kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

‘কিন্তু’, ‘এমন কি’-রা কি তবে নির্বাসনের পথে?

মোফাজ্জল করিম

১৮ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘কিন্তু’, ‘এমন কি’-রা কি তবে নির্বাসনের পথে?

‘ইফ যদি ইজ হয়, বাট কিন্তু নট নয়, হোয়াট মানে কী?’ আমাদের ছেলেবেলা, অর্থাৎ ৬০/৭০ বছর আগে, এটা ছিল ইঙ্গ-বঙ্গমিশ্রিত একটা মজার ধাঁধা। এর উত্তরটাও ছিল মজার : সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আছে আমি বলব কী? এই ছিল এর উত্তর। আবার বন্ধুমহলে একটু খোঁচা মেরে কখনো কখনো এভাবেও এর উত্তর দেওয়া হতো : গাধার মতো প্রশ্ন করলে উত্তর দেব কী? আজকাল কম্পিউটার, ইন্টারনেট আর ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত ছেলেমেয়েদের এসব ধাঁধার খোঁজ করার সময় কোথায়? আর জীবনসায়াহ্নে এসে আমরাও কি আর নেড়েচেড়ে দেখি হারিয়ে যাওয়া শৈশবের মণিমুক্তোগুলো?

তা ইদানীং যেন দেখতে পাচ্ছি সেই ‘ইফ যদি ইজ হয়’-রা আবার ফিরে আসছে আমাদের বাতচিতে। এবং তা যথেষ্ট দাপটের সঙ্গে। তারা এখন আর খোকাখুকুদের মুখে ধাঁধা নয়, বড়দের বড় বড় বুলিতেও তারা দিব্যি স্থান করে নিচ্ছে। আর তা করছে বাংলা ভাষার ‘আদিবাসী’ কিছু কিছু নিরীহ গোবেচারা শব্দকে উত্খাত করে।

আমার কথার সত্যতা যাচাই করতে হলে আপনার আশপাশে বন্ধুবান্ধব, নেতা-ফেতার কথাবার্তা, বক্তৃতা-বিবৃতি, টিভির পর্দায় কারো কারো সাক্ষাৎকার, রিপোর্টারদের রিপোর্টিং ইত্যাদি একটু মনোযোগসহকারে শুনে দেখবেন। দু’চার বাক্য উচ্চারণ করে এঁরা একেকজন যখনই ‘কিন্তু’ বলার প্রয়োজন মনে করছেন, তখনই আমদানি করছেন ইংরেজি ‘বাট’ শব্দটি। আর তা এমন স্বতঃস্ফূর্তভাবে করছেন যেন ওটাই সহজাত, ওটা বাংলা ভাষারই একটি শব্দ। যেন জন্মের পর থেকে এটাই ব্যবহার করে আসছেন তাঁরা। আর এটা যাঁরা করছেন, তাঁদের অনেকেই সমাজের কেষ্টবিষ্টু। মনে হয় যেন জ্ঞানপাপী। আর কোনো কথা জোর দিয়ে বলতে গিয়ে ‘এমন কি’ না বলে বলছেন ‘ইভেন কি’।

টেলিভিশনের কল্যাণে এ ধরনের আগ্রাসন এত ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে যে আমার ভয় হয়, গ্রামের ও শহরের বস্তিবাসী অর্ধশিক্ষিত-অশিক্ষিত-অনগ্রসর মানুষেরাও না কালে কালে এসব শব্দকেই নিজেদের বুলি হিসেবে গ্রহণ করে। কালে কালে বললাম এ জন্য যে ভাষার এমন বিবর্তন বা রূপান্তর হুট করে হয় না। বলতে বলতে, শুনতে শুনতে এটা গা সহা (নাকি কান সহা, মুখ সহা?) হয়ে যায়। আর একদিন দেখা যায়, বদলে গেছে একটি দেশের, একটি জাতির আবহমানকালের কৃষ্টি-সংস্কৃতি। আমাদের ভাষায় কুরসি-কেদারা-মেজকে হটিয়ে চেয়ার-টেবিল, আর পোশাক-আশাকে পিরহান-পাজামা-ধুতিকে ছুড়ে ফেলে স্যুট-কোট-প্যান্ট এক দিনেই জাঁকিয়ে বসেনি। এগুলো প্রথমে সমাজের উঁচু স্তরে চালু হয়ে ধীরে ধীরে সর্বস্তরেই চালু হয়ে গিয়ে একসময় দেখা গেল তারা আর বহিরাগত নয়, তারাই আদিবাসী।

আমি একদিন মসজিদে ইমাম সাহেবের খুতবার বয়ান শুনতে শুনতে রীতিমত ঝাঁকুনি খেলাম। আমার বা আমার মত অনেকেরই বোধ হয় ঘুমের চটকা কেটে গেল। অত্যন্ত জ্ঞানী ব্যক্তি শ্রদ্ধেয় ইমাম সাহেব তাঁর ভাষণে এক জায়গায় অবলীলাক্রমে ‘এমন কি’ না বলে বললেন ‘ইভেন কি’। ইংরেজি ও বাংলা দু’টি শব্দের এরূপ অশ্বতর ব্যবহার নিঃসন্দেহে পীড়াদায়ক। এতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হওয়া তো দূরের কথা, বরং এর পরিণাম যে ভয়াবহ হবে না কে জানে। আমাদের ছেলেমেয়েরা যদি পরীক্ষার খাতায় ‘বাট’ আর ‘ইভেন কি’ লিখতে শুরু করে, বিতর্ক প্রতিযোগিতায় মুক্ত কণ্ঠে ব্যবহার করে এসব শব্দ, তখন তাদের নম্বর হয়তো আপনারা কেটে দেবেন, কিন্তু এমনটি হলো কেন তা দেখবেন না?

বিদেশি শব্দ প্রয়োজনবোধে প্রয়োগ করা অবশ্যই দোষণীয় কিছু নয়। বক্তব্য স্পষ্ট ও জোরালো করতে এমন প্রয়োগ আকছারই হয়ে থাকে। আমাদের পরিভাষার সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেক সময় বিদেশি ভাষার, বিশেষ করে ইংরেজির সাহায্য নিতে হয়। এটা চিকিৎসাশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রে ও ক্রীড়াঙ্গনে প্রায়শই হয়ে থাকে। ক্রিকেট, ব্যাট, বল, ফুটবল ইত্যাদি শব্দের বাংলা করা হাস্যকর। তেমনি ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া বা প্যারাসিটামল। কিন্তু সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাংলা ভাষার একটি শব্দকে বর্জন করে একটি বিদেশি শব্দ ব্যবহার করা নিজের মাতৃভাষাকেই হেয় করার শামিল। কেউ কেউ আবার ইংরেজি শব্দের ভিয়েন দিয়ে বাংলায় কথা বলাটাকে এক ধরনের ফ্যাশন, এক ধরনের আভিজাত্য মনে করেন। এরা শুধু ‘বাট’ আর ‘ইভেন কি’ নয়, পারলে প্রতি দশ শব্দের নয়টিই ইংরেজি বলেন।

কারো কারো এটা আবার মুদ্রাদোষ। এই দোষটি এমন দোষ, যা একবার দেখা দিলে এ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় না। তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি বুঝতেই পারেন না, তাঁর কণ্ঠনিঃসৃত শব্দ বা শব্দগুচ্ছ শ্রোতার কাছে কীরূপ বিরক্তিকর, আবার কখনো হাস্যকর, মনে হচ্ছে। আমরা কলেজে পড়ার সময় আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অনেকেই এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের ইংরেজি বক্তৃতায় তাঁদের মুদ্রাদোষটি এমনভাবে ধরা দিত যে শিক্ষার্থীরা বক্তৃতার বিষয়বস্তু থেকে ওটিতেই অধিক আকৃষ্ট হয়ে পড়ত। আমরা খাতায় দাগ দিয়ে দিয়ে গুনতাম, আজকে স্যার ৪৫ মিনিটের ক্লাসে ‘ওয়েল’ কতবার বলেছেন। আরেক স্যারের মুদ্রাদোষ ছিল ‘রাদার’। এটাও আমরা খুব উপভোগ করতাম। আজ আমার পরম শ্রদ্ধেয় সুপণ্ডিত এই শিক্ষকরা দুনিয়াতে নেই। আল্লাহপাক তাঁদের জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। যদি স্যাররা মুদ্রাদোষমুক্ত থাকতেন, তা হলে বোধ হয় তাঁদের ছাত্রছাত্রীরা ওই ‘ওয়েল’ বা ‘রাদারের’ চেয়ে লেকচারের বিষয়বস্তু অনুধাবন করতে বেশি মনোযোগী হতো।

এই মুদ্রাদোষ প্রসঙ্গেই সংক্ষেপে অন্য একটি ছোট বিষয়ের অবতারণা করার লোভ সামলাতে পারছি না। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রায়শই আমরা বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য শুনি। আবার কখনো কখনো অকুস্থল থেকে টিভি প্রতিবেদকদের সরাসরি পাঠানো রিপোর্ট শুনি। লক্ষ করে দেখবেন, প্রায় সব প্রতিবেদকই তাঁদের কথার ভেতর ‘আসলে’ শব্দটি মুহুর্মুহু উচ্চারণ করেন। এটা যে দর্শক বা শ্রোতার ‘কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হয়ে মরমে গিয়ে’ কীরূপ বিরক্তি সৃষ্টি করে, তা তাঁরা বোধ হয় কখনো ভেবে দেখেননি। আর আসলে কখনো কখনো এই ‘আসলে’র ছড়াছড়ির কারণে পুরো প্রতিবেদনটিই মাঠে মারা যাওয়ার উপক্রম হয়। তেমনি কোনো কোনো ব্যক্তির এই ‘বাট’ আর ‘ইভেন কি’-প্রীতি দেখলে মনে হয় এগুলো তাদের মুদ্রাদোষে পরিণত হয়েছে। আর মুদ্রাদোষ অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

দুই.

বাংলাদেশে তিন ধরনের বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একটি সাধুভাষা, যা সব সময়ই কেবল লিখিত ভাষা হিসেবেই পুঁথি-পুস্তকে ব্যবহৃত হতো। ইদানীং এর চল নেই বললেই চলে। ভাষা, তা সে লিখিতই হোক আর কথ্যই হোক, এখন শুধু চলিত বা চলতি রূপ মেনে চলে। এটাই এখন প্রমিত বা প্রচলিত বাংলা ভাষা। শিক্ষিতসমাজে এই রীতিই চলে আসছে। আর সাধু ও চলতি এই দুই রীতির বাইরে বাংলাদেশের সবখানে আছে আঞ্চলিক ভাষা। আঞ্চলিক ভাষাভাষী মানুষ নিজেদের মধ্যে নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষায় কথা বলে থাকেন। এতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

লক্ষণীয় যে কোনো কোনো আঞ্চলিক ভাষা ইতিমধ্যেই সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। আমাদের নাটকগুলোতে, বিশেষ করে টিভি নাটকে, ঢাকা-বরিশাল-খুলনা-ফরিদপুর-পাবনা-ময়মনসিংহ-কুমিল্লা প্রভৃতি অঞ্চলের ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দর্শক বা শ্রোতা যে তাতে নাখোশ তা বলা যাবে না। বরং বিষয়ানুগ হলে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ভাষাটি যথেষ্ট শ্রুতিমধুরই মনে হয়। অথচ কেউ কেউ এর সমালোচনা করতেও ছাড়েন না। তাঁরা মনে করেন, করবা-খাবা-যাবা, আইতাছি-যাইতাছি ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের ফলে প্রমিত চলতি বাংলা ভাষায় গ্রাম্যতা ঢুকে পড়ে তার কৌলীন্য নষ্ট হয়। আমি অবশ্য তাদের সঙ্গে একমত নই। আমার মতে, যে ভাষায় সাধারণ মানুষ কথা বলে, যা তাদের কাছে শ্রুতিমধুর মনে হয়, তা নাটকে-নভেলে উঠে এলে দোষ কী? শুধু নদীয়া-শান্তিপুর ও কলকাতার ভাষাই সুন্দর, সাহেব-সুবোদের কথাই শুনতে ভালো লাগে, আর আমাদের ঢাকাইয়া ‘বাঙ্গাল’ ভাষা সুন্দর না, তা তো ঠিক না।

ভাষার ব্যবহারে যাঁরা গ্রাম্যতা-দোষ খোঁজেন, কথ্য ভাষায় বিদেশি শব্দের অনুপ্রবেশে তো তাঁদের বিচলিত হতে দেখি না। যদি হতেন, তবে ‘বাট’ আর ‘ইভেন কি’-দের ঝেঁটিয়ে বিদায় করতেন।

তিন.

মুদ্রাদোষের একটি পুরনো গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করি। ‘হেড অফিসের বড় বাবু লোকটি বড্ড শান্ত’ ছিলেন ঠিকই, তবে তাঁর ‘মাথার ব্যামোর’ সঙ্গে মুদ্রাদোষও ছিল একটা। তিনি কথায় কথায় বলতেন, ‘ভালো, খুব ভালো’। তা একদিন তাঁর এক কর্মচারী পিতার মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে এক সপ্তাহের ছুটি চাইতে এলেন তাঁর কাছে। ‘স্যার, বাড়ি থেকে খবর এসেছে গত রাতে আমার বাবা মারা গেছেন। আমার এক সপ্তাহের ছুটি দরকার’, কর্মচারীটি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বিরসবদনে আরজি পেশ করলেন। শুনে বড় বাবু বললেন, বাবা মারা গেছেন, ভালো, খুব ভালো। তা কী হয়েছিল?...

কর্মচারীটির বাবার কী হয়েছিল জানি না, ‘বাট’ অনুমান করি, বড় বাবু সে যাত্রা কপালগুণে বড় বাঁচা বেঁচে গিয়েছিলেন। ‘ইভেন কি’ তাঁর কপালে কিছু উত্তম-মাধ্যমও জোটা বিচিত্র ছিল না। ভদ্রলোকের বাবা মারা গেছেন, আর ইনি বলেন কি না সেটা ভালো, খুব ভালো!

‘আসলে’ বড় বাবু লোকটা খারাপ ছিলেন না, ‘আসলে’ ওটা ছিল তাঁর মুদ্রাদোষ!

 

লেখক : সাবেক সচিব, কবি

[email protected]

মন্তব্য