kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

স্বৈরতন্ত্রের পথে ট্রাম্প!

প্যাট্রিক মার্টিন

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণাকে আমেরিকার সংবিধান ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট জনগণের তহবিল কী করে খরচ হবে, সে ব্যাপারে কংগ্রেসকে টপকে বিশেষ ক্ষমতার ব্যবহার করলেন। হোয়াইট হাউস থেকে গত শুক্রবার দেওয়া ঘোষণায় বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রাথমিকভাবে মার্কিন সেনাবাহিনী এবং পেন্টাগনের বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ সম্পন্ন করতে চান। সিদ্ধান্ত জানানোর আগে অবশ্য বলা হয়েছে, ওই সীমান্ত ‘জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকিস্বরূপ’।

১৯৫৩ সালের যুক্তরাষ্ট্রের কোডের অধ্যায় ১২৩০২-এর ধারা ১০-এ বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ২৪ মাসের জন্য ১০ লাখ পর্যন্ত রিজার্ভ সেনা মোতায়েন করতে পারবেন। ৯/১১-এর হামলার পর এই আইন ব্যবহার করে ইরাক ও আফগানিস্তানে সেনা মোতায়েন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত পরিস্থিতিকে যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে তুলনা করতে চাইছেন। তিনি অভিবাসী ও শরণার্থীদের চিত্রিত করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলাকারী হিসেবে।

জাতীয় জরুরি অবস্থা জারির কারণে প্রেসিডেন্ট সংবিধান সংগতভাবে মোট ১৩৬টি বিষয়ে তাঁর নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারবেন। এর মধ্যে মাত্র ১৩টি কাজের জন্য তাঁর কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ বাকি ১২৩টি বিষয়ের জন্য কংগ্রেসের দিকে তাকাতে হবে না তাঁকে।

ট্রাম্পের এবারের ঘোষণাটি ‘পস কমিটাটাস অ্যাক্ট’-এর সরাসরি লঙ্ঘন। এই আইনে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন নিষিদ্ধ। এই অবৈধতা এড়ানোর উদ্দেশ্যেই ট্রাম্পের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী ‘দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্তে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রীর কাজে সহায়তা করবে।’

মৌলিকভাবে ট্রাম্পের এই নির্দেশনা নানাভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের লঙ্ঘন। সংবিধানের আর্টিকেল—১, সেকশন ৯, ক্লজ ৭-এ বলা হয়েছে, ‘আইনগত অনুমোদন ছাড়া তহবিল থেকে কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না।’ এই বাক্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া খরচের জন্য কোনো অর্থ নেওয়া যাবে না।

কংগ্রেসের ডেমোক্রেটিক নেতারা ট্রাম্পের এই ঘোষণাকে ‘অবৈধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এবং সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণা কংগ্রেসের বিশেষ ক্ষমতার লঙ্ঘন। এই ক্ষমতা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট আইনের ঊর্ধ্বে নন। কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে সংবিধান ক্ষতি করতে দিতে পারে না।’

তবে তেমন একটা কিছুই সম্ভবত ঘটতে চলেছে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস শিগগিরই হয়তো প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণাকে অনুমোদন দিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করবে। এর ১৮ দিনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সিনেটে ভোটাভুটি হবে। কয়েকজন রিপাবলিকান সিনেটর এ প্রস্তাবের পক্ষে থাকবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে এরপর এই প্রস্তাবে ভেটো দেবেন ট্রাম্প। এরপর ট্রাম্পের ভেটোর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের কোনো কক্ষেই দুই-তৃতীয়ংশ ভোট পড়ার সম্ভাবনা নেই।

ট্রাম্প জানেন, সুপ্রিম কোর্টে তাঁর জয়ের সম্ভাবনাই বেশি। জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির কারণেই এ ঘোষণা দিয়েছেন বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। তিনি জানেন, বিরোধীরা হয়তো জেলা পর্যায়ের আদালতে সাফল্য পেতে পারে। তবে সুপ্রিম কোর্টে গেলে রায় ট্রাম্পের পক্ষেই যাবে। যেমনটি ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম সফরকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা  জারির পর।

ডেমোক্র্যাটরা সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ১৩৭ কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। এখন ট্রাম্পের আইজনীবীরা এ যুক্তি তুলে ধরতে পারেন যে কংগ্রেস দেয়াল নির্মাণের ব্যাপারে নীতিগতভাবে একমত। কত দ্রুত দেয়াল নির্মাণ করা যেতে পারে, তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

ট্রাম্পের গত শুক্রবারের সংবাদ সম্মেলনে অভিবাসীদের অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করে বলা হয়েছে, অভিবাসীরাই যুক্তরাষ্ট্রে মাদক, অপরাধ ও সন্ত্রাস প্রবেশ করাচ্ছে। ট্রাম্পের জরুরি অবস্থা ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে অভিবাসন সংকটের ‘চূড়ান্ত সমাধান টানা’। ট্রাম্প যে ধরনের ভাষার ব্যবহার করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে অতীতে তেমনটি শোনা যায়নি। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তের সঙ্গে তাঁর ভাষার মিল পাওয়া যায়। দেশটির পুলিশ মাদক নির্মূলের নামে হাজার হাজার মানুষকে খুন করছে। কিন্তু রোজ গার্ডেন থেকেও যখন একই ধরনের মন্তব্য শোনা যায় তখন নির্ভুলভাবে বলে দেওয়া যায়, স্বৈরশাসনের দুয়ারে উপনীত যুক্তরাষ্ট্র। 

লেখক : কানাডার এই সাংবাদিক জেরুজালেমভিত্তিক দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইলের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ব্যুরোপ্রধান

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা