kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৪ অক্টোবর ২০১৯। ৮ কাতির্ক ১৪২৬। ২৪ সফর ১৪৪১       

‘বসন্ত এসে গেছে’

ড. শফিক আশরাফ

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘বসন্ত এসে গেছে’

বাঙালি জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ঋতুচক্র। এই ঋতুর সঙ্গেই মিলেমিশে আছে বিভিন্ন পালা-পার্বণসহ অনেক উৎসব অনুষ্ঠান। শীত মানে হিম ঠাণ্ডার সঙ্গে সঙ্গে নতুন খেজুর গুড়ের পিঠাপুলি। সুদূর অতীতকাল থেকে এ দেশের গ্রামগঞ্জে পিঠাপুলি খাওয়ানোর জন্য জামাইদের দাওয়াত দেওয়ার প্রথা চলে আসছে। এরপর শীতের প্রকোপ কমতে থাকে আর পাতাঝরা গাছগুলোতে দেখা দেয় নতুন কচি আভা। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন শীতের বিদায়বার্তায়! আর প্রকৃতি নবরূপে সজ্জিত হয়ে নিজেকে প্রকাশ করতে থাকে। পাখিদের কলকাকলি, ভ্রমরের গুনগুন, আমের বোলের মৌতান, সব মিলিয়ে আমাদের চারদিকটা যেন একটা হৈহৈ আনন্দ-উৎসবের ভেতর প্রবেশ করে। বসন্তের বার্তা যেমন প্রকৃতি তার ফুলে-ফলে রঙিন করে তুলে ধরে, তেমনি এই প্রকৃতির অংশ মানুষ তার শত কর্মব্যস্ততাও টের পায় তার চারপাশের উৎসবের আনন্দবার্তা।

বসন্ত নিয়ে অনেক পৌরাণিক গল্প প্রচলিত। বৈদিক বিশ্বাসমতে কন্দর্প বা কামদেব হলো বসন্তের প্রতীক। শিবের দেওয়া আগুনে পুড়ে তার নাম হয় অনঙ্গ বা অতনু। অতনুর সৌন্দর্য ছিল দেখার মতো, তার গায়ে ছিল বকুল ফুলের ঘ্রাণ, সে পাঁচ প্রকারের ফুলের তীর বহন করত। আমের বোল, মল্লিকা, নীলপদ্ম, সাদাপদ্ম ও অশোক ছিল তার ফুলের তীর। এসব ফুলই বসন্তে ফোটে। তার স্ত্রী রতির জন্ম আকাঙ্ক্ষা থেকে আর দেবী বসন্ত হলো কামদেবের সঙ্গী। হতাশার দীর্ঘশ্বাস থেকেই দেবী বসন্তের জন্ম।

প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালির বসন্ত উদ্যাপনের রীতির কথা জানা যায়। রাসপূর্ণিমা ও দোল উৎসব বসন্ত উৎসবের সঙ্গে জড়িত। মধ্যযুগে বেশ ঘটা করে দোল উৎসব পালনের কথা জানা যায়, আর ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা হয়। এখানেও পৌরাণিক গল্পের কথা ছড়িয়ে আছে। বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ-রাধিকা ও তাদের গোপী-গোপিনীরা আবির খেলায় মেতে ওঠেন। সেটা ফাল্গুনে আর রং খেলা হয়ে ওঠে বসন্ত উৎসব। বাংলার বাইরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে এটা পরিচিত ছিল হোলি উৎসব হিসেবে। এখনো এই তিথিতে ভারতে হোলি ও দোল উৎসবে মেতে ওঠে বাঙালি-অবাঙালিরা। অনেক আগে থেকেই বসন্তবরণ ও দোলযাত্রা উপলক্ষে গ্রামগঞ্জে মেলা বসত। বসন্তে রাসমেলার প্রচলন হয় মধ্যযুগে। এ ছাড়া বাংলার প্রান্তমানুষের লোকদেবী ছিল বসন্ত, যে কিনা প্রাণঘাতী রোগ নিয়ে গ্রামে প্রবেশ করত। এই রোগ থেকে বাঁচার আশায় তারা বসন্ত দেবীর পূজা করত। বসন্ত দেবীর অন্য নাম ছিল শীতলা। এ ছাড়া বৌদ্ধদের ফাল্গুনী পূর্ণিমা উৎসব ছিল মূলত বসন্তবরণের অনুষ্ঠান। সম্রাট আকবর যে ১৪টি উৎসব পালনের রীতি প্রচলন করেন, তার মধ্যে অন্যতম ছিল পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উদ্যাপন উৎসব।

আমাদের সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে বারুণীর জলে রোহিণীর ডুবে মরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং গোবিন্দলালের সঙ্গে রোহিণীর প্রণয়কে প্রকাশ করতে গিয়ে দীর্ঘ বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন। আর সেই সময়টায় কোকিলের কুহুতানের অনুষঙ্গ প্রকৃতি এবং মনে বসন্তের আগমনবার্তার ইঙ্গিত দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শান্তিনিকেতনে বসন্তবরণ উৎসব শুরু করেন। সেটা ছিল ব্রিটিশ আমলে বৈদেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্বদেশকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখায় বসন্ত নিয়ে মাতামাতি করে উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছেন সবচেয়ে বেশি। এখনো কোনো বাঙালি বেশি পরিমাণে আনন্দিত অবস্থায় থাকলে তার ওপর বসন্ত ভর করে! গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের গান—‘আহা আজি এ বসন্তে, এতো ফুল ফুটে, এতো পাখি গায়...’, রবীন্দ্রনাথ অবসন্তেও বসন্ত ছড়ানোর ক্ষমতা নিয়ে মর্তমান হয়েছিলেন। শুধু আনন্দ কেন! শোকেও কবিরা বসন্তকে স্মরণ করেন। যেমন কবি সুফিয়া কামাল তাঁর প্রয়াত স্বামীর স্মৃতি মনে করে লিখেছেন—তিনি পরপারে বসেও বসন্তের আগমনবার্তা শুনতে পায় কি না সে বিষয়ে। এ সময়কার কবি-সাহিত্যিক গীতিকাররা ফাল্গুনের ছোঁয়ায় আবেগ-উচ্ছ্বাসে উল্লসিত। প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাসকারী বাউলরাও এই বসন্তের রূপে মাতোয়ারা হয়ে গান বেঁধেছেন। যেমন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম বসন্তের রূপে মোহিত হয়ে গেয়েছেন—‘বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে/বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে সই গো বসন্ত বাতাসে/বন্ধুর বাড়ির ফুল বাগানে নানা বর্ণের ফুল...’ ইত্যাদি। যেহেতু কবি-সাহিত্যিকরা খুব বেশি পরিমাণে অনুভূতিপ্রবণ, সেহেতু বসন্তের আগমনবার্তা তাঁরাই আগে টের পান। আবার এ প্রজন্মের তরুণপ্রিয় পশ্চিমবঙ্গের কণ্ঠশিল্পী অনুপম সময়ের বাস্তবতা ও অস্থিরতাকে কণ্ঠে নিয়ে গেয়ে ওঠেন—‘একরাশ বিপদের মাঝখানে শুয়ে আছি, কানাঘুষা শোনা যায়/বসন্ত এসে গেছে।’ অদ্ভুত! বিপদের মধ্যে শুয়েও বসন্তের আগমনবার্তা টের পায় এ সমেয়র তরুণরা! এই গান শুনে মনে হয় এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণী সারা বছরই বসন্তের ভেতর বসবাস করে! কিংবা বাংলাদেশের নাম না জানা কোনো গীতিকারের লেখা এই গানটি—‘নারী হয় লজ্জাতে লাল, ফাল্গুনে লাল শিমুলবন/এ কোন রঙে রঙিন হইল বাউল মন, মনরে’ বাঙালি মনে তুমুলভাবে বসন্ত ছড়িয়ে দেয়। কবি-সাহিত্যিক-গীতিকার-সুরকারদের এই ভাবের প্রাবল্যই হয়তো ধীরে ধীরে বসন্ত উৎসব একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছে।

পাকিস্তান আমলে ধর্মের আবরণে আমাদের সংস্কৃতিতে বিজাতীয় আগ্রাসন চালালে বাঙালি রুখে দাঁড়িয়েছিল তার আত্মপরিচয় নিয়ে। ধর্ম পরিচয়ের বাইরে বাঙালি হিসেবে ভাষিক ও জাতিক পরিচয়কে তুলে ধরতে গিয়ে বেশি করে রবীন্দ্রনাথকে আঁকড়ে ধরেছিল, চালু করেছিল রমনার বটমূলে পহেলা বৈশাখ উৎসব। বাঙালির বিস্ফোরণোন্মুখ এই আত্মজাগরণে পাকিস্তানিরা কুঁকড়ে গিয়েছিল। বাঙালির আত্মজাগরণের এই ধারাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে বর্তমান সরকার রাষ্ট্রীয় উৎসবে রূপান্তর করেছে। বৈশাখী উৎসব পালন উপলক্ষে প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারীকে উৎসব ভাতা প্রদান করছে।

এখন পহেলা ফাল্গুন রমনার বটমূলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বসন্তবরণ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনে  তরুণ-তরুণীরা মাতোয়ারা থাকে, বিশেষ করে তরুণীর খোঁপায় থাকে ফুল! এ সময় রং ও ফুলের ছড়াছড়ি থাকে প্রকৃতিতে। বিশেষ করে শিমুল-পলাশের লাল-হলুদ রং ছুঁয়ে যায় মানুষের মনে। এ উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের বিকিকিনিও অনেকটা বাড়ে। দেশের বিভিন্ন ব্যান্ডশপ ফাল্গুন উপলক্ষে নতুন নতুন ডিজাইনের পোশাক-আশাক প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা করে। কিছুদিন আগেও এটা লক্ষণীয় কোনো ব্যাপার ছিল না! মানুষের চাহিদা বুঝে যদিও ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতা করেন, তবু তাঁদের এই প্রদর্শন ও প্রতিযোগিতা ফাল্গুনে নতুন রং যোগ করেছে। বাংলার একটি বিশেষ ঋতুকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করার রীতিতে বসন্ত শুধু আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে, জাতি হিসেবে এটা বাঙালির সুখী, প্রাণবন্ত ও সহজ মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। আমরা ভোটের মিছিলে স্লোগানে যেমন আনন্দ ও বিনোদন খুঁজি, তেমনি প্রকৃতির পরিবর্তনেও বিনোদনমুখর হয়ে উঠি। আর এখানেই লুকিয়ে আছে তার সুখী মানসিকতার রহস্য। কাজেই পহেলা ফাল্গুনের এই বসন্তবরণ উৎসব অচিরেই আরো বেশি পরিমাণে ছড়িয়ে পড়বে প্রাণ থেকে প্রান্তরে এবং বিনোদনপ্রিয় বাঙালির অন্যতম উৎসবে পরিণত হবে ফাল্গুন।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা