kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

ট্রাম্প-কিম বৈঠক থেকে কী পেল বিশ্ব

ফরিদুল আলম

২ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ট্রাম্প-কিম বৈঠক থেকে কী পেল বিশ্ব

দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় অবশেষে হ্যানয় পৌঁছলেন উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন। কেন তিনি বিমানযাত্রা পরিহার করে ট্রেনযাত্রাকে বেছে নিলেন, সেটি নিয়েও বিশ্বব্যাপী ব্যাপক বিশ্লেষণ হয়েছে। অনেকের মতে, এটি আলোচনায় থাকার আরেকটি অভিনব কৌশল। যা-ই হোক, দুই নেতার মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো, তবে শেষ হতে পারল না। বৈঠকের মাঝপথেই সেটি স্থগিত হয়ে যায়। অবশ্য ট্রাম্প সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয় নিয়ে অনেক আলাপ করেন এবং বৈঠক নিয়ে মূল্যায়ন করেন। গত ২৭ তারিখে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের মেট্রোপোল হোটেলে যে বৈঠকটি শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি, তা আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থতায় রূপ নেয় মূলত কিম জং উনের কঠোর অবস্থানের জন্য। এর আগে গত বছরের ১২ জুন সিঙ্গাপুরের সান্তোষ দ্বীপে দুই নেতার মধ্যে প্রথম বৈঠকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয় এবং ওই বৈঠকের পর প্রাথমিকভাবে উত্তর কোরিয়ায় আটক যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের ফেরত দেওয়া হয়। কিমের পক্ষ থেকে সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার জবাবে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে বৈঠকের অগ্রগতির বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। দীর্ঘ আট মাস পর উত্তর কোরিয়া দাবি করছে যে তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে, এই সময়ের মধ্যে নতুন করে কোনো পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়নি এবং কিছু পারমাণবিক স্থাপনা তারা বন্ধ করে দিয়েছে। এসব বিচারে তারা তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাপ দেয়।

ট্রাম্প-কিমের মধ্যকার এবারের বৈঠককে বিভিন্ন বিশ্লেষক বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করছেন। কারো ভাষায় বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে, আবার কারো ভাষায় একটি শান্তি আলোচনার উদ্যোগ ভেঙে গেছে, আবার কেউ বা বলছেন, এটি স্থগিত হয়েছে। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের যে জবাব দেওয়া হয় সেখানে ট্রাম্পকে বেশ কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে কথা বলতে দেখা গেল। তিনি জানালেন, ‘সময়মতো আমরা একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসতে সক্ষম হব, তবে এটি ঠিক যে এখনো অনেক শূন্যতা রয়ে গেছে।’ এবারের শীর্ষ বৈঠকে যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার নেতা যুক্তরাষ্ট্রের আশ্বাসে এখনই তাঁর দেশের সব পারমাণবিক স্থাপনাকে নিষ্ক্রিয় করার পক্ষপাতী নন, তিনি এমন দাবির জবাবে বলেছেন যে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে তাঁরা নিষ্ক্রিয় করবেন, যা যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা দেশটির প্রতি ইঞ্চি ভূমি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখি এবং আমাদের সেটিই অর্জন করতে হবে, যা আমরা অর্জন করতে চাই।’ এর মাধ্যমে ট্রাম্প হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে কোনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কোনটি নয়, সে বিষয়ে কিমের বক্তব্যের প্রতি তাঁদের যথেষ্ট আস্থা নেই। আর সে জন্যই তাঁরা বেশ জোরেশোরে চাইছেন সম্পূর্ণভাবে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত একটি কোরিয়া উপদ্বীপ। আর এ ব্যাপারে তিনি কোনো বিকল্প প্রতিশ্রুতিতে আস্থাশীল হতে চান না। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সাম্প্রতিক সময়ে উঠে এসেছে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে। তারা কিছুদিন আগে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে দুই নেতার মধ্যে সিঙ্গাপুর সম্মেলনের পর উত্তর কোরিয়া শুধু একটি পারমাণবিক স্থাপনা নিষ্ক্রিয় করলেও গোপনে আরো ১৭টি স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তারা পরমাণু কর্মসূচি পরিত্যাগের পরিবর্তে তা আরো সমৃদ্ধ করছে। আর সে কারণেই সম্ভবত এবারের বৈঠকে ট্রাম্প এ বিষয়ে কিমের কাছ থেকে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি চাইছিলেন, যা অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে যে এখানে এক ধরনের ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছে।

বৈঠকের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র কী অর্জন করতে চায়, সেটি পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তারা চাইছিল কিমকে চাপের মধ্যে রেখে পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করা। এটি তাই অনেকটা অসম্ভব এবং অবাস্তব দাবি মনে হচ্ছিল অনেকের মধ্যে। যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে উইন উইন সিচুয়েশনের কোনো ক্ষেত্রই এখন প্রস্তুত হয়নি, সেখানে দাঁড়িয়ে একতরফাভাবে নিজেদের অনুকূলে দাবি পূরণ করাটা তাই অযৌক্তিক বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। ট্রাম্প অবশ্য বৈঠকের প্রথম দিন কিমকে অনেকটা স্বপ্ন দেখাতে চেষ্টা করেন উত্তর কোরিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে একটি পাওয়ার হাউস হিসেবে উল্লেখ করে এবং পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের মাধ্যমেই এটি সম্ভব বলে বোঝাতে চেষ্টা করেন।

সব কিছু ছাপিয়ে এবারের বৈঠকের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে গতবারের মতো চীনের প্রভাবটি আড়ালে রইল না। গত এক বছরের মধ্যে উত্তর কোরীয় নেতা কিমের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের কমপক্ষে চারবার সাক্ষাৎ হয়েছে। কিম এই সময়ের মধ্যে দুইবার চীনের উদ্দেশে ট্রেনযাত্রা করেন। এর বাইরে দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সফর চলমান রয়েছে সব সময়। সাম্প্রতিক সময়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই বৈঠকের ফলাফল বহুলাংশে চীনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া যেন কোনোভাবেই অবরোধ প্রত্যাহার ছাড়া নিরস্ত্রীকরণে সম্মত না হয়, সে বিষয়েই তাকে দীক্ষিত করা হয়েছে বিগত মাসগুলোতে। ট্রাম্প এ ক্ষেত্রে অনেকটা কৌশলী হয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শির প্রশংসা করে তাঁকে একজন মহান বিশ্বনেতা উল্লেখ করেন। সেই সঙ্গে চীনকে তাঁদের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান। কিছুটা হুমকির সুরে তিনি চলমান চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সংলাপের দিকে ইঙ্গিত করে জানান যে তিনি সমস্যা সমাধানের স্বার্থে সব সময় আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে চীন থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বিলিয়ন ডলারের করারোপের জবাবে চীনও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর ১১০ বিলিয়ন ডলারের নতুন শুল্ক ধার্য করলে এর মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র এই সমস্যা সমাধানের জন্য ট্রাম্প-কিম বৈঠকের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিল। ফলাফল যা দাঁড়াল, তা থেকে অনুমান করা যাচ্ছে যে ট্রাম্প প্রশাসন করারোপের ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেবে, যা আগে থেকেই ধারণা দিয়ে রাখা হয়েছিল। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র সত্যি যদি এমন কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হয়, তবে চীন তাদের দাবার ঘুঁটির মতো উত্তর কোরিয়াকে ভবিষ্যতে ব্যবহার করতে কার্পণ্য করবে না। এ বছর নিউ ইয়ারের এক অনুষ্ঠানে কিম কিছুটা হুমকি দিয়েই বলেছিলেন যে তাঁরা দাবি অনুযায়ী সব শর্ত পালনের পরও যদি বঞ্চিত থেকে যান, তবে বিকল্প ভাবনা ভাবতে হবে তাঁদের। সে ক্ষেত্রে কি এটিই দাঁড়ায় না যে আবারও শিগগির অশান্ত হতে যাচ্ছে কোরিয়া উপদ্বীপ?

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা