kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১                     

আমাদের চেতনার বাতিঘর

ড. এম আবদুল আলীম

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমাদের চেতনার বাতিঘর

আনিসুজ্জামান একালের বাঙালির চেতনার বাতিঘর। আপন ঐশ্বর্যে বহন করে চলেছেন অসাম্প্রদায়িকতা, প্রগতিশীলতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা চিরায়ত বাঙালির শাশ্বত গৌরবের সব কিছুকে। গত শতাব্দীর বঙ্গ দেশে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও দীর্ঘ প্রভাববিস্তারী দুই ঐতিহাসিক ঘটনা ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে ছিল তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। স্বাধিকার সংগ্রামের উত্তাল দিনগুলো থেকে আজ অবধি জাতীয় জীবনে ঘটমান তাৎপর্যবহুল সব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। মানবতা ও কল্যাণের দীপশিখা হাতে রাষ্ট্র-সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে তাঁর নিরন্তর পথচলা। ১৮ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্মদিন। ১৯৩৭ সালের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বসিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। সুসাহিত্যিক শেখ আবদুর রহিম তাঁর পিতামহ, পিতা মোয়াজ্জেম হোসেন, মাতা সৈয়দা খাতুন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। মায়ের ছিল লেখার অভ্যাস, লিখতেন তাঁর বড় বোনও। সাহিত্য-সংস্কৃতির এমনি এক বর্ণিল আবহের উদার পারিবারিক পরিবৃত্তে তাঁর বেড়ে ওঠা। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে তিনি যেমন অংশগ্রহণ করেছিলেন, তেমনি একুশে ফেব্রুয়ারি রক্তাক্ত ঘটনার পর নির্মিত প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে নিজের গলার হার খুলে দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করেছিলেন তাঁর মা। এমন মায়ের সন্তানের চেতনার মর্মমূলে চিরায়ত বাঙালিত্বের ছাপ যে গভীরভাবে প্রোথিত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।

পড়ালেখায় হাতেখড়ি পরিবারের সদস্যদের কাছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু কলকাতার পার্ক সার্কাস হাই স্কুলে। সেখানে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে চলে আসেন খুলনা জেলা স্কুলে, অতঃপর পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকার প্রিয়নাথ হাই স্কুলে। এখান থেকে ১৯৫১ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে পাস করেন ইন্টারমিডিয়েট। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। ১৯৫৬ সালে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৫৮ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। কৃতিত্বের জন্য লাভ করেন ‘নীলকান্ত সরকার বৃত্তি’। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেন পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি। দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। পালন করেছেন রাষ্ট্রীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে রয়েছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিস্তৃত হয়েছে তাঁর কর্মের পরিধি। অলংকৃত করেছেন ইমেরিটাস প্রফেসরের পদ। বর্তমানে জাতীয় অধ্যাপক।

আনিসুজ্জামান খ্যাতিমান হয়েছেন তাঁর গবেষণাকর্ম, মেধা-মনন ও বুদ্ধি-বিচক্ষণতার জন্য। বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার ধারা, পুরনো বাংলা গদ্যের রূপ-রীতি, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, বাংলা বানান ও উচ্চারণ প্রভৃতি তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র। এ ছাড়া বাঙালির সমাজ-ইতিহাসে প্রগতিশীলতার চর্চা, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার লালন এবং সর্বোপরি মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে তিনি লেখনী সঞ্চালন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো : ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’, ‘মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র’, ‘স্বরূপের সন্ধানে’, ‘পুরনো বাংলা গদ্য’, ‘মুনীর চৌধুরী’ প্রভৃতি। দুই খণ্ডে রচিত আত্মজীবনী ‘কাল নিরবধি’ ও ‘বিপুলা পৃথিবী’ তাঁর ব্যক্তিজীবনের পাশাপাশি বাংলার সমাজের-ইতিহাসের এক বিশেষ সময়কে ধারণ করে আছে। সত্যিই বিপুল তাঁর পৃথিবী।  উনিশ শতকে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের প্রভাবে বাঙালি জীবনে যে জাগরণ ঘটেছিল, মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিভূরা যে চেতনাধারা বিকশিত করেছেন, তিনি সেই মুক্তবুদ্ধিচর্চার প্রাণপুরুষ। শুধু তা-ই নয়, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-বঙ্গবন্ধু যে বাঙালিত্বের অহঙ্কারে দীপ্যমান, তিনি সেই চেতনার ধারক। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করেন, বাঙালি হতে হলে ও গণতন্ত্রী হতে হলে ধর্মনিরপেক্ষ না হয়ে উপায় নেই। তাঁর মতে, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সঙ্গে ধর্মীয় বিষয়ের সংযোগহীনতা, ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সংস্রবশূন্যতা, পারলৌকিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন ইহজাগতিকতা। ধর্ম থাকবে নাগরিকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচরণের বিষয় হয়ে। রাষ্ট্র সবাইকে নিজস্ব ধর্মপালনের স্বাধীনতা ও অধিকার দেবে। কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধর্মের সম্পর্ক থাকবে না।’

অগণিত লেখক, কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তাশীল মনীষী তাঁর চেতনাজগেক শাণিত করেছে। তিনি লাভ করেছেন অনেক কীর্তিমানের সান্নিধ্য। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মুনীর চৌধুরীর মতো খাঁটি বাঙালিকে পেয়েছেন শিক্ষক হিসেবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের মতো মহান ও উদার রাজনীতিকের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য তাঁর জীবনাভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ। সহজ-সরল জীবনযাপন এবং প্রখর ব্যক্তিত্ব তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে অতি উচ্চতায়। জ্ঞান-সাধনা ও কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছেন দাউদ পুরস্কার (১৯৬৫), বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭০), একুশে পদক (১৯৮৫), পদ্মভূষণ (২০১৪), স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৫), আনন্দ পুরস্কার (২০১৭), জগত্তারিণী পদক (২০১৮) প্রভৃতি। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে প্রদান করেছে সম্মানসূচক ডি.লিট।

আনিসুজ্জামান শুধু ব্যক্তি নন, প্রতিষ্ঠান। কর্মসাধনা আর ব্যক্তিত্বের প্রভায় ছাড়িয়ে গেছেন নিজেকেই। অসাম্প্রদায়িক চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীলতার চর্চায় তিনি হয়ে উঠেছেন একালের বাঙালির চেতনার বাতিঘর। তাঁর কল্যাণধর্মী চিন্তা সমাজ ও রাষ্ট্রকে দেখায় অগ্রগতির পথ। ক্রমাগত অন্ধকার ঠেলে আলোক-সারথিরূপে তিনি এগিয়ে চলেন অবিরাম। অব্যাহত থাকুক তাঁর এই চলা। নীরোগ থেকে ছুঁয়ে যান শতবর্ষ আয়ু।

 

লেখক : পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা