kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রসঙ্গ ভুল চিকিৎসা

ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী

২৯ মে, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রসঙ্গ ভুল চিকিৎসা

সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে সম্প্রতি। রোগীর সহপাঠীরা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুরসহ চিকিৎসকদের মারধর করে। তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভুল চিকিৎসা করে মেরে ফেলা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর রাতেই মামলা করেন। এতে প্রধান আসামি করা হয়েছে দেশের প্রথিতযশা চিকিৎসক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন, ওই হাসপাতালের অতিথি চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহসহ ৯ জন চিকিৎসককে। পুলিশ গ্রেপ্তার করে রাতেই কোর্টে চালান দেয় হাসপাতালের পরিচালককে।

ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ব্যাপারে আমার প্রথম রিঅ্যাকশন হলো, আমি আমার ছেলেকে বলেছি, ‘বাবা, তোমাকে চিকিৎসক বানাব না।’ আমি কিন্তু বাইচয়েস চিকিৎসক হয়েছি। ইংল্যান্ডে, অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ ছিল। ভাই থাকে ইংল্যান্ডে, বোন থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। আমি ঢাকা মেডিক্যালের ফার্স্ট বয় ছিলাম। সুযোগ হয়েছিল স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে যাওয়ার। অথচ স্কলারশিপের জন্য যেদিন ভাইভা হবে সেদিন উপস্থিতই হইনি। বাসা থেকে জিজ্ঞেস করা হলো, কেন যাবে না? আমি বলেছিলাম, দেশেই থাকব। এরপর আমি কিন্তু এ দেশেই থেকে গেছি, প্র্যাকটিক্যালি কাজ করছি।

দ্বিতীয় কথা হলো, এ দেশে অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহর মতো চিকিৎসক যখন-তখন আসেন না। তাঁর মতো চিকিৎসককে যখন এ রকম একটা মিথ্যা অভিযোগে নাজেহালের সম্মুখীন হতে হয় তখন সাধারণ চিকিৎসকদের নিরাপত্তা কতটুকু আছে, সেটা আমার কাছে বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আবদুল্লাহর ছেলে সাদী আবদুল্লাহ একবার আমার অধীনে ঢাকা মেডিক্যালে ট্রেনিং করতে এলো। আমি রীতিমতো গর্ব বোধ করেছিলাম এ জন্য যে আবদুল্লাহর মতো চিকিৎসকের ছেলে এসেছে আমার অধীনে পড়াশোনা করতে! আর সেই মাপের একজন চিকিৎসক আজ ভুল চিকিৎসার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে মামলার আসামি। আমার প্রশ্ন হলো, এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কী ছিল? একজন একটা অভিযোগ করল আর আপনি একটা হাসপাতালের পরিচালককে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেলেন! কী বেসিসে হলো এ কাজটা এবং এর আইনগত ভিত্তিই বা কী, সেটা কেন দেখা হলো না?

তৃতীয়ত, কোনো রোগী মারা গেলে সবার খারাপ লাগবে। আমার ভাই বা আত্মীয় মারা গেলে খারাপ লাগবেই। কিন্তু তাত্ক্ষণিকভাবে যে ঘটনাটা ঘটানো হলো সেটা কেমন কথা? আমার ভাই, ভাতিজা, ভাগ্নে পড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদের কি আমরা এটা শেখাচ্ছি যে তুমি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো বলে তুমি আইন-শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে! আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কী শিক্ষা দিচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা কেমন শিক্ষা পাচ্ছে? আমি ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্র, মানে আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। আমি গর্ব করে বলি, আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটির অ্যালামনাই সদস্য। অথচ প্রায়ই দেখি রাস্তার উল্টা দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসগুলো ছুটছে। তাহলে কি আমরা সেটাই তাদের শেখাচ্ছি?

ভুল চিকিৎসার অভিযোগ থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে শাস্তি হোক, আপত্তি নেই। কিন্তু যারা এ রকম একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটাল, যারা চিকিৎসকদের ওপর হাত তুলে রক্ত ঝরাল, তাদের এখনো কেন শাস্তি হচ্ছে না? আমি মনে করি, অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। আমি আবারও বলছি, অপচিকিৎসা হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু অপচিকিৎসার ধুয়া তুলে যেভাবে ঘটনা ঘটানো হয়েছে বা হচ্ছে, তা কিন্তু মোটেই ঠিক না।

চতুর্থত, এ দেশে আইন-কানুনের একটা ফ্রেমওয়ার্ক থাকা উচিত, যেটা নেই। আমি যদি অপচিকিৎসার শিকার হই, তবে তার যেন প্রতিকার পাই—এর একটা সুসংগঠিত ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমাদের দেশে সেই শক্ত ফ্রেমওয়ার্ক নেই বলে সারা দেশে এ ধরনের অরাজকতা চলছেই।

পঞ্চমত, আমাদের মিডিয়ার ভাই-বোনেরা কী ভূমিকা পালন করলেন? তাঁদের মধ্যে একটা গ্রুপকে দেখলাম তাঁরা পত্রিকা, অনলাইন বা চ্যানেলের কাটতি বাড়ানোর জন্য ভুল চিকিৎসার বড় বড় হেডলাইন দিয়েছেন। তা আসলে কতটুকু সঠিক ছিল? ঘটনার কারণটা কি কোনো সাংবাদিক অনুসন্ধান করেছেন—আসলেই কী ঘটেছিল ওখানে? তাঁদের তো উচিত ছিল সত্যানুসন্ধানী হয়ে প্রতিবেদন করা। কিন্তু তাঁরা সত্যের অনুসন্ধানী না হয়ে বাজার অনুসন্ধানী হলেন। অথচ তাঁদের ওপর আমরা তো অনেক আশা-ভরসা করে থাকি সত্যের পুরো আদল প্রকাশ করার জন্য।

ষষ্ঠত, ইন্টারনেটে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যে যা পারছি তা ইচ্ছামতো লিখছি। এই যে ইব্রাহিম মেডিক্যালের যে ছাত্র এ ঘটনাকে উসকে দিল, সে কেমন ছাত্র? ভবিষ্যতে সে কেমন চিকিৎসক হবে। সেই ছেলে তো এ বি এম আবদুল্লাহর পায়ের নখের যোগ্যও না। এই ছেলের কাছ থেকে এই দেশ, এই জনগণ কী আশা করবে?

আমাদের একজন বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট (নাম বলব না) তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আরো বড় ধরনের জটিলতায় পড়েছেন। উনি এখন গালে হাতই দিতে পারেন না, শেভ করতে পারেন না। তাঁকে দাড়ি রাখতে হয়েছে। যাঁরা মনে করেন যে বিদেশে গেলেই সাদা চামড়ার কেউ একজন দুই পাতা লিখে দিলেই সেটা ভালো চিকিৎসা হয়ে যাবে, তাঁরা মনে রাখবেন ওই বিদেশি চিকিৎসক যেভাবে পড়াশোনা করে পাস করছেন, আমাদের দেশের চিকিৎসকরাও সেভাবে পড়াশোনা করেই পাস করছেন। বরং আমাদের দেশের ছেলেরা বিদেশে গিয়ে নামকরা চিকিৎসক হচ্ছেন। এই যে ভালো কাজগুলো দেশে ও বিদেশে চিকিৎসকরা করছেন—এসব ঘটনায় তাঁরা কিন্তু আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

আমি মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা, কমনসেন্স, সাহস, চিন্তাভাবনা অনেক বেশি সুদৃঢ়। তাই আমি আশা করব, তিনি এ বিষয়গুলোর প্রতি একটু নজর দেবেন। কারণ রাজনীতিবিদদের মধ্যে সে রকম প্রজ্ঞাশীল যাঁরা আছেন তাঁরা যদি এগিয়ে না আসেন, তাহলে সমাজের এই যে অরাজকতা বা যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনগুলো আসছে, তা কিন্তু বন্ধ হবে না।

 

লেখক : অধ্যাপক, বিভাগীয় প্রধান, হৃদরোগ বিভাগ

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

অনুলিখন : আতাউর রহমান কাবুল



সাতদিনের সেরা