kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

কালান্তরের কড়চা

বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতাদের অবসরগ্রহণ প্রসঙ্গে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বাংলাদেশে রাজনৈতিক নেতাদের অবসরগ্রহণ প্রসঙ্গে

রাজনীতি থেকে অবসরগ্রহণের কোনো বয়সসীমা আছে কি? মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, এ ব্যাপারে কোনো সাধারণ নিয়ম নেই, কোন নেতা কোন বয়সে রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন—এটা তাঁর  Mental agility বা মানসিক শক্তির ওপর নির্ভর করে। মালয়েশিয়ার  মাহাথির মোহাম্মদ ৯০ বছর বয়সেও এই মেন্টাল এজিলিটির জোরে অবসরজীবন থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসতে পেরেছেন। আর ব্রিটেনের চার্চিলের মতো বিশ্বের একজন বিখ্যাত রাজনীতিবিদকে আশির ঊর্ধ্ব বয়সেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিতে বাধ্য হতে হয়েছিল।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চার্চিল একটি বিশ্বাস হন্তার কাজ করেছিলেন। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন মিত্রশক্তির একটি পক্ষ। ব্রিটেন, আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিয়ে এই মিত্রশক্তি গঠিত। হিটলারের জার্মানির বিরুদ্ধে তখন তাদের লড়াই চলছে। যুদ্ধের শেষ পর্যায়। বার্লিন দখলের জন্য একদিকে ব্রিটিশ ও মার্কিন সেনা, অন্যদিকে সোভিয়েত লাল ফৌজ এগিয়ে যাচ্ছে।

চার্চিলের মতো ঝুনা সাম্রাজ্যবাদী নেতা কমিউনিজম ও কমিউনিস্ট রাশিয়াকে ঘৃণা করতেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানিকে হারানোর জন্য বাধ্য হয়ে রাশিয়ার সঙ্গে মিত্রতা করেছিলেন। কিন্তু হিটলারের পতনের পর রাশিয়া শক্তিশালী হয়ে উঠুক—এটা তিনি চাননি। ফলে বার্লিন দখলের জন্য যখন যুদ্ধ চলছে তখন তিনি গোপনে যুদ্ধরত ব্রিটিশ সেনাপতিকে নির্দেশ দেন, তারা যেন রাশিয়ার সেনাদের হাতে জার্মান সেনাদের হারতে না দেন। বরং জার্মান সেনাদের হাতে অস্ত্র না থাকলে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেন।

এই তথ্য বহুকাল গোপন ছিল। রাশিয়াও জানত না চার্চিল তাদের সঙ্গে বার্লিন দখলের যুদ্ধের শেষভাগে বিশ্বাস হন্তার কাজ করতে চেয়েছিলেন। এই তথ্য কারো জানার উপায় ছিল না। অশীতিপর চার্চিল যখন যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেনের শেষবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তখন এক অসতর্ক মুহূর্তে প্রকাশ করে ফেলেন তখনকার মিত্র রাশিয়ার বার্লিন দখল ঠেকানোর জন্য তিনি গোপনে জার্মান সেনাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সেনাপতিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখনো রাশিয়ার সঙ্গে ব্রিটেন ও আমেরিকার মিত্রতা সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন হয়নি। ফলে এই খবর ফাঁস হওয়ায় ব্রিটিশ ও মার্কিন দুই সরকারই বিব্রত হয়।

ব্রিটেনে তখনকার ক্ষমতাসীন টোরি পার্টি বুঝতে পারে তাদের বয়োবৃদ্ধ প্রধানমন্ত্রী বয়সাধিক্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন। তারা তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দেয়। চার্চিল রাজনীতি থেকেই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। টোরি পার্টির নেতার পদ থেকে তিনি সরে দাঁড়ালে তাঁর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ইডেন টোরি গভর্নমেন্টের নয়া প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

স্যার উইনস্টন চার্চিল খুবই দূরদর্শী নেতা ছিলেন। তাই আশির ঊর্ধ্ব বয়সে মেন্টাল এজিলিটি হারিয়ে তিনি যে আর একটি দেশের প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব বহনের উপযুক্ত নন, এটা বুঝতে পেরেছিলেন এবং দেশের স্বার্থে নিজেই সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। মনস্তাত্ত্বিকদের অনেকে বলেন, মেন্টাল এজিলিটি হারানো বয়সের ওপর নির্ভর করে না। অনেকে ৮০ থেকে ৯০ বছর বয়সের নিচেও মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারেন। এটা ঘটছে বুঝতে পারলে সংশ্লিষ্ট নেতারই সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত। অন্যথায় তাঁর দলেরই উচিত নেতা পরিবর্তন করা—যেমন ব্রিটেনে টোরি পার্টি করেছিল।

ফ্রান্সের সেভিয়ার নামে পরিচিত দ্য গলে যখন বুঝতে পেরেছিলেন জনগণ তাঁকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না, তিনি তখনই গণভোট অনুষ্ঠান করে স্বেচ্ছায় প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়েছেন, এমনকি সক্রিয় রাজনীতি থেকেও অবসর নেন। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলাও আজীবন প্রেসিডেন্ট থাকতে পারতেন। তিনিও নিজের বয়স বিবেচনা করে স্বেচ্ছায় সরকার ও দলের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।

কিন্তু এশিয়া-আফ্রিকার বহু দেশেই বহু রাজনৈতিক নেতা প্রথমে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় বসলেও পরে তা আর ছাড়তে চাননি। আমৃত্যু দলের নেতৃত্বও আঁকড়ে থেকেছেন। কেউ কেউ স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হয়েছেন। কখনো দেশের রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চাননি। পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খান তো নিজেকে আজীবন প্রেসিডেন্ট পদে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। গণ-অভ্যুত্থানে তাঁকে প্রেসিডেন্ট পদ ও দলীয় নেতৃত্ব ছাড়তে হয়।

নিজের দেশের কথায় আসি। এখানেও দেখা যায় বেশির ভাগ রাজনৈতিক নেতাই যথাসময়ে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান না এবং নেন না। বয়সের দরুন মেন্টাল এজিলিটি না থাকলেও তাঁরা নেতৃত্ব ছাড়তে চান না। অবসর নিতে জানেন না। তাঁদের মধ্যে যাঁদের মানসিক ভারসাম্য আছে, তাঁরা না হয় রাজনীতিতে রইলেন; কিন্তু যাঁদের নেই, তাঁরাও রাজনীতি ও নেতৃত্ব ছাড়েন না। তখন দেশে নতুন নেতৃত্ব গড়ে ওঠার পথ পায় না। গণতান্ত্রিক রাজনীতির গতি রুদ্ধ হয়ে যায়।

ন্যাপ (মোজাফফর) নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। দেশের সবচেয়ে বর্ষীয়ান ও সম্মানিত নেতা এবং কিংবদন্তিতুল্য মানুষ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে রোগশয্যায়। কিন্তু দলটির সভাপতির পদে নতুন কেউ এসেছেন কি না আমি জানি না। দেশের দ্বিতীয় বর্ষীয়ান সামরিক ও রাজনৈতিক নেতা এখন জেনারেল এইচ এম এরশাদ। এককালে চতুর সামরিক নেতা ছিলেন। এখন জাতীয় পার্টি নামের রাজনৈতিক দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও বয়সাধিক্যে তিনি মেন্টাল এজিলিটি হারিয়েছেন বলে অনেকে মনে করে। এখন তিনি রোগাক্রান্তও। বারবার হাসপাতালে যেতে হয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির নিয়ম অনুযায়ী তাঁর দলীয় নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত। রাজনীতি থেকেও অবসর নেওয়া উচিত। তাঁর মেন্টাল এজিলিটি যে আর নেই তার প্রমাণ তিনি সকালে এক কথা বলেন, তো বিকেলে বলেন আরেক কথা। তাঁর দলেরও একই অবস্থা। সরকারেও আছে, বিরোধী দল হিসেবেও আছে।

তিনি এই বয়সে দলের নেতৃত্ব তো ছাড়েননি, বরং তাঁর রাজনৈতিক দলকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করে উইল করে তাঁর মৃত্যুর পর কে দলনেতা হবেন, তা ঠিক করে গেছেন। উইল অনুসারে এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর পর দলনেতা হবেন তাঁর ছোট ভাই। নেতা কর্তৃক উইল করে তাঁর ভাই বা সন্তানকে পরবর্তী দলনেতা করে যাওয়ার ঘটনা একটি বিরল ব্যাপার। এটা রাজা-বাদশাহরা করেন। যেমন মধ্যপ্রাচ্যের রাজারা তাঁদের কোনো ভাই বা সন্তানকে নিজে বেঁচে থাকতে যুবরাজ বা ক্রাউন প্রিন্স (যুবরাজ) করেন। রাজার মৃত্যুর পর যুবরাজ হন রাজা। কমিউনিস্ট শাসন পদ্ধতিতেও উত্তরাধিকারী ঠিক করে যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা মোটেই নেই।

গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতাকে দলের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হতে হয়। ভারতে নেহরু তাঁর কন্যা ইন্দিরাকে এবং ইন্দিরা তাঁর পুত্র রাজীবকে পরবর্তী নেতা হিসেবে গ্রুম (groom) করেছেন; কিন্তু তাঁদেরও দলের সদস্যদের দ্বারা ভোটে নির্বাচিত হয়ে নেতা হতে হয়েছে। পিতা বা মাতা উইল করে এই নেতৃত্ব তাঁদের দান করে যেতে পারেননি।

উইল করে দলের নেতৃত্ব ভাই, বোন বা পুত্রকে দান করে যাওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শুধু অচল নয়, হাস্যকরও। এইচ এম এরশাদ কি তাঁর মৃত্যুর পর দলের নেতৃত্বে তাঁর স্ত্রী রওশন এরশাদ বসবেন—এই ভয়ে এই উইল করেছেন? কারণ তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কথা সবারই জানা। দলেও রওশন এরশাদ জনপ্রিয়। এইচ এম এরশাদের কিছু হলে দলে যদি ভোটাভুটি হয়, রওশনই যে জয়ী হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এই ভয়েই কি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এইচ এম এরশাদ দলের নেতৃত্বে তাঁর অবর্তমানে ছোট ভাই জি এম কাদেরকে বসানোর জন্য উইল করে লোক হাসাচ্ছেন? বয়সাধিক্যে মেন্টাল এজিলিটি হারিয়ে তিনি কি এখন লোক হাসানো বহুরূপীতে পরিণত হননি? হিন্দু ধর্মে ৪০ বছর বয়সে বানপ্রস্থে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই নব্বইয়ের কাছাকাছি বয়সে এইচ এম এরশাদের কি রাজনৈতিক বানপ্রস্থে যাওয়ার সময় হয়নি?

আমাদের আরেকজন অশীতিপর (৮২ বছর) রাজনৈতিক নেতা ড. কামাল হোসেন সম্পর্কেও প্রশ্ন—রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার জন্য যে মেন্টাল এজিলিটি থাকা দরকার বলে মনস্তাত্ত্বিকরা বলেন, তা কি এখনো তাঁর আছে? যখন-তখন ক্রুদ্ধ হয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদেরও অসম্মান করা, অ্যাটর্নি জেনারেলকে বাস্টার্ড এবং পুলিশকে জানোয়ার বলা কি মানসিক ভারসাম্যের প্রমাণ দেয়? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শিবিরের একজন নেতা হয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী এবং স্বাধীনতার আদর্শবিরোধী বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে মিতালি করার পর নির্বাচনে পরাজিত হয়ে এখন আবার বলা ‘জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা থাকলে ঐক্যফ্রন্টে থাকব না’—এসব পরস্পরবিরোধী কাজ ও বক্তব্য তাঁর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে কী প্রমাণ করে? তিনিও সময় থাকতে এবং দেশের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক স্বার্থে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন কি?

 

বুধবার, ১৬ জানুয়ারি ২০১৯

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা