kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

মো. সেলিম রেজা   

৪ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

বাংলাদেশ আজ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, এটি যেমন খুশির খবর; তেমনি ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে, সেটিও বড় আশার কথা। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ২০২১ নয়, ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। প্রধানমন্ত্রীর কথা যে এখন আর ফাঁকা বুলি নয়, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও গতি দেখে বোঝা যায়। ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ শতাংশের ওপরে। মাথাপিছু জাতীয় আয় ২০০০-০১ অর্থবছরে ছিল ৩৭৭ মার্কিন ডলার, যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩১৪ মার্কিন ডলার (নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৫ মার্কিন ডলার থেকে চার হাজার ১২৫ মার্কিন ডলার এবং উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে মাথাপিছু আয় চার হাজার ১২৫ মার্কিন ডলার থেকে ১২ হাজার ৭৩৬ মার্কিন ডলার হতে হবে, বিশ্বব্যাংক ২০১৬), যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক লাখ দুই হাজার ২৬ টাকার সমান। মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি মোট জাতীয় আয় বৃদ্ধিকেই নির্দেশ করে, যা দেশকে আজ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে শামিল করেছে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের আকার চলতি মূল্যে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে। আরো একটি খুশির খবর, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় সাড়ে ১২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব্ব আদায় করেছে। দেশের মানুষের মধ্যে কর ফাঁকি দেওয়ার যে প্রবণতা, সেখানে জাতীয় রাজস্ব্ব বোর্ডের এ অর্জন সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। সুতরাং এ কথা এখন জোর দিয়ে বলা যায়, তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়ন এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়, বরং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা সরকারের আছে। সরকার যদি ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে দেশ নির্ধারিত সময়ের আগেই উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে- এ কথা যেমন জোর দিয়ে বলা যায়, তেমনি অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে মনের কোথাও যেন একটু কু-ও গেয়ে ওঠে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো ভালো অবস্থায় থাকলেও সরকারের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা আর সীমাহীন দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা। আগামী দিনগুলোতে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হবে, যাতে বিরোধী দল আন্দোলন করার কোনো ইস্যু খুঁজে না পায়। সব ক্ষেত্রেই একটি সোহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে সরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যে ঘুষ ও দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে, তা রোধ করতে হবে। তা না হলে সমাজের সাধারণ মানুষ উন্নয়নের সুফল পাবে না। সরকার একদিকে যেমন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছে; অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিকেও নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। সুতরাং মানুষের প্রকৃত আয় বাড়বে বলে আশা করা যায়। ফলে এখন ঘুষ না নিয়েও অনেক ভালোভাবে জীবন যাপন করা যাবে বলে আশা করা যায়। তাই সরকারি অফিসের ঘুষ-দুর্নীতির গলা চেপে ধরার এটাই সর্বোত্তম সময়। সুতরাং রাজনৈতিক স্থি্থতিশীলতা ও নিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। পাশাপাশি ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না আমাদের ভূমির পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত এবং বেকারত্বের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে বড় অন্তরায়। জনসংখ্যা যদি নিয়ন্ত্রণে (জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭ থেকে ১.০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে) রাখা সম্ভব হয়, তাহলে একদিকে যেমন বেকারত্ব কমবে, কৃষিজমি রক্ষা পাবে; অন্যদিকে মাথাপিছু আয়ও বাড়বে।

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার কারণে স্ব্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে দাতা দেশ বা সংস্থা থেকে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, তা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক নিম্ন মধ্যম আয়ের হিসেবে অনুমোদনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ স্ব্বল্পোন্নত দেশের সব সুযোগ-সুবিধা পাবে। এ অবস্থ্থায় উন্নয়ন সহযোগী দেশ থেকে যাতে আরো সহায়তা পাওয়া যায় তার বন্দোবস্ত করতে হবে, যাতে দেশ দ্রুত উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

সরকারকে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধি কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের একমাত্র মানদণ্ড নয়। মানব উন্নয়ন সূচকে প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি (জন্মকালীন), গড় বয়স্ক শিক্ষা ও স্কুলে যাওয়ার বছর সংখ্যার বৃদ্ধি ও প্রকৃত মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি উন্নয়নকে নিশ্চিত করে। পাশাপাশি জীবনধারণের জন্য মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা, আত্মমর্যাদাবোধ থাকা, কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা, শিক্ষা, চিকিৎসার সুযোগ অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। শুধু উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকলে চলবে না, পাশাপাশি সুষম ও টেকসই উন্নয়নের কথা মাথায় রেখে শিক্ষা ও স্বাস্থ্থ্যসেবা দরিদ্র মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতে বড় বড় প্রকল্পের বাস্ত্তবায়নের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা বাংলাদেশকে শুধু একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে দেখতে চাই না, বরং ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত ও বৈষম্যহীন একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে দেখতে চাই।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা