kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

সড়ক দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি মিলবে কি?

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঈদ অর্থ আনন্দ, ঈদ অর্থ খুশি। ঈদের দিন কিংবা ঈদ মৌসুমে সাধারণত এ দেশের প্রতিটি মুসলিম পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু ঈদের এই আনন্দ-খুশির মুহূর্তেই কোনো কোনো পরিবার বিষাদে পরিণত হয়ে ওঠে, যখন ঈদের দিন বা ঈদের আগের দিন কিংবা ঈদ মৌসুমে ওই পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যু ঘটে। আর এই মৃত্যু যদি হয় সড়ক দুর্ঘটনায়, তাহলে তা হয়ে ওঠে অত্যন্ত বেদনার, অত্যন্ত বিষাদের। এ দেশে ঈদের দিনও থামে না সড়ক দুর্ঘটনা, থেমে থাকে না মৃত্যু। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ২ সেপ্টেম্বর মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহার দিন বিকেল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন ও ঈদের আগের দিন ১৩ জন নিহত হয়েছে।

দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে নিয়মিত ঘটে চলা দুর্ঘটনাগুলো কি এ দেশের জনগণের কপালের লিখন? উন্নত দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার এ দেশের তুলনায় অনেক কম। তাহলে কি কপালের লিখন দেশভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে? নিশ্চয়ই না। এ ক্ষেত্রে মূলত যে বিষয়গুলো এ পার্থক্যের সৃষ্টি করছে তা হচ্ছে সার্বিক যোগাযোগব্যবস্থার ধরন, চালকদের দক্ষতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের ওভারটেক করার মানসিকতা প্রবল মাত্রায় বিদ্যমান থাকা, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব, জনগণের সচেতনতার অভাব, ট্রাফিক আইন কিংবা রাস্তায় চলাচলের নিয়ম না মানা প্রভৃতি। এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং পত্রিকার পাতা খুললেই কিংবা টিভি চ্যানেলের সংবাদের দিকে চোখ রাখলে প্রায় প্রতিনিয়তই চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হওয়ার খবর। দেশে প্রতিনিয়ত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চললেও এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে সড়ক দুর্ঘটনা। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতিবছর এ দেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে এবং এতে প্রায় সমানসংখ্যক মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৪ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৫২ হাজার ৬৮৪ জন আহত হয়েছে। এ হিসাব অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত হয়েছে; অর্থাৎ দিনে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে ১৫ হাজার ৯১৪ জন।

এক হিসাবে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গত দেড় বছরে শুধু ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে অন্তত ২০০ জন। আহত হয়েছে সহস্রাধিক। সরকারি হিসাবে গত ১০ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ মারা যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা অনেক বেশি। বেসরকারি সূত্রগুলো বলছে, প্রতিবছর দেশের সড়কপথে অন্তত পাঁচ হাজার দুর্ঘটনা ঘটছে আর এক বছরেই দেশে মৃতের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং পঙ্গুত্ববরণ করছে এর দ্বিগুণ। এ ক্ষেত্রে সরকারি আর বেসরকারি হিসাবের সংখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও দেশে যে প্রতিনিয়তই সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে অনেক লোকের প্রাণহানি বা পঙ্গুত্ববরণের ঘটনা ঘটছে, মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে; সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেক সময় ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ যে কঠিন ভোগান্তি আর হয়রানির শিকার হচ্ছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কি ধারাবাহিকভাবে ঘটতেই থাকবে? প্রত্যেক ব্যক্তিই এ প্রশ্নের উত্তরে বলবেন, ‘না, এ অবস্থা আর কোনোভাবেই চলতে পারে না এবং চলতে দেওয়া যায় না।’ সুতরাং সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সরকারসহ সবার পক্ষ থেকে অতিদ্রুত সমাধানের পথ খুঁজে বের করাসহ তার বাস্তবায়ন অতীব জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধের উপায় খুঁজতে হলে সর্বাগ্রে সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—দেশে অনেক অনুপযুক্ত সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, নির্দিষ্ট লেন ধরে গাড়ি না চালিয়ে সড়কের মাঝ দিয়ে চালকদের গাড়ি চালানো, রাস্তায় বিপজ্জনক বাঁক বিদ্যমান থাকা, রাস্তার ত্রুটিপূর্ণ নকশা থাকা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চালানো, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, চালকদের বেপরোয়া গতিসহ ভুলপথে বেপরোয়া গাড়ি চালানো, যথেচ্ছ ওভারটেকিং, রাস্তা দিয়ে চলাচলকারী যাত্রী বা পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা, রাস্তার ফুটপাত ব্যবহার না করে রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলাচল করা, রাস্তা পারাপারের জন্য অনেক সময় ওভারব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে জনগণ কর্তৃক রাস্তা পার হওয়া, রাস্তার ওপর ও ফুটপাতে দোকানপাট সাজিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা, যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করা, দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা ও সর্বোপরি রাস্তায় চলাচলের জন্য যে সুনির্দিষ্ট নিয়ম-রীতি রয়েছে তা জনগণ কর্তৃক না মানার প্রবণতা বিদ্যমান থাকা ইত্যাদি। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, আমাদের দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার চিত্র অত্যন্ত করুণ। অন্যদিকে অদক্ষ চালকের হাতে গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দিয়ে, ট্রাফিক আইন না মেনে ও ফিটনেসহীন গাড়ি চালানোর মধ্য দিয়ে অসংখ্য মানুষের মূল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও যেন ‘অজ্ঞাত কারণে’ এসব বিষয় দেখেও দেখে না। সরকার তথা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, জনগণসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা কোনো কঠিন বিষয় নয়। এ জন্য দরকার সরকার ও জনগণের ইতিবাচক চিন্তা ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার উপযুক্ত বাস্তবায়ন। রাস্তার ওপর বা ফুটপাতে হকারদের ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়া, অপরিকল্পিত ও দুর্বল ট্রাফিকব্যবস্থা, ট্রাফিক পুলিশের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, খেয়ালখুশিমতো যেখানে সেখানে গাড়ি পার্ক করা, সড়ক-মহাসড়কের ওপর রিকশা, ভ্যান, টেম্পো, ম্যাক্সি, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড ‘স্থাপন’ করা, রাস্তার মাঝখানে ডাস্টবিন স্থাপন করা, সড়ক-মহাসড়কের উন্নয়নকাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন না করা এবং একই রাস্তা বছরে বারবার খনন করা, জনগণ কর্তৃক রাস্তা পারাপারের নিয়ম-কানুন সঠিকভাবে না মানাসহ নানা কারণে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ অবস্থায় সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অতিদ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সর্বাগ্রে চালকদের হতে হবে আরো দক্ষ, হতে হবে সতর্ক। পাশাপাশি জনগণকেও ট্রাফিক আইন ও রাস্তা চলাচলের আইন-কানুন যথারীতি মেনে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট কঠোরতার সঙ্গে ট্রাফিক আইনের প্রয়োগ অপরিহার্য। মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো ও গাড়ি চালানো অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলাসহ চালকদের ‘ওভারটেক’ করার মানসিকতাও পরিহার করা প্রয়োজন। তা ছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দেশের সার্বিক সড়কব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানোসহ চালকদের দক্ষতা বিচার করে ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি না ঘটে, সে বিষয়টিও সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা আবশ্যক। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিভিন্ন গণমাধ্যম, সুধীসমাজ, সরকারসহ আপামর জনগণকে একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আর এই পদক্ষেপগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন সম্ভব হলেই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো মৃত্যুফাঁদের পরিবর্তে হয়ে উঠবে নিরাপদে চলার পথ।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

[email protected]



সাতদিনের সেরা