kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

খবরের রাজনীতি বনাম রাজনীতির খবর

ড. খুরশিদ আলম   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যগুলো নানা ধরনের হয়ে থাকে। কোনোটি ইতিবাচক, কোনোটি নেতিবাচক। কোনোটি সরকারের পক্ষে যায়, কোনোটি সরকারের বিপক্ষে। ইতিবাচক তথ্যের যেমন চাহিদা আছে, তেমনি নেতিবাচক তথ্যেরও চাহিদা আছে।

বিজ্ঞাপন

পত্রিকায় প্রকাশিত সব তথ্যই একজন পাঠক পড়েন না। আবার সব তথ্যই সব পাঠক গ্রহণ করেন না। তাই অন্য সব বিষয়ে খবরের মধ্যে কমবেশি মিল থাকলেও রাজনীতির খবরের মধ্যে মিল দেখা যায় না। কারণ রাজনীতির তথ্যের ক্ষেত্রে তথ্যদাতাকে মনে রাখতে হয় যে কোনটি তাঁদের পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে আর কোনটি হবে না। প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনীতির ক্ষেত্রে কে কোন তথ্যকে গ্রহণ করে এবং কোনটি গ্রহণ করে না তার কি কোনো নিয়ম আছে, থাকলে সেটি কী?

আসলে মানুষের এই তথ্য গ্রহণের কোনো সূত্র এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্লেষক দিতে পারেননি। বলা যায়, রাজনৈতিক তথ্যকে মানুষ তার মতাদর্শগত বা বিশ্বাসের দিক থেকে গ্রহণ করে; কিন্তু অন্যান্য তথ্য মোটামুটিভাবে সবাই গ্রহণ করে। তাই রাজনীতির তথ্য গ্রহণ করার ক্ষেত্রে দাতা নয়, গ্রহীতাই মুখ্য বিষয়। চাঁদে সাঈদীর মুখ দেখার কথা যখন বলা হলো তখন কিছু লোক তা বিশ্বাস করেছিল এবং এ ধরনের বক্তব্য কিছু লোক সব সময় বিশ্বাস করবে।

মনে হয় কোন তথ্য পাঠক গ্রহণ করেন তার প্রধান নির্দেশক হতে পারে কোন তথ্য পাঠক বর্জন করেন। যেমন, শেখ হাসিনা ডক্টরেট পাওয়ার খবরে অনেকের তা পছন্দ হয়নি। কিংবা বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ায় তেমন ভালো লাগেনি। কারণ তা আওয়ামী লীগের শাসন আমলে হয়েছে। তাই সব পাঠককে শ্রেণি বিভাজন করলে দেখা যাবে যে কিছু পাঠক কিছু রাজনৈতিক তথ্য গ্রহণ করেন। তার অর্থ হচ্ছে, সেই পাঠক বা সে ধারার লোকেরা কিছু তথ্য বর্জন করেন।

তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান যে পক্ষপাতিত্ব দেখা যায় তা হচ্ছে পাঠকের তথ্যের উৎস নির্বাচন। যে উৎস তিনি বাছাই করবেন সে উৎস তাঁকে সে ধরনের তথ্য দেবে। অন্য উৎসে প্রদত্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করার আগ্রহ তাঁর থাকে না, এমনকি ভিন্ন তথ্য দিলেও অনেক সময় তিনি তা গ্রহণ করেন না। কারণ সেটি তাঁর বিশ্বাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বা পরিপন্থী কিংবা পছন্দের নয়।

এ বছরের দীর্ঘ ৯২ দিনের অবরোধের সময় সর্বশেষ দেখা গেল যে একটি টিভি চ্যানেলে ক্রমাগত অবরোধের খবরের অংশ হিসেবে স্ক্রলে বিভিন্ন রকমের সহিংসতার খবর দিয়ে যাচ্ছে, এমনকি দু-তিন দিনের পুরনো খবরও দিয়ে যাচ্ছে, যদিও তখন অন্য চ্যানেলগুলোতে এ ধরনের কোনো খবর দেওয়া হচ্ছিল না। তা ছাড়া অতি তুচ্ছ একটি ঘটনা যেমন- কোনো একটি ক্ষুদ্র শহরের একটি মহল্লায় সন্ধ্যার পর হয়তো কোনো টোকাইকে দিয়ে কেউ একটি ককটেল বা ফটকা ফাটিয়েছে, যা ওই মহল্লার অনেকেই জানে না, তাকেও জাতীয় পর্যায়ের একটি গণমাধ্যমে ফলাও করে নিউজ আকারে প্রচার করা হয়েছে। এসব তথ্য দেখে অনেকে আবার ধরে নিয়েছে যে দেশে একটি ভয়াবহ আন্দোলন হচ্ছে। এটিকে রাজনীতির খবর না বলে খবরের রাজনীতি বলাই শ্রেয়।

বস্তুত গণমাধ্যমে সেসব তথ্য পরিবেশন করা হয় যার কোনো না কোনো চাহিদা আছে। তাই রাজনৈতিক তথ্য তৈরি করা কিংবা সংগ্রহ করার জন্য এত সব চেষ্টা সব জায়গায় দেখা যায়। আবার রাজনীতির খবর আর রাজনীতির উদ্দেশ্যে খবর- এ দুটি এক নয়। রাজনীতির খবরের ক্ষেত্রে যেমন একটি বিশেষ ধারা লক্ষ করা যায় অর্থাৎ যে পত্রিকা যে রাজনীতির প্রচার-প্রসারের জন্য কাজ করে, সে রাজনীতিকে প্রসারের জন্য কিছু খবর তৈরি করে। কিন্তু অনেক পাঠক আছেন যাঁরা নিউজ (খবর) এবং ভিউজকে (মতামত) আলাদা করতে পারেন না। এটিও খবরের রাজনীতি।

রাজনীতির খবর আর খবরের রাজনীতি এক নয়। এ দুটিরই চাহিদা আছে, আর আছে বলেই তার জোগান দেওয়া হয়। রাজনীতির খবর বিভিন্নভাবে পরিবেশন করা হয়, যেমন কোনো তথ্য পূর্ণাঙ্গভাবে বলা, অর্ধসত্য বলা, অসত্য বলা, বিকৃত সত্য বলা বা তথ্যকে গোপন করে যাওয়া। এই শ্রেণির লোকেরা বস্তুত প্রথমে সমর্থক, পরে পাঠক। তাই তাঁদের কাছে তথ্যও সেভাবে পরিবেশন করা হয়, যেমনটা তাঁরা প্রত্যাশা করেন।

তথ্য কোন সূত্র থেকে পাওয়া বা আদৌ কোনো সূত্র ব্যবহার করা হয়েছে কি না এটি যাচাই করার মতো জ্ঞানবুদ্ধি সব মানুষের থাকে না। অনেকে শুধু যা ছাপা হয়েছে তা দেখেই ধরে নেন যে তা সঠিক। বিশেষ করে যে মতাদর্শের সমর্থনের পত্রিকা তিনি পড়েন সেখানে যে তথ্যই থাকুক না কেন, তিনি তা বিশ্বাস করেন। তথ্যের উৎসের এই পক্ষপাতিত্ব সযত্নে তিনি নিজেই করেন। তিনি প্রাপ্ত তথ্য অন্য উৎস থেকে যাচাই-বাছাই করার কোনো চেষ্টা করেন না। কারণ তিনি তাঁর প্রয়োজনও অনুভব করেন না।

তাই খবরের রাজনীতি এবং রাজনীতির খবর সব সময় আলাদা একটি বিষয়। কিন্তু পাঠকের চাহিদার কারণে সে তফাতটা অনেক সময় থাকে না। তা থেকে তথ্য সরবরাহকারীরা আদৌ মুক্তি পাবেন কি না জানি না। কারণ পাঠকের চাহিদা তো তা বলে না।

লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব

সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট

[email protected]



সাতদিনের সেরা