kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

দিল্লির চিঠি

দুই দেশই খুঁজছে শান্তি!

জয়ন্ত ঘোষাল

৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



দুই দেশই খুঁজছে শান্তি!

ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি একজন ব্যক্তি। রক্ত-মাংসের এক মানুষ। এক অসাধারণ ক্রিকেটার। অসাধারণ কারিশমা। ভারতে, বিশেষত কলকাতায় ইমরানকে নিজের চোখে দেখেছি, কী প্রচণ্ড জনপ্রিয়তা। ১৯৯৭ সালে আমি পাকিস্তানের ভোট কাভার করতে গেয়েছিলাম। সেবার বেনজির ভুট্টোর প্রস্থান আর নওয়াজ শরিফের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার নির্বাচনের সাক্ষী ছিলাম আমি। মনে আছে, সে সময় লাহোরে ইমরানের বাড়ি গেয়েছিলাম। ইমরানের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা মারার সুযোগ হয়েছিল তখন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রথম স্ত্রী। দেখেছিলাম, ইমরান আদৌ গোঁড়া মুসলমান নন। মৌলবাদ তো দূরের কথা, তাঁর জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ পশ্চিমি। তবে তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক অভিলাষ ছিল খুবই তীব্র।

এরপর বহু বছর অতিবাহিত। পারভেজ মোশাররফের সেনা শাসনের বিরুদ্ধে তিনি অনশন করেছিলেন। আবার সেই ইমরান নওয়াজ শরিফের শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর দলের আন্দোলনকে সর্বশেষ ভোটের আগেও ইসলামাবাদ পর্যন্ত নিয়ে যান। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় নিয়ে তিনি পাকিস্তানের রাজধানীকে অচল করে রাখেন। ইমরান যখন পারভেজবিরোধী অভিযান চালান, তখনো তাঁর পেছনে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী, আবার নওয়াজকে দেশ ছাড়া করার সেনা পরিকল্পনার জন্যও ইমরান ছিলেন প্রধান নায়ক।

তাই সংবাদমাধ্যমের একাংশ, এমনকি ঢাকার কিছু সংবাদপত্রেও যখন দেখি ইমরানের ভজনা, তখন আমি সেই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত হতে পারি না। কারণ ব্যক্তিগতভাবে ইমরান মানুষ হিসেবে যা-ই হোন না কেন, আসলে তিনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল। পাকিস্তানে আজও সেনাবাহিনী যা বলবে সেটাই শেষ কথা। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যখন জন্ম হলো, তখনো পাকিস্তানের চরিত্র যা ছিল, তা থেকে পাকিস্তান আজও কোনো বড় পরিবর্তনের নজির রাখতে পারল না। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল, এখনো যেভাবে আবার স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানি সেনার নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়, আজও ইমরান খানের পাকিস্তান যা করছে, তা কি সেই অতীত ট্র্যাডিশন থেকে ভিন্ন?

তাই ইমরান খানকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়ার কথা যাঁরা বলছেন, তাঁরা আসলে মিথ্যাচার করছেন। সত্য জেনেও না জানার ভান করছেন। জামায়াত গোষ্ঠীর উগ্র রাজনীতি ঢাকায়ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে ভারতবিরোধিতার তাস ব্যবহার করে। কিন্তু শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দুনিয়ার সামনে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। দেখুন, আয়তনে পাকিস্তানের চেয়ে ছোট হলেও গর্বের সঙ্গে এ কথা বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ স্বীকার করে যে হাসিনার সরকারও কিন্তু সে দেশে সেনাবাহিনীকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। যেমনটা সেই নেহরুর সময় থেকে আজও, মোদি যুগেও, ভারতও রক্ষা করেছে। একে বলে গণতন্ত্রের শক্তি। আর পাকিস্তান? নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেই নওয়াজ শরিফকে ডেকেছিলেন। নওয়াজ শান্তি স্থাপনার ব্যাপারে অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। মোদি তো প্রটোকল ভেঙে তাঁর মেয়ের বিয়েতে লাহোরে হাজিরও হয়ে যান। সুষমা স্বরাজকেও পাঠান। কিন্তু তাঁর বদলে নওয়াজ কী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পেরেছেন? ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাহায্যে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেত্রী মোদি সরকারের পাকিস্তানবিরোধী আক্রমণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গোয়েন্দা ব্যর্থতা কেন হলো? আদৌ জইশ-ই-মোহাম্মদের জঙ্গিদের কি ভারতীয় বায়ুসেনারা মারতে পেরেছে? কারা মরেছে? কতজন? এসব তথ্য চেয়েছেন মমতা। তিনি বলছেন, সব তথ্য দিতে হবে। ভোটের আগে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা হচ্ছে না তো? মানে যুদ্ধ নিয়ে রাজনীতি?

ভোটের মুখে রাহুল গান্ধী বা অন্য কোনো বিরোধী নেতা সরাসরি এসব অভিযোগ করার সাহস দেখাননি, মমতা দেখিয়েছেন। তবে যদি রাজনীতির কথাই বলতে হয়, এই ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে লোকসভা ভোটের মুখে বড় লাভ হয়ে গেছে নরেন্দ্র মোদির। ২০১৪ সালে লোকসভা ভোটে ২৮২ আসন দখল করে বিজেপি ক্ষমতায় আসে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে। কিন্তু ২০১৪ এবং ২০১৯ এক নয়। গত পাঁচ বছরে নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তায় ভাটার টান এসেছিল। কোনো সন্দেহ নেই, মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, দলিত অসন্তোষ, বেকার-কর্মহীনদের সমস্যা, কৃষকদের আত্মহত্যা ইত্যাদি। পুলওয়ামায় পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী জইশ-ই-মোহাম্মদের আক্রমণের পর পুরো পরিস্থিতিই বদলে গেছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাজনীতিতে এলেন কি এলেন না, বিরোধীরা একত্র হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করছে কি করছে না—এসব প্রশ্ন আপাতত অবান্তর হয়ে গেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, মোদি পাকিস্তানি সন্ত্রাসের যথোচিত জবাব দিতে পেরেছেন কি পারেননি?

পুলওয়ামার আক্রমণ তো পাকিস্তানই করেছে। ভোটে জেতার জন্য নরেন্দ্র মোদি এ কাজ করেছেন সে কথা তো কেউ বলতে পারেন না। এখনো বলেননি। আবার ভারতীয় বায়ুসেনা যে আক্রমণ হানল সেটাও তো অসত্য নয়। আপাতত ভারতে কিছু মানুষ কিছু বামপন্থী ও উদারবাদী বলছেন বটে, এত জাতীয়তাবাদী হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখন ঘোরতরভাবে পাকিস্তানবিরোধী। এই আবেগ ও এই অ্যাকশনে মোদির রাজনৈতিক লাভ সুনিশ্চিত।

বাংলাদেশের পাঠককে আমি মনে করাতে চাই, পাকিস্তানে নির্বাচনের আগে ইমরান কী করেন। আজ তিনি শান্তির পায়রা ওড়াচ্ছেন, কিন্তু ভোটের আগে এই ইমরানই তো ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বলেছিলেন। জেতার পর এখন তিনি আলোচনার কথা বলছেন। মোদিও আজ ভোটের আগে আলোচনার কথা বলতে পারেন না।  

যুদ্ধ কখনোই শান্তির বিকল্প হতে পারবে না কিন্তু একটা কথা মনে রাখতেই হবে, এখন ভারত-পাকিস্তান যা পরিস্থিতি তাতে কি দুই দেশের মধ্যে আলোচনা সম্ভব?

আমি বলব, আমরা আর যা-ই হোক চাইব না বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে আলাদা বন্ধুত্ব করে ফেলুক। দেখুন, ঢাকা কিন্তু এ ব্যাপারে চালাকি করেনি অথবা বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানকে কোনো সুযোগ দেয়নি। তাহলে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কী? আমি বলব, আমাকে এক প্রবীণ অফিসার বললেন, দুই দেশের মধ্যে সংঘাত যেমন সত্য, তেমনি সত্য দুই দেশই খুঁজছে শান্তি! দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়া!

ইমরান খান অবশ্য পাইলটকে ভারতে তাড়াতাড়ি ফেরত পাঠিয়ে আবার আলোচনা, আবার শান্তি প্রয়াসের কথা বলে নোবেল পুরস্কারের দাবিদার হয়েছেন। পাকিস্তানের সংসদে সে দাবি উঠেছে। কিন্তু ভারত আর পাকিস্তানের ইতিহাসে বারবার এটা দেখেছি। লাহোরে বাসে করে অটল বিহারি বাজপেয়ি যখন পৌঁছেছিলেন তখন ভারতেও দাবি উঠেছিল যাতে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

গত প্রায় ৭০ বছর ধরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক তাই যেন এক তৈলাক্ত বাঁশে বাঁদরের ওঠা-নামা। বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর প্রথম বিদেশ সফর ছিল কলম্বো। সার্ক সম্মেলন। সেই সফরে তৎকালীন পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে বাজপেয়ির বৈঠক হয় তাজ সমুদ্র হোটেলে। সেদিন অকুস্থলে হাজির ছিলাম। দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর হোটেলের কনফারেন্স হলে টেবিলের ওপর জাতীয় পতাকা লাগিয়ে বাজপেয়ি সংবাদ সম্মেলন করলেন। ঘোষণা করলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে তিনি আলোচনা শুরু করতে চান। এরপর ওই একই কক্ষে সাংবাদিক বৈঠক করতে এলেন নওয়াজ। একই চেয়ার। একই টেবিল। আমরাও বসে থাকলাম। শুধু পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী টেবিলের ওপর পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা লাগায়। কিন্তু কী বললেন তিনি? নওয়াজ বললেন, ভারতের সঙ্গে তাঁর বৈঠক সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বৈঠকের নিট ফল শূন্য। কারণ কাশ্মীরে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।

সেই কক্ষের একদম পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম বাজপেয়ির মিডিয়া উপদেষ্টা অশোক ট্যান্ডনের সঙ্গে। প্রায় স্বগতোক্তির মতো তিনি বললেন, কী অদ্ভুত লোক। বৈঠকের ভেতর এতক্ষণ শান্তির কথা বললেন। এমনকি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিস্তারের কথা বললেন। আর এখন সেই লোকটিই এসব কথা বলছেন? উল্টো সুর গাইছেন? কী কাণ্ড! সেটা ছিল ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসের কথা। আর এখন ২০১৯ সালের মার্চ মাস। নওয়াজ ক্ষমতায় ছিলেন, আজ নেই। আজ ইমরান খান দেশের প্রধানমন্ত্রী, তিনি বলছেন শান্তির কথা! এটাও কী সত্য ভাষণ? তাহলে মাসুদ আজহারকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার ভারতীয় দাবি মানতে ইমরান খানের সমস্যা কোথায়?

আমি শুরুতে যা বলেছিলাম আজ আবার তাই বলছি, শান্তি আলোচনা ছাড়া দুই দেশের মধ্যে সমাধানের অন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই। কিন্তু কথা বলার জন্য পূর্বশর্ত প্রয়োজন! আমরা ঘর-পোড়া গরু। ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে কারগিল ধরলে চারটি যুদ্ধ হয়েছে। আর যুদ্ধ হোক শান্তিকামী কোনো মানুষ তা চায় না, কিন্তু শেখ হাসিনা যেভাবে সন্ত্রাস দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, পাকিস্তান সেনার হাতের পুতুল ইমরান খান তা করবেন—এটা ভাবতে এখনো কষ্ট হচ্ছে।

লেখক : কালের কণ্ঠ’র বিশেষ প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা