kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বইমেলা, বই লেখা

মোস্তফা মামুন

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বইমেলা, বই লেখা

জাভেদ ভাই ঘরে ঢুকেই বলল, ‘আমার কোনো বই বের হয়নি। বের হবেও না।’

হাসতে হাসতে বললাম, ‘তুমি বই বের করাটাকে অপরাধের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছ মনে হয়।’

জাভেদ ভাইও হাসে। ‘শোনো ইদানীং অবস্থা যা হয়েছে, তাতে বই বের না হওয়া মানে যেন একরকম পিছিয়ে যাওয়া। যার সঙ্গে দেখা হচ্ছে, সে-ই বলে, আমার একটা বই বের হয়েছে। অমুক প্রকাশনী। অত নম্বর স্টল। ফেসবুকেও দেখি, প্রায় সবার বই। বইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ দিয়ে প্রচারণা।’

‘সেটা কি খুব দোষের কিছু? লেখা থাকলে বই বের হবে। বই বের হলে প্রচারণা চলবে।’

‘আমি তো দোষের কিছু বলছি না। বলছি, বরং আমি যে বই বের করিনি সেটাই একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কে জানে, কয়েক বছর পর হয়তো যাঁদের বই বের হয়নি, তাঁদেরই সাক্ষাৎকার বের হবে। এই যেমন, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন কেনার সময় দেখোনি, যে কয়জন নেতা মনোনয়ন কেনেননি, তাঁদেরই সাক্ষাৎকার বেরিয়েছে। কেন তিনি মনোনয়ন কিনলেন না? এবং তাঁদের ত্যাগী দলপ্রেমী হিসেবে একরকম স্বীকৃতি দিয়েছে মিডিয়া।’

একটু ভেবে বললাম, ‘আমাদের যাঁদের বেশি বই বের হয়, তাঁদের আবার অন্য সমস্যা। আমার বই বেরিয়েছে পাঁচটা, শুনলে কেউ কেউ এমনভাবে তাকায় যেন বিরাট অপরাধ হয়ে গেছে। তুমিও কি তাই মনে করো নাকি?’

‘না, তা মনে করি না। সমস্যাটা আসলে অন্য জায়গায়। সারা বছর বই বের হয় না বলে একসঙ্গে যখন আটটা-দশটা বই বের হয় তখন চোখে লাগে। মানুষ তো আর অত কিছু ভাবে না, সে ভাবে এক মেলায় পাঁচ-ছয়টা বই কিভাবে সম্ভব! কিন্তু অনেকেই খেয়াল করে না, এটা তো আসলে গত এক বছরের লেখালেখি। কাজেই এটা আমার কাছে দোষের কিছু নয়। সত্যি বললে আমার কাছে কোনোটাই দোষের নয়। বই বের না হওয়া, বেশি বই বের হওয়া কোনোটাই না।’

সমস্যা মনে করছে না, এটা একটা ভালো ব্যাপার। বইমেলা নিয়ে সবাই দেখি খালি সমস্যা বের করে, আর সমালোচনার অস্ত্র তাক করে।

কথা ঘুরিয়ে জানতে চাই, ‘এই যে এখন একটা সাধারণ ধারণা—বই না পড়ার কারণে তরুণ প্রজন্ম বিগড়ে যাচ্ছে, মা-বাবা তাদের বইমুখী করার চেষ্টা করছেন—এ বিষয়টার সঙ্গে তুমি একমত?’

‘একমত, তবে বিষয়টা খুব সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়। ধরো, আমাদের সময় আমাদের মা-বাবা গল্পের বই পড়াকে বিরাট অপরাধ মনে করতেন। তাঁদের কাছে স্কুলের পাঠ্যই ছিল একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘আউট বই’ পড়া ছিল অপরাধ। আমরা এখন সেটা মনে করছি না, কারণ গল্প-উপন্যাস বা বাইরের বই আমাদের বোধের বিকাশে সহায়তা করেছে। কাজেই আমরা দেখছি আমাদের চিন্তা দিয়ে; কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই প্রজন্মের মনোজগৎ আলাদা হতে বাধ্য। তা শুধু বইয়ের মাধ্যমেই আমাদের মতো করে ফেলা যাবে বলে আমার মনে হয় না। আমার তো মাঝেমধ্যে মনে হয়, আজ থেকে ২০-২৫ বছর পর একটা অদ্ভুত বিষয় আমরা দেখতে পাব। হয়তো দেখা যাবে তখন নতুন কোনো প্রযুক্তি চলে এসেছে, বাচ্চাকাচ্চারা সেটা নিয়েই মেতে আছে। তখন মা-বাবারা আফসোস করে বলবেন, ‘ইস, ছেলে-মেয়েদের ফেসবুকের দিকে একেবারে মনোযোগ নেই।’ ফেসবুকে ওদের বসানোর জন্য জোর চেষ্টা চলবে। কারণ তাদের মা-বাবারা তো ফেসবুকিং করেই বড় হয়েছে।

জাভেদ ভাই দীর্ঘ বাণী দিয়ে থামে। বক্তব্যটার মধ্যে চিন্তার একটা উপাদান আছে। সবাই আসলে নিজের সময় আর চিন্তাটাকেই সঠিক বলে মনে করে। তবে যদি এ রকম দিন আসে যে বাচ্চারা ফেসবুক করতে চাচ্ছে না এবং তাদের জোর করে কম্পিউটারে বসাতে হচ্ছে, তাহলে একটা দেখার বিষয়ই হবে।

হাসতে হাসতে বললাম, ‘তুমি বই এবং বইমেলা বিষয়ে খুব আগ্রহী নয় বোঝা যাচ্ছে। এ জন্যই বই লিখছ না?’

‘না, আমি বই লিখছি না। কারণ বই বের হওয়া মানে সর্বোচ্চ বোধ মানুষের সামনে প্রকাশিত হয়ে যাওয়া। আমার কাছে লেখালেখি এলে এক ধরনের নির্লজ্জতা। বই লেখা মানেই সবাই জেনে গেল তোমার দৌড় কতদূর। এর থেকে দূরে দাঁড়িয়ে জ্ঞান দেওয়া অনেক সহজ।’

‘তুমি কি তাহলে জ্ঞান দেওয়ার জন্যই...’

‘না। আরেকটা কারণ আছে। আমি পড়তে ভালোবাসি। জানতে ভালোবাসি। পড়া এবং জানার যে আনন্দ—এর তুলনা অন্য কিছুতে পাই না বলে এতেই থাকতে চাই।’

কথাটা শুনে খুশি হলাম। সত্যি বললে, আজকাল পড়া আর জানার মধ্যে কেউ থাকতে চায় না। জানার চেয়ে জানানো, অন্যকে চেনার বদলে নিজেকে চেনানোর দিকেই মনোযোগী সবাই।

কয়েক দিন আগে আলাপ হচ্ছিল আমার সদ্য অবসরে যাওয়া এক স্যারের সঙ্গে। জানতে চাইলাম, ‘স্যার কী করছেন এখন?’

‘বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চা।’

‘অশুদ্ধ জ্ঞানচর্চাও আছে নাকি স্যার?’

‘আছে। এই তোমরা যা করছ।’

‘আমরা কী করছি?’

‘তোমরা জ্ঞানচর্চা করছ নিজের লেখাকে সমৃদ্ধ করার জন্য। লেখায় রেফারেন্স ব্যবহারের জন্য। আমি তা করছি না। আমি জ্ঞানচর্চা করছি জ্ঞানলাভের জন্য। নিজেকে আলোকিত করার জন্য। অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই বলে আমার জ্ঞানচর্চা হচ্ছে বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চা।’

যুক্তিটা মানলাম কি না সেটা বিষয় নয়; কিন্তু অবাক হলাম এই ভেবে যে একটা জিনিসকে কতভাবে দেখা যায়। জ্ঞানচর্চাও অশুদ্ধ হতে পারে!

বইমেলা বা বই—এ রকম জ্ঞানচর্চারই জায়গা। সেই চর্চায় ভুল থাকবে, ভুল আবার চর্চায়ই শুদ্ধ হবে, এভাবেই এগিয়ে চলা।

চিন্তা-চর্চা-জ্ঞান—এগুলো একটু ভারী বিষয়। বইমেলা বা বইও তাই অনেকের কাছে ভারী মনে হয়। হালকা করার একটু চেষ্টা করা যেতে পারে।

অচলপত্র পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন দীপেন্দ্র কুমার সান্যাল। হাসির পত্রিকা, যাতে একবার পাঠকদের জানানো হলো, ‘এই পত্রিকা যতটা কম ছাপা হয় বলে আপনারা মনে করেন ততটা কম আসলে ছাপা হয় না। সত্যি বললে ছাপা হয় এর চেয়েও অনেক কম।’ তো পত্রিকার সম্পাদক একবার নিজে একটা বই লিখলেন, লিখে বিজ্ঞাপন দিলেন, ‘শুরুতেই পঞ্চম সংস্করণ। এরপর আস্তে আস্তে চতুর্থ, তৃতীয়, দ্বিতীয়, প্রথম সংস্করণ বেরোবে।’ ব্যাপারটা কৌতুক, তবে আমাদের এখানে কৌতুকটা ঠিক এ রকম হয় না। পঞ্চম সংস্করণ দিয়ে শুরু হয়ে পরে ষষ্ঠ-সপ্তম এই নিয়মেই চলে।

জনপ্রিয় ঘরানার লেখকরা চটে যেতে পারেন। তাঁদের বলি, এটা একটা কৌতুক। লেখকরা শুধু লিখেই যাবেন, তা তো হয় না, কিছুটা তো সইতেও হবে। রাজনীতিকরা যেমন সারা জীবন সয়ে যান। বইমেলার হাত থেকেও তাঁদের পরিত্রাণ নেই।

রাজনীতিক মেলায় নিজের আত্মজীবনী লিখেছেন। এক মুগ্ধ পাঠক পড়ে বললেন, ‘দারুণ হয়েছে। অসাধারণ।’

রাজনীতিক বিগলিত, ‘ধন্যবাদ।’

‘আরো কয়েকটা আত্মজীবনী লিখুন না। আপনি যা সুন্দর গল্প বানাতে পারেন।’

এরপর সেই রাজনীতিক কী বলেছিলেন জানা নেই। তবে খুব সম্ভব আর কোনো দিন বই লেখার বা বইমেলায় আসার ঝুঁকি নেননি।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা