kalerkantho

রবিবার। ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৭ জুন ২০২০। ১৪ শাওয়াল ১৪৪১

সালিসি কাঠামোকে জবাবদিহি পর্যায়ে আনা দরকার

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সালিসি কাঠামোকে জবাবদিহি পর্যায়ে আনা দরকার

গত ২০ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠে ‘অপমানে ছাত্রীর আত্মহত্যা’ শিরোনামে সম্পাদকীয়তে সালিসের অন্যায় বিচারে মোমেনা আক্তারের আত্মহত্যার বিষয়টি আমাদের মনে বিশেষ দাগ কেটেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে সালিসের নামে মানুষকে অপমান-অপদস্থ করার ঘটনা যে অহরহই ঘটছে তার চিত্র ফুটে উঠেছে ওই সম্পাদকীয়তে। সাধারণত গ্রামাঞ্চলে সালিসের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। আর এই বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি পক্ষপাতিত্বমূলক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিনিয়ত অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে গ্রাম্য সমাজজীবনে বিচার বা সালিস প্রক্রিয়া খুবই প্রচলিত হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এই সালিসপ্রক্রিয়া অনেকের আত্মহত্যার কারণ হিসেবেও চিহ্নিত হচ্ছে।

এই সালিসব্যবস্থা অনেক সময় আপদের কারণও হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার না হওয়ার কারণে সমাজজীবনে প্রতিহিংসা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। মানুষ সালিস বা বিচার ব্যবস্থা থেকে যেমন বের হতে পারে না, তেমনি সালিস বা বিচার ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করতেও পারে না। অতীতের গ্রামের পঞ্চায়েত ছিল ন্যায়বিচারের আদর্শের প্রতীক। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ, গণ্যমান্য, বিত্তবান, ইমাম ও নেতৃত্ব প্রদানকারী এ রকম পাঁচ ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত হতো পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েতের কাজ হলো গ্রামে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বিধান করা, আইন-শৃঙ্খলা ও শান্তি নিশ্চিত করা, শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীর শাস্তি দেওয়া ও শায়েস্তা করা, গ্রামের লোকদের মধ্যে বিরোধ, ঝগড়া-বিবাদ নিধন করা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণ করা, রাস্তাঘাট মেরামত করা, যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করা, গ্রামে জুয়া খেলা বন্ধ করা ইত্যাদি। কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত স্থানীয় প্রতিনিধির কারণে সমাজজীবন উন্নয়নে পঞ্চায়েত আদর্শ ক্রমেই হারিয়ে গ্রামীণ বিচার বা সালিস ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গ্রাম্য সালিস ব্যবস্থা এখন অর্থহীন মানুষকে শোষণের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে প্রতিপক্ষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

প্রায়ই গণমাধ্যমে প্রকাশ পায় সালিসের অন্যায্য বিচারের অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার খবর। সালিসব্যবস্থায় গ্রাম পর্যায়ে নারীঘটিত বিষয়গুলো সমাধানের নামে গ্রাম্য মোড়লরা রীতিমতো বাণিজ্যে লিপ্ত হয়। প্রভাবশালী গ্রাম্য মাতবরদেরও বিশেষ কায়দায় ম্যানেজ করে বিত্তবানরা অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আর এসব মিথ্যা অপবাদে আমাদের সমাজব্যবস্থায় অহরহ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। গত কয়েক মাসে সালিসের নামে অন্যায় বিচারের ফলে অসংখ্য আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। তাদের মধ্যে কিশোরী মেয়ের সংখ্যা বেশি।

বিচারিক ক্ষমতাহীন এসব সমাজপতি ও ধর্মীয় নেতার বিচার ও আরোপিত শাস্তির কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তারা আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানুষের ধর্মভীরুতা, অজ্ঞতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে আইনবিরোধী নানা ধরনের শাস্তির আয়োজন করে থাকে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। ফতোয়ার নামে শারীরিক নির্যাতনে মৃত্যু অথবা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে।

২০০৯ সালের ৫ আগস্ট বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ গ্রাম্য সালিসে ‘ফতোয়ার’ নামে অবৈধ ও বিচারবহির্ভূত শাস্তি আরোপ এবং প্রয়োগ রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন (রিট পিটিশন নম্বর ৫৮৬৩/২০০৯)। পাশাপাশি প্রশাসনের জ্ঞাতসারে অবৈধ শাস্তি, দোররা মারা, প্রহার ও বেত্রাঘাত করা প্রতিরোধে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের ব্যর্থতাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। ফতোয়ার মাধ্যমে নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে মানবাধিকার পরিপন্থী এসব শাস্তি বন্ধ ও এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা করতে নির্দেশনা চেয়ে পাঁচটি মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ব্র্যাক ও নিজেরা করি রিট আবেদনটি দায়ের করে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, পুলিশের মহাপরিচালককে পক্ষভুক্ত করে ওই রিট আবেদনে বলা হয়, ফতোয়ার নামে অবৈধ শাস্তি প্রদান আইন ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

সংবিধান অনুযায়ী আইনের সমান আশ্রয় লাভ প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং কোনো ব্যক্তিকেই নিষ্ঠুর, অমানবিক ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। ফতোয়ার মাধ্যমে অবৈধ শাস্তি আরোপ ও প্রয়োগ সংবিধানের ২৭, ৩১, ৩২, ৩৫(২) ও ৪৩ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। বাংলাদেশে ফতোয়ার নামে যে ধরনের শারীরিক নির্যাতন করা হয়, তা ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির স্বেচ্ছাকৃত আঘাত ও স্বেচ্ছাকৃত গুরুতর আঘাত-সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর অধীনে দণ্ডনীয় অপরাধ। ২০০৯ সালে রুলে আদালত সুনির্দিষ্টভাবে স্থানীয় সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে ফতোয়ার মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে আদেশ দেন। হাইকোর্ট বিভাগের এ সুনির্দিষ্ট আদেশের পরও স্থানীয় প্রশাসনকে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হতে দেখা যাচ্ছে। উল্লেখ্য, বিভিন্নভাবেই সালিসব্যবস্থায় আইনের অপপ্রয়োগ ঘটছে।

সালিসের নামে প্রহসনের শিকার হয়েছে কতজন তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। অবশ্য এসব বিষয় গণমাধ্যমেও খুব বেশি আসে না। তবে গত কয়েক মাসের পত্রপত্রিকায় সালিসের অবিচারে এক ডজনেরও বেশি আত্মহত্যার খবর প্রচারিত হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নয়নের দিকে দেশ এগিয়ে গেলেও আজও সালিস বসে। বিচারের নামে মেয়েদের বিভিন্ন প্রহসনের শিকার হতে হয়। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও গ্রামাঞ্চলে দোররা মারার ঘটনা ঘটেই চলেছে। আরো অবাক করা বিষয় হলো, ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে মেয়েরাই দোষী সাব্যস্ত হয়। মূলত মেয়েরাই নির্যাতনের শিকার হয়। পারিবারিক বিচার থেকে শুরু করে বড় ধরনের সালিসেও অলিখিতভাবে অভিযুক্ত নারীরাই।

সালিসব্যবস্থা যুগে যুগে চলে আসছে। তাই হঠাৎ করে হয়তো এই রীতি বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু সালিসের ধরন পরিবর্তন করে আরো গঠনমূলক করতে এ প্রক্রিয়াকেও জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতার পর্যায়ে আনতে হবে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সালিসপ্রক্রিয়া চালু না রেখে অন্তত ইউনিয়ন পরিষদে সালিসের ব্যবস্থা করলে সালিসকারীদের কিছুটা হলেও জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে আনা সম্ভব।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা