kalerkantho

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন

ড. এ টি এম আতিকুর রহমান

১২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন

সাধারণত মানুষের জন্মগ্রহণের তারিখ জন্মদিন বা জন্মদিবস হিসেবে বিবেচিত হয়। মানুষের আবেগ-অনুভূতির আশ্রয়ে কালক্রমে এ দিবস উৎসবে পরিণত হয়। উত্তর-আধুনিক যুগে এ দিবস ব্যক্তির জন্ম তারিখে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এ যুগে অনেক প্রতিষ্ঠানেরও জন্মদিন পালিত হয়। প্রতিষ্ঠান চালুর তারিখকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টজনরা নানা আয়োজনে পালন করে থাকেন জন্মদিবস। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। আজ ১২ জানুয়ারি ২০১৯ সাল এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮তম জন্মদিন। কর্তৃপক্ষ, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলেমিশে আনন্দঘন উৎসবের মধ্য দিয়ে পালন করবেন এই দিন—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস।

আমরা জানি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সমান বয়সী। দেশের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। এর নাম থেকেই বোঝা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ করে এ প্রতিষ্ঠান তৈরির পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল। সম্ভবত এ জন্যই একসময়ের ঢাকার নামে এর নামকরণ হয়। আমাদের জানা আছে রাজধানী ঢাকার অপর নাম ছিল জাহাঙ্গীরনগর। ১৬১০ সালে মোগলদের কাছে ইতিহাসখ্যাত স্বাধীনচেতা বারো ভুঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ ডাকচরার যুদ্ধে পরাজিত হলে মোগল সেনাপতি ইসলাম খান ঢাকায় প্রবেশ করেছিলেন এবং ঢাকাকে মোগলবাংলার রাজধানী করে সম্রাটের নামানুসারে এর নাম দিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর। আর এ নামেই ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই পূর্ব বাংলার মানুষের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়। ভারত বিভক্তির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চরিত্র বদলে দেওয়া হয়। অল্প সময়ের মধ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় সাড়ে তিন হাজারে। ১৯৫৪ সালে রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব বাংলার দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ময়মনসিংহে গড়ে ওঠে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকায় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। অল্পকালের ব্যবধানে পূর্ব বাংলার তৃতীয় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনোটিরই আবাসিক চরিত্র ছিল না।

১৯৬৪ সালে সরকার একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব অনুধাবন করে। পরে সরকারের শিক্ষা বিভাগ থেকে এসংক্রান্ত একটি খসড়া পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। ১৯৬৫ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের কার্যকরী সংসদ পরিকল্পনাটি অনুমোদন করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার কাছাকাছি স্থানে নতুন আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। ১৯৬৭ সালে ঢাকা থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে সাভার এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন স্থান নির্বাচন করা হয়।

সাভারে ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। তবে যথাযথভাবে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরুর আগেই ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ফলে যুদ্ধকালে বিশ্ববিদ্যালয় চালু ছিল নামে মাত্র। প্রকৃত অর্থে এর যাত্রা শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। তাই যাত্রালগ্নেই সংকট ছিল সীমাহীন। মুক্তিযুদ্ধোত্তরকালের বহুমাত্রিক আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতার টানাপড়েন মোকাবেলা করেই এ প্রতিষ্ঠানকে সামনে এগোতে হয়েছে। তবে এর নয়নাভিরাম নিসর্গ ও বিচিত্র মনভোলানো ভূমিরূপ, সমতল-ঢালু-তরঙ্গায়িত এলাকার সমাহার, বাইদ, নালা আর এগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তৈরি কৃত্রিম কিন্তু দৃষ্টিনন্দন হ্রদ-জলাধার, জলাভূমি ঘেঁষে নানা প্রজাতির গাছ-গাছালির বনাঞ্চল এমন এক বাতাবরণ তৈরি করে, যার মোহনীয় প্রভাবে এখানে মিলিত হন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী ও প্রতিভাবান শিক্ষক। এর প্রকৃতি শুধু মানুষ নয়, পাখিদেরও আকর্ষণ করে। প্রতিবছর ক্যাম্পাসের জলাধারগুলোয় সুদূর সাইবেরিয়া থেকেও পাখি আসে। নিরাপদ আবাসস্থল ও খাদ্যের সংস্থান থাকায় শুরু থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাধারগুলোকে দেশি-বিদেশি পাখিরা অভয়ারণ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। ফল হিসেবে শুরু থেকেই অনন্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে যাত্রা করে এ বিশ্ববিদ্যালয়। এর বিশিষ্টতা বিনির্মাণে নবীন শিক্ষকদের যেমন ভূমিকা ছিল, তেমনি ছিল বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান প্রবীণ শিক্ষকের। এসব শিক্ষক ছিলেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে খ্যাতিমান। অনেক ক্ষেত্রেই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁরা নিজেদের তারুণ্য-যৌবন ও পরিণত বয়সের শিক্ষা-অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত রক্তস্নাত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থির ও নাজুক সময়ে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শিক্ষার্থীদের দরদি মনোভাব। বস্তুত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভালোবাসায়, তাদের মিলিত শ্রমে-ঘামে, পাণ্ডিত্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি অতি দ্রুত হয়ে ওঠে বাংলাদেশের উচ্চতর শিক্ষা-গবেষণা, জ্ঞান-সাধনা ও বিতরণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। শুধু তা-ই নয় তাদের মিলিত কর্ম-প্রয়াসে শুরু থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে উদার, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক এমন এক ধারা তৈরি হয়, যার প্রগতিবাদী প্রবাহ আজও বহমান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য বিশিষ্টতা এই যে এ প্রতিষ্ঠান সদা সৃষ্টিশীল। সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে শিক্ষা-গবেষণার ক্ষেত্রেও যে নতুন ও সৃষ্টিশীল আয়োজনের বিকল্প নেই, এ সত্য অনুধাবন করেছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যথার্থভাবেই। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধের পরপরই পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়েছিল কলা ও মানবিক, গাণিতিক ও পদার্থবিষয়ক এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদ। পরে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী এক দশকের মধ্যেই চালু হয় জীববিজ্ঞান অনুষদ। এখানেই বিশ্ববিদ্যালয় থেমে থাকেনি। পর্যায়ক্রমে এ বিশ্ববিদ্যালয় চালু করে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ, আইন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য অনুষদসহ বিভিন্ন একাডেমিক শাখা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের অধীনে বাংলাদেশের অপরাপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে স্বতন্ত্র, ব্যতিক্রমধর্মী ও যুগোপযোগী পাঠদানের বিষয়বস্তু সংবলিত বেশ কয়েকটি বিভাগ এ বিশ্ববিদ্যালয় চালু করেছে; যেগুলো শুধু এ বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুই করেনি, একই সঙ্গে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে করেছে অনন্য মর্যাদায় সমাসীন। শিক্ষা ও গবেষণায় এ বিশ্ববিদ্যালয় সূচনাকাল থেকেই এগিয়ে। এখানে জ্ঞান সাধনা ও গবেষণার যে ধারা তৈরি হয়েছে, তা প্রকৃত অর্থেই গৌরবজনক। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগে যেভাবে নিয়মিত গবেষণা জার্নাল প্রকাশিত হয়, তা বাংলাদেশের অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশিত হয় না। উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রির ক্ষেত্রেও তা সমভাবে প্রযোজ্য। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সুবিধা খুবই অপ্রতুল।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা-গবেষণা ও সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত করার জন্য প্রথম পর্যায়ে যেসব শিক্ষক যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা সবাই ছিলেন তৎপর। এ জন্যই অনেক পরে আত্মপ্রকাশ করেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চতর গবেষণা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে অনেক এগিয়ে। প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চালু করা হয় এমফিল কোর্স। পরে পিএইচডি কোর্সও চালু করা হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টিশীল আয়োজন শুধু একাডেমিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির জগতে এর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে, পরে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। অগ্রজদের অনুসরণ করে বর্তমান শিক্ষার্থীরাও শিক্ষা-গবেষণা, সমাজ-সংস্কৃতি, ক্রীড়া প্রভৃতি নানা শাখায় উন্নতি করছে।

সামাজিক অসংগতি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার এখানকার নাট্যসংগঠন জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের দুই গ্রুপ। আনন্দন, ধ্বনি, চলচ্চিত্র আন্দোলন, জলসিঁড়ি, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, জহির রায়হান চলচ্চিত্র সংসদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ফটোগ্রাফি সোসাইটিসহ বেশ কয়েকটি সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের নানা রকম আয়োজনে এ বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় মুখর হয়ে থাকে সুস্থ সংস্কৃতিচর্চায়। একই সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে যেকোনো নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে পালন করে ইতিবাচক ভূমিকা; যার ফল হিসেবে এ বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম তৈরি হয় যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা। পরে এর প্রতিফলন ঘটে জাতীয় ক্ষেত্রে—হাইকোর্টের নির্দেশনায়। এর বাইরে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রসারের জন্য জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন মেলা ও উৎসব। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পাখি মেলা, প্রজাপতি মেলা, নববর্ষ মেলা, বিজয় মেলা, হিম উৎসব ইত্যাদি। আর এতে এ বিশ্ববিদ্যালয় যে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে অগ্রসরমাণ, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

লেখক : অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা