kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

কত প্রাণ গেলে ইয়েমেন যুদ্ধের অবসান হবে

স্টিফেন লেন্ডমান

৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কত প্রাণ গেলে ইয়েমেন যুদ্ধের অবসান হবে

অন্তহীন অনেক যুদ্ধের মতো ইয়েমেন যুদ্ধও ওয়াশিংটনের কৌশলগত স্বার্থপ্রসূত একটি যুদ্ধ। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত নিজেদের গরজে এতে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য পূরণের সহযোগী হিসেবে। এ যুদ্ধে সভ্য আচরণের কোনো চিহ্ন নেই। কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় এর নিরসনের সম্ভাবনা মায়া মাত্র। প্রাণক্ষয়ী সংঘর্ষ চলছেই।

দিন কয়েক আগে বাদশাহ সালমান বছরের পর বছর ধরে চলমান এ যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য সমর্থন চাইলেন, এটাও নির্জলা মিথ্যা। কারণ তিনি বা যুবরাজ বিন সালমান বা ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টর রণোন্মুখ ব্যক্তিরা যুদ্ধ বন্ধের কোনো বাসনাই পোষণ করেন না।

ইয়েমেনের ‘মানবিক সরবরাহ পথ’ হিসেবে খ্যাত বন্দরনগরী হুদেইদায় সংঘাত স্থগিত করা হয়েছিল কিছুদিন আগে। আসলে পুনর্গঠিত হওয়ার ছকের অংশ হিসেবে এটা করা হয়েছিল। সেখানে সৌদি-আমিরাতি বোমা হামলা আবারও শুরু হয়েছে। হুদেইদা ও অন্যান্য ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংঘাত বন্ধের জন্য এবং বিঘ্নহীন ত্রাণ সরবরাহের জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পেশ করেছে যুক্তরাজ্য। এটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হলেও কাজ হবে না। কারণ ওয়াশিংটন, ন্যাটো, সৌদি আরব ও তাদের যুদ্ধবাজ সহযোগীরা পথের বাধা অপসারণে নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব বা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।

গত কয়েক বছরে শুধু মার্কিন ড্রোন হামলায় অগণিত নিরীহ ইয়েমেনি শিশু ও নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময়ে ড্রোন হামলা অনেক বেড়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস নিজেই এ সংকটের অংশ। তিনিও পূর্বসূরিদের মতো ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডায় সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন ভিন্নতর উপায়ে।

কয়েক সপ্তাহ আগে জাতিসংঘ ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর যে প্রতিবেদন দিয়েছে তা সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। তাতে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরের যুদ্ধে নিহত হয়েছে ছয় হাজার ৪০০ জন, আহত হয়েছে ৩০ হাজার জন। হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে জাতিসংঘ যা করেছে তা প্রকারান্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী তৎপরতার শিকার লাখ লাখ ইয়েমেনির প্রতি এ বিবৃতি উপহাস ছাড়া আর কিছু নয়।

মাসখানেক আগে তাঁর মুখপাত্রের মাধ্যমে ইয়েমেনবিষয়ক যে বিবৃতি তিনি দিয়েছেন, তাতে নতুন কিছুই নেই। যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের পরিপ্রেক্ষিতে এমন কথাই বলে থাকেন তিনি। সব পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানান এবং বেসামরিক লোকদের ওপর হামলা যাতে না হয় সে কথাও বলেন তিনি। কূটনৈতিক উপায়ে বিরোধ নিরসনের কথা বলেন তিনি।

গুতেরেস এমন ধারণা দিতে চান যে সংঘাত-সংঘর্ষের জন্য সব পক্ষই সমান দায়ী। তিনি নগ্ন আগ্রাসনের বিষয়গুলো দেখতেই পান না। যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো, ইসরায়েল ও তাদের সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনার সহযোগীদের বর্বর কর্মকাণ্ড, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনাগুলো এড়িয়ে যান তিনি। তাদের যথাযথ সমালোচনা করতে বা নিন্দা জানাতে ব্যর্থ তিনি। বেশির ভাগ পূর্বসূরির মতোই তিনি তাঁর দপ্তরের অবমাননা করছেন। এটা করছেন জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করে, অথচ এ সনদের মর্যাদা রক্ষার জন্য তিনি শপথ নিয়েছেন।

এর আগে হুতিদের পক্ষ থেকেও শান্তি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। গ্রহণযোগ্য একটি প্রস্তাব দিয়েছিল তারা। কিন্তু সেটি গ্রহণ করা হলো না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সে প্রস্তাব মানতে অস্বীকৃতি জানায়।

ইয়েমেনে প্রাণক্ষয় প্রতিদিন গুণিতক হারে বাড়ছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের রক্ষণশীল হিসাবেও দেখা যাচ্ছে, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ক্ষুধায়, চিকিৎসার অভাবে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৮৫ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ইউনেসকোর এক হিসাবে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের মার্চ থেকে বছরে গড়ে ৫০ হাজার শিশুর (পাঁচ বছরের কম বয়সী) মৃত্যু হচ্ছে।

পশ্চিমা ও অন্যান্য মূলধারার গণমাধ্যম ইয়েমেন যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে নির্লজ্জ মিথ্যা কথা বলে যাচ্ছে। মানব ইতিহাসের জঘন্যতম অপরাধের একটি ঘটনাকে আড়াল করার জন্য বা চেপে রাখার জন্য সচেষ্ট তারা। হতাহতের ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। ইয়েমেনের এ যুদ্ধের সত্বর অবসানের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। অন্য কোনো মার্কিন রণাঙ্গনে (ওয়ার থিয়েটার) এমন ঘটনা ঘটছে না।

মার্কিন আগ্রাসন যদি অব্যাহত থাকে, অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক অবরোধ যদি অব্যাহত থাকে, যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তাহলে ক্ষুধায়, অসুখে আরো কয়েক লাখ ইয়েমেনি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর কত ইয়েমেনির মৃত্যু হলে বলা যাবে যে প্রচুর ইয়েমেনি প্রাণ হারিয়েছে! প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সমরাস্ত্র কি আমাদের সবাইকে, মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে?

 

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর বাসিন্দা, লেখক এবং সেন্টার ফর রিসার্চ অন গ্লোবালাইজেশনের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট

সূত্র : গ্লোবাল রিসার্চ অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা