পারমাণবিক হুমকি নয়। তবে তাঁদের সেই প্রেম-উপাখ্যান টেকসই হয়নি বলেই মনে হচ্ছে। পরবর্তী দফা বৈঠকে সম্প্রতি তাঁরা বসেছিলেন হ্যানয়ে, সফল হননি। ছোটখাটো কোনো চুক্তিতেও পৌঁছতে পারেননি তাঁরা। আলোচনা ভেঙে গেছে।

উত্তর কোরিয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে চায় তারা। আর ট্রাম্প চাচ্ছিলেন তাঁর নামাঙ্কিত একটি কূটনৈতিক বিজয়। তবে এই দুই শক্তিশালী চালককে দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার সুগভীর খাদে সেতু তৈরি এ দফায়ও সম্ভব হয়নি। উত্তর কোরিয়া পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের কথা মুখে বলছে ঠিকই, তবে তার মধ্যে একতরফাভাবে এ ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই—কয়েক মাস আগে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাই এমন তথ্য দিয়েছিলেন। ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করার মতো বিষয়গুলো অবশ্যই বিশেষ মূল্য বহন করে। একই সঙ্গে সম্পর্ক বিনির্মাণেও ভূমিকা রাখে এগুলো। ইয়ংবিয়নের পরমাণু চুল্লি বন্ধ করে দেওয়াটাও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, এগুলোর মূল্য কতটা? অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ট্রাম্প  হয়তো অনেক বেশি মূল্যায়ন করছেন এগুলোকে। যেমন তিনি সিঙ্গাপুরে করেছিলেন।

হ্যানয়ে আলোচনা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে ট্রাম্প মন্তব্য করেন, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে ‘অসাধারণ সাফল্য’ আসতে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত এই সাফল্য নিশ্চিত করার ব্যাপারে ট্রাম্পের তীব্র আগ্রহের চাপে দেশে তাঁর সাবেক আইনজীবী মাইকেল কোহেন তাঁর সম্পর্কে কী বলছেন সে বিষয়টিই চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সব কিছুই যখন উল্টো রথে তখন ট্রাম্প জানালেন, তিনি আলোচনা ছেড়ে বের হয়ে এসেছেন। কারণ কিম সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। এটি অনেক বড় পদক্ষেপ, যা কিমের জন্য তাঁর উপহারের ঝুড়িতে ছিল না। তবে উত্তর কোরিয়ার দাবি, তারা নিষেধাজ্ঞার আংশিক প্রত্যাহার চেয়েছিল। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার জন্য ত্রাণের ব্যবস্থা করার দাবিও ছিল তাদের। তারা আলোচনার আগে স্পষ্ট করে এও জানায়, ইয়ংবিয়ন পরমাণু চুল্লি বন্ধ করার আগেই তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার দেখতে চায়। জানা গেছে, উত্তর কোরিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি স্টিভ বেইগামকে এই আলোচনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। কাজটি সম্ভবত ঠিক হয়নি। অনেকেই মনে করেন আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য জন বোল্টন দায়ী। 

প্রশ্ন হচ্ছে, এবার তাঁদের গন্তব্য কোথায়? সম্মেলন-পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প অবশ্য অগ্রগতির দাবি করেছেন। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। উত্তর কোরিয়ায় ১৭ মাসের বন্দিদশা শেষে দেশে ফেরা শিক্ষার্থী ওটো ওয়ার্মবিয়ারের মৃত্যু নিয়েও তাঁদের দুজনের কথা হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে এ সম্মেলনের বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া এতটা মধুর নয়। উল্টো বেশ তিক্ত। তাদের বক্তব্য, কিমের মনে হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র কোন হিসাব কষে এগোতে চাচ্ছে তিনি বুঝতে পারেননি।’ এমনও হতে পারে, তিনি পরবর্তী আলোচনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। 

দুই পক্ষের জন্যই পরবর্তী আলোচনা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিমের ভাবমূর্তি এরই মধ্যে দুই দফার প্রেসিডেনশিয়াল বৈঠকে বসার কারণে দেশ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ উজ্জ্বল। হ্যানয় থেকে ফিরতি পথে তাঁর ট্রেন যাবে চীনের মধ্য দিয়ে। ট্রাম্পের সঙ্গে একটি ব্যর্থ আলোচনার পর তাঁর বেইজিংয়ে বিরতি নেওয়ার সম্ভাবনা আরো বেড়েছে। পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি ট্রাম্পের উষ্ণতা বৃদ্ধিই বেইজিংকে কিমের ঘনিষ্ঠ করে তুলছে। যদিও অতীতে কিম তাঁদের খুব একটা পছন্দনীয় ছিলেন না। এর আগে ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের বিরোধের সময় তাঁদের কাছাকাছি আনতে চেষ্টা চালিয়েছিল সিউল। তবে এবার সে কাজটি আর সহজ হবে না। ওই সম্পর্কগুলো শোধরানো সম্ভব না হলে আন্ত কোরীয় অর্থনৈতিক উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়াও সম্ভব হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রকে এখন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ব্যবস্থাপত্রে ফিরে যেতে হবে, ‘কৌশলগত সংযম’। তবে উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে সবচেয়ে বাজে ঘটনাটিও এখন ঘটে যেতে পারে। সে আশঙ্কা রয়েছে। ট্রাম্প ও কিম যখন পরস্পরকে অপমানে লিপ্ত ছিলেন সে সময়ের তুলনায় বিশ্ব এখন অনেক নিরাপদ। তবে ট্রাম্পের প্রদর্শনীর কূটনীতি উত্তর কোরিয়ার নেতাকে শক্তিশালী করেছে। পরমাণু প্রকল্প একেবারে নিশ্চিহ্ন নয়; বরং তার স্থবিরাবস্থা চেয়ে একটি নম্র, সতর্ক এবং বাস্তব উদ্যোগ হয়তো অনেক বেশি বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থা হতে পারত।

সূত্র : গার্ডিয়ান

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা