kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ব্রেক্সিট : নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশায় ব্যর্থ হওয়ার গল্প

প্যাট্রিক ককবার্ন

১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ব্রেক্সিট : নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাশায় ব্যর্থ হওয়ার গল্প

রানওয়েতে রহস্যজনক ড্রোন দেখা যাওয়ায় বড়দিনের আগে ব্রিটেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানবন্দর গ্যাটউইক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ব্রিটিশ গণমাধ্যম সপ্তাহজুড়ে এ নিয়ে বহু প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে বিমানবন্দরের বেশির ভাগ শেয়ার যখন ফরাসি কম্পানির কাছে বেচে দেওয়া হয় তখন গণমাধ্যমের এত আদিখ্যেতা দেখা যায়নি। এর আগে এই বিমানবন্দরের একটি বড় অংশের শেয়ার ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ কম্পানি গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার পার্টনারের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়ামের হাতে। তারাই ফরাসি গ্রুপ ভিঞ্চি এয়ারপোর্টের কাছে ২৯০ কোটি পাউন্ডে শেয়ারগুলো বেচে দেয়।

এক বিদেশি কম্পানির হাত থেকে আরেক বিদেশি কম্পানির হাতে ব্রিটিশ অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার বেশির ভাগ মালিকানা বেশ অদ্ভুত একটি সময়ে হস্তান্তরিত হলো। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কেন নতুন নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়, সে ব্যাপারে ন্যাশনাল অডিট অফিস একটি প্রতিবেদন হোয়াইট হলে জমা দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর এ ঘটনা ঘটেছে।

ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, ২০১২ সালে সেনাবাহিনী আউটসোর্সিং গ্রুপ ক্যাপিটা বিজনেস সার্ভিসেসের সঙ্গে ৪৯ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের একটি চুক্তি করে। ওই প্রতিষ্ঠানকে সেনা নিয়োগের ব্যাপারে অংশীদার হিসেবে চুক্তিবদ্ধ করা হয়। তবে ওই কম্পানি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় এমন কিছু সংকট তৈরি করে যে বহু লোক আগ্রহী হওয়া সত্ত্বেও তাদের নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে মোট ব্রিটিশ সেনাসংখ্যা ৮২ হাজার ৫০০ হওয়ার কথা থাকলেও তা সাড়ে পাঁচ হাজার কম রয়েছে। এমন একটি সময় এগুলো ঘটছে, যখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ব্রিটেন। প্রশ্ন উঠেছে, এখন দেশ কে চালাচ্ছে? এমন এক সময় এ বিতর্ক চলছে, যখন আগামী ২৯ মার্চ ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত।

ব্রেক্সিটপন্থীদের মতে, ব্রিটিশ সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ রক্ষার সেরা পথ এটি; যদিও রোজকার জীবনের প্রয়োজনীয় বহু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনো বাকি। যে বিদেশি কম্পানিগুলো ব্রিটেনে কাজ করছে, তাদের ওপর ব্রেক্সিটের পর কী করে করারোপ করা হবে সে সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। জনমত জরিপে দেখা গেছে, মানুষ অত্যাবশ্যকীয় সেবা খাতগুলোর বেসরকারীকরণের বিরোধী। তবে সরকারের শিথিল নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে ফার্মেসি, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ—সবই বিদেশি বিনিয়োগকারী বা করপোরেশনের হাতে তুলে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া মানুষ বাধ্য হয়েই মেনে নিচ্ছে। ব্রেক্সিটপ্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে, যে স্লোগান সামনে নিয়ে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে : ‘নিয়ন্ত্রণ ফেরত পাওয়া সম্ভব’—সে লক্ষ্য অর্জনে বাস্তবভিত্তিক কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আলোচনায় ব্রাসেলস এবং কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা-অসুবিধার দিকে মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে ব্রিটেনকে কে নেতৃত্ব দিচ্ছে, সে বিষয়ে অধিক মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন ছিল।

ব্রেক্সিটবিরোধীরা পুরো বিষয়টিকে দেখছে অর্থনীতি ও অভিবাসনের ইস্যু হিসেবে। তারা বড় ধরনের ভুল করছে। জাতিরাষ্ট্র বা এর ইতিহাসের বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে না। ব্রেক্সিটপন্থী রাজনীতিবিদদের ক্ষোভের প্রধান কারণ, তাঁদের আয়ারল্যান্ড ইস্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ব্রেক্সিট বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দিতে চায় যে এই দর-কষাকষিতে ব্রিটেনের পাল্লা বরাবরই হালকা থাকবে। ভারসাম্য তাদের দিকে হেলে থাকবে না। এই আলোচনা উন্নয়নের জন্য হচ্ছে না এবং না হওয়ার স্পষ্ট কোনো কারণও উল্লেখ করা হচ্ছে না।

ব্রিটেনের কোনো রাজনৈতিক দলকেই এ প্রশ্ন করা হচ্ছে না যে বিশ্বায়নের এই যুগে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের কী ভাবনা রয়েছে। এর পরিবর্তে ব্রাসেলস ও ইইউ সবার হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লেবার বা কনজারভেটিভ দল তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও কোনো তথ্য কাউকে দিচ্ছে না, বরং তারা বারবারই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে ভবিষ্যতে তারা জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেনের অবস্থান সংহত রাখার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেটি কী করে হতে পারে, সে ব্যাপারে কেউ কোনো পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি।

জাতীয়তাবাদ নিয়ে লেবারের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। একে তারা ভিন্ন রূপের বর্ণবাদ বলেই মনে করে। বিষয়টিকে তারা বর্ণনা করে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার হিসেবে। কনজারভেটিভদের কাছে বিষয়টি আরো ভয়াবহ। কারণ বিশ্বে ব্রিটেনের অবস্থান সম্পর্কে কল্পকাহিনি ছড়ানো ছাড়া তাদের আর কোনো পরিকল্পনা নেই।

এটি স্পষ্ট যে ব্রেক্সিটের বিস্ফোরক প্রভাব থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতেই এসব কথাবার্তা চলছে। বাস্তবতা হচ্ছে, দেশ আরো দুর্বল ও দরিদ্র হবে। একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ মনে হচ্ছে।

 

লেখক : আইরিশ সাংবাদিক, ফিন্যানশিয়াল টাইমসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রতিবেদক

সূত্র : কাউন্টার পাঞ্চ অনলাইন

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা