kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ নভেম্বর ২০১৯। ২৭ কার্তিক ১৪২৬। ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মনের কোণে হীরে-মুক্তো

আপনজনকে কেউই মৃত দেখতে চায় না

ড. সা'দত হুসাইন   

৪ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



আপনজনকে কেউই মৃত দেখতে চায় না

মধ্যরাতের খবরটা আমি যখন দেখতে শুরু করেছি তার আগেই মৃত ব্যক্তির নাম বলা হয়েছে। তবে তাঁর ছবি তখনো দেখানো হচ্ছে। মরণোত্তর কৃত্যাদি সম্পর্কে তথ্যাদি জানানো হচ্ছে। ছবিটি সাম্প্রতিককালের; একজন ক্ষীণ স্বাস্থ্য বয়স্ক ভদ্রলোকের। ছবি থেকে আমি ঠিক চিনতে পারিনি এ ভদ্রলোককে। পরদিন পত্রিকা দেখে জানলাম তিনি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন স্বনামখ্যাত সাংবাদিক হাবিবুর রহমান মিলন। সাংবাদিকজগতে একটি সুপরিচিত নাম। প্রায় ৫০ বছর আগে থেকে আমি তাঁকে চিনি; তিনি আমাকে চিনতেন বলে মনে হয় না। তবে গত ২০ বছর আমি তাঁকে সামনাসামনি দেখিনি। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর সমাসীন থাকার কথা শুনেছি। আমি যে হাবিবুর রহমান মিলনকে দেখেছি, টেলিভিশনের ছবির সঙ্গে তাঁর চেহারা বা আদলের খুব একটা মিল ছিল না। টেলিভিশনের চেহারা দেখে সে কারণে আমি তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে চিনতে পারিনি।

হাবিবুর রহমান মিলনকে আমি প্রথম দেখি ১৯৬৮ সালে প্রেসক্লাবে। তখন আমি 'পাকিস্তান ফিচার সিন্ডিকেট' নামে একটি সংবাদ সংস্থায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতাম। এ সংস্থার মালিক বা কর্ণধার ছিলেন 'পাকিস্তান ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট'-এর সাবেক সভাপতি প্রথিতযশা সাংবাদিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ। এর আগে আমি সাপ্তাহিক 'হলিডে' পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ও স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছি। তবে এর জন্য কোনো টাকা-পয়সা পেতাম না। ফিচার সিন্ডিকেটে এসে বেতনভোগী নিয়মিত সাংবাদিক হয়ে গেলাম। আমার সহকর্মী ছিলেন সর্বজনাব কামাল লোহানী, মির্জা নুরুল হুদা কাদের বক্স, তাহমিনা সাইদ, ড. মান্নান, আলফা কবির, শাহিদ জামাল, নওশাদ নুরী ও সোহেল আদিব। সালাহউদ্দিন মাহমুদের সুপ্রভাবে আমরা অতি সহজেই প্রেসক্লাবের সদস্য হয়ে গেলাম। প্রেসক্লাবে আড্ডা দেওয়া ও খাওয়াদাওয়ার সুযোগ আমাদের কাছে একটা বিরাট প্রাপ্তি হিসেবে ধরা দিল। ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে আমার অল্পবিস্তর জানাশোনা ছিল। এ ছাড়া যেহেতু ফিচার সিন্ডিকেটের বদৌলতে আমাদের নাম দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই তিন-চারটি পত্রিকায় লেখা বেরোত, তাই অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সাংবাদিক মহলে আমরা পরিচিত হয়ে গেলাম। প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের রাজনীতিতেও আমাদের হাতেখড়ি হলো। সাংবাদিক নেতাদের কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেলাম।

হাবিবুর রহমান মিলন প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। নির্বাচনের সময়ে তাঁকে খুব ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। তবে তিনি আমাদের উপদল বা 'ইনার গ্রুপে'র সদস্য ছিলেন না। আমরা যারা এক 'সাব-কালচারে'র সদস্য হিসেবে আড্ডা দিতাম তাদের মধ্যে ছিলেন আহমেদ নজির, আলী আশরাফ (দুর্জন উবাচ), কামাল লোহানী, আহমেদ হুমায়ুন, জয়নাল আবেদিন, মাসির ভাই, হাসান সাইদ, নওশাদ নুরী, আবদুর রহিম আজাদ ও মনজুর আহমেদ। হাবিবুর রহমান মিলন ছিলেন দোহারা গড়নের দীর্ঘদেহী এক টগবগে যুবক। হিসাব করে দেখছি তাঁর বয়স তখন ৩০ থেকে ৩৩-এর কোঠায়। পেটানো শরীর, কর্মোদ্যমে ভরা। এর প্রায় ২০-২৫ বছর পরও তাঁকে আমি দু-একবার দেখেছি। তখনো তাঁর শরীরে জীর্ণতা-জড়তার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। মৃত্যু সংবাদের সঙ্গে যে ছবিটা দেখানো হলো, তাতে মনে হয়েছে শেষ বয়সে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছিল। অনেকেরই এরূপ হয়, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবু এই জরা মেনে নিতে কষ্ট হয়, আমরা সেই টগবগে জওয়ানকে স্বাস্থ্যবান বয়স্ক ব্যক্তি দেখতে পছন্দ করি।

হাবিবুর রহমান মিলনের চিরবিদায়ের কথা চিন্তা করতে গিয়ে দেখলাম ষাটের দশকে যেসব রথী-মহারথী সংবাদজগৎকে আলোকিত করে রেখেছিলেন, তাঁরা আজও দাপুটে উপস্থিতি নিয়ে আমার ভাবনার দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের স্মৃতির দ্যুতি অপূর্ব মহিমায় আজও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। জানি না তাঁদের সবার নাম আজ মনে করতে পারব কি না। যাঁদের নাম তাৎক্ষণিকভাবে মনে পড়ছে তাঁরা হলেন সর্বজনাব কে জি মোস্তফা, এ বি এম মূসা, আনোয়ার জাহিদ, এনায়েত উল্লাহ খান, হাসানুজ্জামান, এ এল খতিব, আতাউস সামাদ, ফয়েজ আহমেদ, নির্মল সেন, গিয়াস কামাল চৌধুরী, সিরাজুল হোসেন খান, রণেশ দাশগুপ্ত, বজলুর রহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, কবি শামসুর রাহমান, আলমগীর কবির, হাসান সাইদ, আলী আশরাফ, ফজলে রশিদ, মাসির ভাই, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী ও আহমেদ হুমায়ুন। মানিক মিঞা, আবদুস সালাম, জহুর আহমেদ চৌধুরী, সিরাজউদ্দিন হুসেইন, সত্যেন সেন, ওবায়দুল হক, খোন্দকার আবদুল হামিদ, মোহাম্মদ মোদাব্বের এ জগতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হলেও তাঁদের প্রেসক্লাবে খুব একটা দেখিনি। তাঁরা বোধ হয় নিজেদের জগতে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যাপৃত ছিলেন। তাঁদের সম্পর্কে নানা রকম গল্প ও তাঁদের বক্তব্য যে আমাদের আলোচনার বড় উপজীব্য ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

ষাট ও সত্তরের দশকে এসব খ্যাতিমান ব্যক্তির পদভারে প্রেসক্লাব তথা সাংবাদিকবলয় প্রকৃতই আন্দোলিত হতো। আমরা যে টেবিলে বসেছি তার আশপাশের কোনো টেবিলে হয়তো তাঁদের একজন বা দুজন বসে আড্ডা দিচ্ছেন। পাশে বসা ভক্তরা গোগ্রাসে তাঁদের বক্তব্য গিলছে। আমাদের কানেও বক্তব্যের ঝাপটা এসে লাগছে। আড্ডার মূল বিষয় রাজনীতি। তার সিংহভাগ হচ্ছে সরকারের সমালোচনা। সদ্য প্রসূত কিছু তথ্য সব সময় সংযোজিত হচ্ছে। আমাদের টেবিলেও আড্ডার বিষয় মোটামুটি একই। তবে আমরা যেহেতু একটি অভ্যন্তরীণ উপসংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত, তাই আমাদের আলোচনা নিজেদের রাজনৈতিক ধারার পরিবৃত্তে আবর্তিত। বিভিন্ন টেবিলের আড্ডায় প্রেসক্লাব গমগম করছে। খ্যাতিমানদের সংস্পর্শে জুনিয়র ভক্তদের মধ্যে একটা উজ্জীবিত ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।

উপর্যুক্ত প্রথিতযশা সাংবাদিকদের সবার সঙ্গে আমার ভালোভাবে পরিচয় ছিল না। যাঁদের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সুসম্পর্ক ছিল, বলা যায় যাঁদের কাছে থেকে দেখেছি তাঁদের সম্পর্কে পাঠককে দু-চারটি কথা জানানোর তাগিদ অনুভব করছি। আমার তালিকায় প্রথমে আসে এনায়েত উল্লাহ খান বা মিন্টু ভাইয়ের নাম। কারণ 'হলিডে' পত্রিকায় আমার সাংবাদিকজীবনের হাতেখড়ি হয়েছিল। এ পত্রিকার সঙ্গে সংযোগ ঘটেছিল নজির ভাইয়ের (আহমেদ নজির) মাধ্যমে। কিশোর বয়সে নজির ভাই ছিলেন বাম রাজনীতি ও সাংবাদিক সার্কেলে অনেকটা আমাদের সামাজিক অভিভাবকের মতো। তিনি নিজেও তখন প্রভাবশালী তরুণ সাংবাদিক। প্রায় সব সাংবাদিকের সঙ্গে তাঁর ভালো পরিচয়, ওঠা-বসা। নজির ভাই আমাকে মিন্টু ভাই ও 'হলিডে' সম্পাদক আসলাম সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। মিন্টু ভাইকে পত্রিকার মালিক বলা যায়, তবে দিনের বেলায় পত্রিকা অফিসে খুব একটা দেখা যেত না। আসলাম সাহেব অবাঙালি, উর্দুভাষী, প্রায় সারা দিনই পত্রিকা অফিসে থাকতেন। বড় অমায়িক মেধাবী মানুষ, খুব কম কথা বলতেন। পানাহারে আসক্তি বোধ হয় একটু বেশি ছিল। লেখার কাজে তাঁর সঙ্গেই আমার যোগাযোগ ছিল। তাঁদের দুজনের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আমি বিশ্ববিদ্যালয় করেসপনডেন্ট হিসেবে 'হলিডে'তে লেখা শুরু করলাম। যত দূর মনে পড়ে, ১৯৬৫ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আমার প্রথম লেখা বের হয়। সে যে কী অপার আনন্দ, তা বুঝিয়ে বলা সত্যিই দুরূহ কাজ।

শুধু সাংবাদিক মহলে নয়, মিন্টু ভাই তখন ঢাকার অভিজাত সমাজে একজন আকর্ষণীয় তরুণ হিসেবে সুবিদিত। প্রেসক্লাব, ঢাকা ক্লাব, ইন্টার কন্টিনেন্টালে তাঁর অবাধ বিচরণ। আমরা তাঁকে একটু বেশি চেনার কারণ আমাদের নেতা রাশেদ খান মেনন ও আমাদের নিকটতম বন্ধু সুলতান খান মননের তিনি অগ্রজ সহোদর। তাঁর অব্যবহিত বড় ভাই ওবায়েদুল্লাহ খান পূর্ব পাকিস্তান সরকারের দাপুটে সচিব ও খ্যাতিমান কবি। সর্বজ্যেষ্ঠ বড় ভাই বামপন্থী নেতা, একই সঙ্গে একজন উঠতি বিত্তশালী। মিন্টু ভাইয়ের সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবে মূল পরিচয়ের সূত্রপাত হলেও মননের বন্ধু সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তা নৈকট্যে রূপ লাভ করে। বিভিন্ন পার্টিতে তাঁর সঙ্গে প্রায়ই দেখা হতো, কখনো কখনো এক টেবিলে বসে খাওয়াদাওয়া করেছি। তখন অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। মিন্টু ভাইয়ের দু-একটি সংবাদ শিরোনাম যেমন '65 million Collaborators’ I ‘Silence of the lamb, not for ever' সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। শব্দ-জাদুকর মিন্টু ভাইয়ের ব্যক্তিত্বে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ ও বলিষ্ঠতা ছিল, যা নিয়ে সাংবাদিক মহল গর্ব করতে পারত। সেই মিন্টু ভাই চলে গেলেন। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে গেলেন। আমরা তাঁর জানাজায় শামিল হলাম। তাঁকে আর কখনো দেখিনি, দেখা যাবে না।

চলে গেলেন সৎ সাংবাদিকতা, সৎ রাজনীতির মূর্ত প্রতীক নির্মল সেন। 'আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই', এই শিরোনাম যাঁকে অমর করে রেখেছে। ছোটখাটো মানুষটির সাহস ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা সবার মুখে মুখে ছিল। অকৃতদার এই সাংবাদিক নেতা কোনো দিন লোভে কিংবা মোহে কারো কাছে মাথা নত করেননি। রোগে ভুগে অনেকটা নীরবে-নিভৃতে প্রয়াত হলেন। এমনইভাবে হারিয়ে গেলেন মধ্যরাতের অশ্বারোহী ফয়েজ (আহমেদ) ভাই। নির্মোহ-নির্লোভ এই সাংবাদিক বামধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাঁর মর্যাদা ও খ্যাতির কারণে দেশের সব রাজনৈতিক নেতার কাছে তিনি ছিলেন গ্রহণযোগ্য মুরব্বি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দুই নেত্রীকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার ব্যাপারে তিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। জাতি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। আমার কাছে তাঁকে বড় স্নেহবান মনে হতো। আলোচনার টেবিলে তিনি প্রায়ই বলতেন, 'সা'দতকে তোমরা আমলা বলে চালিয়ে দিচ্ছ কেন? আমাদের কাছে সে তো দুধের বাচ্চা, ছোট ভাইয়ের মতো' (যদিও আমি তখন সচিব অথবা অতিরিক্ত সচিব)। ফয়েজ ভাইয়ের কথা বড় ভালো লাগত। মধ্যরাতের অশ্বারোহী থেমে গেলেন। আমরা এমনটি চাইনি। ভয়ানক শোকাহত হলাম। জাতি হারাল এক মহান ব্যক্তিকে।

আলমগীর কবিরের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল 'হলিডে' অফিসে। বিলেতফেরত উদীয়মান সাংবাদিক, যদিও দেখে তাঁকে "বডি বিল্ডার" মনে হতো। শুনেছি তিনি অঙ্কের ছাত্র ছিলেন, বিলেতি শিক্ষার শেষ সার্টিফিকেট টেমস নদীতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে দেশে ফিরেছেন। লেখার হাত চমৎকার, ইংরেজিতে লেখালেখি করতেন। অল্প কয়েক দিনের মধ্যে লেখালেখির মাধ্যমে সাংবাদিক মহলে নিজেকে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাংবাদিকতার বাইরে 'পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি' নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে ফিল্মিজগতে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। প্রেসক্লাবে তাঁর উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। একটা তরুণ গ্রুপ তাঁকে ঘিরে আড্ডা গুলজার করত। আলমগীর কবির শেষ পর্যন্ত সিনেমার জগতে চলে গেলেন। কয়েকটি ছবি সার্থকভাবে পরিচালনা করলেন, যার মধ্যে 'ধীরে বহে মেঘনা' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উচ্চতর যশ-খ্যাতির দিকে যখন তিনি অগ্রসরমাণ সে সময়ে একদিন ফেরিতে গাড়ি ওঠাতে গিয়ে প্রাণ হারালেন। সব শেষ।

আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ ছিলেন আলী আশরাফ ভাই ও মাসির ভাই। তাঁদের সঙ্গে প্রায় রোজ বিকেলে আড্ডা চলত। সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবের নির্বাচনে তাঁরা খুব সক্রিয় ছিলেন। মাসির ভাই মারা যাওয়ার আগেও সহকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। কিন্তু আশরাফ ভাইকে শেষ বয়সে খুব একটা চোখে পড়ত না। অনেককে জিজ্ঞেস করেও তাঁর খবর বা ঠিকানা জানতে পারিনি। অবশেষে জানতে পেরেছিলাম তিনি উত্তরা মডেল টাউনে বসবাস করছেন। শরীর ভালো নয়। দুঃখ আমার, এর কয়েক দিনের মধ্যেই পত্রিকায় তাঁর মৃত্যুর খবর দেখলাম। অনেকটা নীরবেই চলে গেলেন। হাসান সাইদের সঙ্গেও আমাদের নৈকট্য ছিল; তিনি আমাদের সহকর্মী তাহমিনা সাইদের স্বামী। সুদর্শন এই উর্দুভাষী সাংবাদিক আমাদের খুব স্নেহ করতেন। মনে পড়ে আমাদের সিএসএস পরীক্ষার ফল জানতে আমি ও (ড.) মান্নান তাঁর কর্মস্থল মর্নিং নিউজ অফিসে গিয়েছিলাম। সেখানে টেলেক্সে ফল আসছিল। আমাদের ফল ভালো হওয়ায় সাইদ ভাই খুব খুশি হয়েছিলেন। উর্দুভাষী হলেও স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশেই থেকে গিয়েছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে হঠাৎ করেই মারা গেলেন। আমি বোধ হয় ঢাকার বাইরে ছিলাম। তাঁর জানাজায় যেতে পারিনি।

আনোয়ার জাহিদ, আতাউস সামাদ, বজলুর রহমান, এ বি এম মূসা- তাঁদের সঙ্গে পরিচয় ছিল, তবে সখ্য ছিল না। বয়ানশিল্পী হওয়ার কারণে মূসা ভাইয়ের সঙ্গে টিভি স্টেশনে মাঝেমধ্যে দেখা হতো। তখন শরীর ভেঙে পড়েছে, তবে কথাবার্তায় চাকচিক্য ছিল। অনুষ্ঠান শেষে বিদায় নিয়ে আমরা দুজন দুপথে চলে যেতাম। ভয় হতো তিনি আরো কয়েক বছর বাঁচবেন কি না। বাঁচলেন না। টিভিতেই তাঁর মৃত্যু সংবাদ পেলাম। বজলু ভাইয়ের হলো আকস্মিক মৃত্যু। ঢাকা ক্লাবে বসে ছিলেন, হঠাৎ পড়ে গেলেন। তারপর সব শেষ। প্রেসক্লাবে তাঁর জানাজায় উপস্থিত ছিলাম। পরিচিত বহু লোক এসেছিল। আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে বজলু ভাই না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। আনোয়ার জাহিদ, আতাউস সামাদ মাঝারি পরিণত বয়সে স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন। তাঁদের জানাজা, কুলখানিতে সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন।

আমরা কেউ আপনজনকে হারাতে চাই না। তবু অন্য সব প্রাণীর মতো সব মানুষই একসময় চিরতরে হারিয়ে যায়। না-ফেরার দেশে চলে যায়। আমরা ব্যথিত হই। কখনো কখনো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হই। আপনজনকে আর ফিরে পাই না। স্মৃতিতে তাঁদের খুঁজে বেড়াই। বুঝতে পারি, 'জীবন মানে জন্ম থেকে সময় গড়ানো/ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠা/রূপ, রস, বর্ণ, গন্ধ, স্বাদ উপভোগ করা/নয়তো চির জ্বালায় অঙ্গার হওয়া/অবশেষে হারিয়ে যাওয়া।' বাংলাদেশের সংবাদজগৎকে যাঁরা আলোকিত করেছেন, যাঁদের কর্মগাথায় পুরো সাংবাদিক মহল গৌরবান্বিত হয়েছিল তাঁদের একসঙ্গে স্মরণ করলে অপার প্রশান্তিতে মনটা ভরে ওঠে। এ লেখার মধ্য দিয়ে আমি সে প্রশান্তি পেয়েছি।

আমার কাছে ষাট ও সত্তরের দশককে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার স্বর্ণযুগ মনে হয়। উপর্যুক্ত সাংবাদিকরা সে যুগ বিনির্মাণ করেছেন। আজকের সুপরিচিত সাংবাদিকরাও হয়তো পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নবতর কীর্তিগাথা নিয়ে আবির্ভূত হবেন। প্রজন্ম তাঁদের সমান কিংবা অধিকতর উচ্চতায় যাতে অধিষ্ঠান করাতে পারে সে লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করলে আমরা আনন্দিত ও আশান্বিত হব।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা