kalerkantho

সোমবার । ১১ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৬ জুলাই ২০২১। ১৫ জিলহজ ১৪৪২

রোহিঙ্গারা মানবোচিত মর্যাদা পাক

গোলাম কবির

১৬ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোহিঙ্গারা মানবোচিত মর্যাদা পাক

দুর্বলের প্রতি সবলের চড়াও হওয়ার ধারা চলে আসছে সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে। বিবর্তনবাদ যাকে বলেছে ‘সারভাইবাল অব দি ফিটেস্ট’। সভ্যতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে মানুষে মানুষে অনুরূপ হানাহানি চলে আসছে ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধ’-এর কর্মকাণ্ডে। প্রতিপক্ষের প্রতি চড়াও হয়ে নির্বিচারে হত্যা করাকে পশুরও অধম কাজ বলে মনে করে পরিশীলিত বিবেক। কবির কথায় বিবেকী নৈতিকতার বাণী শোনা যায় : দুর্বলেরে রক্ষা করো, দুর্জনেরে হানো’। জগৎ তার উল্টো করছে। পরিতাপের বিষয়, স্মরণকালের ইতিহাসে ‘বীরভোগ্যা বসুন্ধরা যেমনটি ছিল, প্রায় তেমনই রয়ে গেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ‘শান্তির ললিত বাণী ব্যর্থ পরিহাসে’ পর্যবসিত হয়ে চলেছে। নানা অজুহাতে সেই মানুষ তার স্বার্থপরতার তীব্র আক্রোশ চরিতার্থ করার জন্য এমনি অন্ধ হয়ে যায়, যা পাশবিকতাকেও লজ্জা দেয়। আমাদের কাছে প্রতিবেশী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর যে দানবীয় হত্যাযজ্ঞের তাণ্ডব চলছে, তা সেই পুরনো অভিধারই অনুবৃত্তি, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ-মতবাদ থেকে উদ্ভূত দ্বন্দ্বের।

দীর্ঘকাল ধরে রোহিঙ্গা নামে কথিত জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের একটি অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। নানা কারণে তারা হয়তো সে দেশের মূল জনস্রোতের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যেতে পারেনি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এমনটি দেখা যায়। তারা ওই দেশের অর্থনীতিতে কিছু না কিছু অবদান রাখছে। অথচ তাদের ওপর ঘটে চলেছে ঘৃণ্যতম হত্যাযজ্ঞ ও মানবতার চরম অপমান।

মিয়ানমারের প্রশাসন তাদের কিছু দুর্বৃত্ত ও সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে অগুনতি রোহিঙ্গা নর-নারীকে রক্তে ভাসিয়ে অবশিষ্টদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে। সেখানকার চরম নির্যাতিত মানুষ অসহায় অবস্থায় বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে ক্ষুদ্র একটি দেশ। এমনিতেই নিজেদের জনসংখ্যার ভারে হাঁসফাঁস করছে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত মানুষের আশ্রয়দান যেন ‘বোঝার ওপর শাকের আঁটি।’ যার ফলে আশ্রয়দাতা ও প্রবেশার্থী সবার জন্য অশুভ। বিষয়টি বোধকরি ভাবাবেগের নয়। তাই এখন জাতি-ধর্ম-বর্ণের পরিচয় না উঠিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় ‘ডুবিছে মানুষ’ ভেবে ন্যায়ের পাশে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো দরকার।

সংশ্লিষ্ট সবার বোঝা দরকার, মানুষের সৃষ্টি প্রথম, তারপর ধর্ম বিশ্বাস। এ বিশ্বাসে পার্থক্য থাকতে পারে। সুতরাং মানুষকে আমরা দেখব মানবিকতার আলোকে। লক্ষণীয়, কিছু ব্যক্তি ধর্মের মোড়কে রোহিঙ্গাদের সাহায্য করতে গিয়ে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি চরিতার্থ করার জন্য কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন করছে। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে অর্থ সংগ্রহ করছে। কোথায়, কাকে সে অর্থ দান করছে তা জানা যায় না। যতটুকু জানা যায় তাতে মনে হয়, নিজেদের ধর্মের বাইরে অন্য ধর্মের মানুষকে সঠিক পরিচর্যা তারা দেয় না। এরা কারো অপরিচিত নয়। এদের পূর্বসূরিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্মের কথা বলেই ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। পঁচাত্তরের জাতীয় ট্র্যাজেডির পর বাইরে থেকে অর্থ সংগ্রহ করে চিকিৎসা-শিক্ষা-ব্যাংক-বীমা ইত্যাদিতে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা বড় অংশ দখল করেছিল। সেসব প্রতিষ্ঠানে তাদের অনুসারী ছাড়া অন্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ। এদের উত্তরসূরিরা ওত পেতে বসে আছে। নানা অজুহাতে তারা সংগঠিত হচ্ছে; ত্রাতার কুম্ভীরাশ্রুকে জল্লাদের রক্তচক্ষুতে রূপান্তর করতে। সবার জানা, স্বার্থোদ্ধারের জন্য ধর্মের কথা বলে আফগান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রায়। এখন ইরান ও ইয়েমেনের প্রতি কোপদৃষ্টি। অথচ এরা পরস্পর একই ধর্মের মানুষ। বোঝা যায়, ধর্ম নয়, ক্ষমতায়নই তাদের লক্ষ্য।

প্রকৃতিতে সব কিছুই স্বার্থের পানে প্রলুব্ধ। ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা মানুষ। এরা অ্যাডাম স্মিথের ভাষায় জন্মগতভাবে স্বার্থপর। এই স্বার্থপরতা থেকে মানুষকে পরার্থপরতা শেখায় মানবধর্ম। আমরা তাই নিজেদের ধর্মের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা রেখে অন্য ধর্মের মানুষকে সম্মানের চোখে দেখে আসছি। সেই পথ অবলম্বন করে রোহিঙ্গাদের জন্য শান্তিপূর্ণ সম্মানজনক সমাধান খুঁজতে হবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। বিশ্ববিবেককে মনে রাখতে হবে, দুর্ভাগা রোহিঙ্গারা মানবসন্তান।

দীর্ঘকাল ধরে মানুষ যে ভূখণ্ডে বসবাস করে আসছে সেটাই তার জন্মভূমি। রোহিঙ্গারাও ভাগ্যান্বেষণে গিয়ে কযেক শ বছর ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে বিধায় সেখানকার নাগরিক। আজ তাদের ওপর দানবিক আচরণ ঘৃণ্য।

রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদের মূল কারণ স্বার্থান্ধতা। এ ছাড়া সে দেশের আইনবিরোধী কাজে হয়তো কেউ জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি উদ্ঘাটন করে তার বিচার হবে। তাই বলে ব্যক্তির দোষে সমষ্টি নারকীয় শাস্তি ভোগ করবে? তা বিবেকী মানুষের ভাবনায় আসার কথা নয়।

আমরা মনে করি এবং আবারও বলি, ধর্ম-বর্ণ-জাতিত্বের পরিচয়ে নয়, মানুষ হিসেবে মানুষের আইনানুগ অধিকারটুকু রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে পাক, সে পথে বিশ্বজোড়া বিবেকী মানুষ একমত হোক, সেই দাবি এবং আশাবাদ বোধকরি ব্যক্ত করা যায়। কারণ ‘মর্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে (কর্তৃত্ববাদী) এ জগতে।’

লেখক : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী কলেজ



সাতদিনের সেরা