বাংলাদেশ কি শুধু মেট্রো রেলে চড়ে, পদ্মা সেতু পেরিয়ে আর বাইরের আলোতে ঝলমল করা উন্নয়নের তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকবে, নাকি এমন এক সমাজ গড়বে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের দক্ষতা ও জীবনমান সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের হবে? আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটিই। আমাদের সমস্যা আদৌ জটিল নয়, এটি আমাদের আত্মসন্তুষ্টি, অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ও অদূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সনদপত্রের প্রতি অন্ধবিশ্বাসের বিষাক্ত ফসল। দক্ষতার চেয়ে সার্টিফিকেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার এই মানসিকতা না বদলালে আমরা চিরকাল এক অভিশপ্ত মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে থাকব, যেখানে প্রবৃদ্ধির সংখ্যা হয়তো বা চোখ ধাঁধাবে, কিন্তু মানুষের জীবন বদলাবে না।
দক্ষিণ কোরিয়ার পার্ক চুং-হি মডেলের দিকে যদি তাকাই, পার্ক শুধু কারখানা বানাননি। তিনি বুঝেছিলেন, শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো শিল্পোপযোগী মানুষ। তাই কোরিয়ার রূপান্তরের মূলে ছিল প্রযুক্তিগত শিক্ষা, পলিটেকনিকের বিস্তার এবং শিল্প-শিক্ষার লৌহ-দৃঢ় সংযোগ। তাদের লক্ষ্য ছিল ডিগ্রির ফুলঝুরি নয়, বাস্তব ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কফোর্স তৈরি করা। ফলে তাদের শ্রমশক্তি নিম্নমূল্যের উৎপাদন থেকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, সীমিত শিল্পভিত্তি ও বিশাল জনসংখ্যা দ্রুত কর্মসংস্থানের দাবি করেছিল। জিয়াউর রহমানের যুগে বাজারমুখী নীতি, বেসরকারি উদ্যোগ, গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রবাসী রেমিট্যান্সের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল—সেই সময়ের জন্য যা যৌক্তিক ছিল। কিন্তু সেই কর্মসংস্থানকে উচ্চ দক্ষতায় রূপান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কখনোই তৈরি করা হয়নি। ঠিক এখানেই কোরিয়া ও বাংলাদেশের পথ আলাদা হয়ে গেছে। কোরিয়া কর্মসংস্থানকে দক্ষতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি করেছিল, আমরা শুধু সংখ্যা বাড়িয়েছি, দক্ষতা তৈরি করিনি।
এ কারণে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক খাতে বিপুল সস্তা অর্ডার পায়—চোখ-ধাঁধানো সংখ্যা, কিন্তু তা স্বল্পমূল্যের, সীমিত লাভের। জনশক্তি রপ্তানিতেও আমরা অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠাই। গড় রেমিট্যান্স প্রতি মাসে প্রতি কর্মীর জন্য মাত্র ২০৩ ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি লজ্জাজনক ব্যর্থতা।
তথ্যগত বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জিডিপির অর্ধেকের বেশি আসে সার্ভিস খাত থেকে; শিল্পের অবদান প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং কৃষির অবদান প্রায় ১১-১২ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন শিল্প ও সেবা খাত। জিডিপির প্রায় ৮৩ শতাংশ শিল্প ও সেবা এই দুটি খাত থেকে এলেও ওই দুটি খাতের প্রতিটি উপখাতের মূল পরিচালন বিভাগগুলোর জন্য স্পষ্ট, ‘ইন্ডাস্ট্রি-ডিফাইন্ড সেট স্কিল’ আছে?
সরকার গঠিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিচালিত এনএসডিসি এই উপখাতগুলোর উন্নয়নে রত হলেও এখনো এই ইন্ডাস্ট্রি-স্পেসিফিক স্কিল আর্কিটেকচারের কার্যকর উত্তর দিতে পারেনি। এই উত্তরহীনতা বাংলাদেশের জন্য আদৌ সুসংবাদ নয়। কেননা ওষুধশিল্পের মার্কেটিং ও চামড়াশিল্পের মার্কেটিং একই ধরনের নয়। ব্যাংকের এইচআর‑ম্যানেজারের কাজ আইটি‑সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের এইচআরের কাজ মেলে না। কিন্তু আমাদের কারিকুলাম প্রায়ই একই ছাঁচে ফেলে দেয় : ‘জেনারেল বিজনেস/ম্যানেজমেন্ট’ এবং প্রত্যাশা করে এক সার্টিফিকেট দিয়েই সব কাজ হবে।
মানবসম্পদ তখনই মূল্যবান, যখন দক্ষতায় রূপান্তরিত হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা‑শিল্প সংযুক্তি এই বাস্তবতাই প্রমাণ করে। আর সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই ইন্ডাস্ট্রি-পেশাজীবী-একাডেমিয়া এবং সরকারের সমন্বয়ে ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি (এনএসআইসি) গঠন করতে হবে, যা আমলাকেন্দ্রিক হবে না, বরং উদ্যোক্তা-পেশাজীবী-একাডেমিয়া নির্ভর হবে এবং দায়বদ্ধ থাকবে সরকারপ্রধানের কাছে।
উদ্যোক্তা-পেশাজীবী-একাডেমিয়া সমন্বয়ে ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি (এনএসআইসি) তৈরি করে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে প্রথমে ১০টি উপখাতের মূল পরিচালন বিভাগগুলোর কম্পিটেন্সি ম্যাপ (গার্মেন্টস, ফার্মা, লেদার, ফুড, ব্যাংকিং, আইটি, হেলথ, এডুকেশন, কনস্ট্রাকশন, এনার্জি) তৈরি করা হবে। সেই কম্পিটেন্সি ম্যাপ অনুযায়ী একাডেমিয়া নিজের কারিকুলাম তৈরি করবে, যা মনিটর ও বাস্তবায়ন করবে ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট ব্যুরো (এনএসডিবি), যা উদ্যোক্তা-পেশাজীবী সমন্বয়ে গঠিত ব্যুরো।
আগের ব্যর্থতার কথা মাথায় রেখে এনএসডিসিকে বাংলাদেশের স্বার্থেই শুধু সমন্বয়কের ভূমিকায় রাখতে হবে। এনএসডিসি শুধু নীতি সহায়তা দেবে, কিন্তু এনএসডিবির হাতে থাকবে বাস্তবায়নের ক্ষমতা, বাজেট ব্যয়ের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি সরকারপ্রধানের কাছে। এই ভারসাম্য না এলে আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন চিরকাল অন্ধকারেই থেকে যাবে। বাস্তবায়নকারী হিসেবে এনএসডিবিকে আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলাম ও সার্টিফিকেট সুনিশ্চিত করতে হবে, যা বিদেশে গিয়ে ছাত্রদের অথই জলে ফেলবে না। তাহলেই রেমিট্যান্স টেকসইভাবে বাড়বে। এ জন্য ত্রিস্তরীয় কর্মকৌশল জরুরি।
স্বল্পমেয়াদি (১-৩ বছর) : দ্রুত রিটার্ন ও প্রবাস আয় বৃদ্ধি। মোট বাজেট জিডিপির ১ শতাংশ। ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ে ০.৭ শতাংশ—১০০টি নতুন পলিটেকনিক, শর্ট কোর্সে ৫০-১০০ হাজার প্রবাসী-যোগ্য কর্মী। ইন্ডাস্ট্রি-লেড স্কিল ম্যাপিং পাইলট। ন্যাশনাল স্কিল আইডেন্টিফিকেশন কমিটি গঠন। প্রবাসী প্রস্তুতিতে ০.৩০ শতাংশ। পদ্মা ব্যারাজ, তিস্তা প্রকল্পের পাশাপাশি চীন সরকারের সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে অংশীদারি শুরু করতে হবে।
চীন সরকারকে নিয়ে আমরা একটি নতুন যাত্রা শুরু করতে পারি। ১০টি নতুন প্রশিক্ষণকেন্দ্র, যেখানে কর্মীরা শিখবে অগ্রসরমাণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ডিজিটাল দক্ষতা ও স্মার্ট শিল্পায়ন। সেখানে চীনাদের করপোরেট অ্যাপ্রেনটিসশিপ মডেল চালু হবে, হাতে-কলমে কাজ শিখবে, কাজে লাগাবে। আর চীনের তিন বছরের ডিজিটাল কর্মী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী প্রশিক্ষণ পাবে—তাদের সার্টিফিকেট হবে আন্তর্জাতিক, চাকরি হবে দেশে আর বিদেশে।
মধ্যমেয়াদি (৩-৭ বছর) : কাঠামোগত রূপান্তর। শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত। টেকনিক্যাল অংশ ১.১৫ শতাংশ। সরকার প্রথম দুই বছরের সিড ফান্ড দেবে; পরে ইন্ডাস্ট্রি ফিস + সিএসআর + পাবলিক গ্র্যান্টস দ্বারা টেকসই রাখবে। ৩০০ পলিটেকনিক, এক লাখ অ্যাপ্রেনটিসশিপ স্লট। আরঅ্যান্ডডি ম্যাচিং ফান্ড ০.১০ শতাংশ।
দীর্ঘমেয়াদি (৭-১৫ বছর) : উচ্চমূল্যের অর্থনীতি। শিক্ষা ব্যয় ৫ শতাংশ, আরঅ্যান্ডডি ১ শতাংশ। ইনোভেশন হাব, রিজিওনাল ইন্ডাস্ট্রি-এডুকেশন ক্লাস্টার। ফিন্যান্সিংয়ের উৎস সিএসআর, ডেভেলপমেন্ট বন্ড ও প্রবাসী বন্ড। কিন্তু সবকিছুর মূলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। স্পষ্ট তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা, বার্ষিক মনিটরিং ও ক্ল-ব্যাক ব্যবস্থা ছাড়া কিছুই হবে না। বর্তমান শিক্ষিত বেকারত্বের সংকট রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্রের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা ও অদূরদর্শিতার ফল। গ্র্যাজুয়েট বেকারত্ব ১৩ শতাংশের ওপরে—এটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক বাস্তবতা।
এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে—সফলতা কি পরীক্ষা পাসের শতাংশ কিংবা সেতু-মেট্রো রেলের সংখ্যা দিয়ে মাপা হবে, নাকি মানুষের দক্ষতাকে প্রধান পাথেয় করে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটবে বাংলাদেশ? মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের আগামী উন্নয়ন প্রতিযোগিতা কিন্তু অবকাঠামোতে নয়, বরং সক্ষম জনগোষ্ঠী দ্বারাই নির্ধারিত হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তক




গত ১৮ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা শুরু করার লক্ষ্যে যে সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছে, এর দফাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্র যে লক্ষ্য নিয়ে এই যুদ্ধ শুরু করেছিল, এর কোনোটিই তারা অর্জন করতে পারেনি। উপরন্তু এত বছর ধরে একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ইরান যেন পরম মুক্তির স্বাদ পেয়েছে! এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অন্তর্বর্তী সময়ের (৬০ দিন) জন্য প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে ইরান এখন অবাধে যুক্তরাষ্ট্রসহ সবার সঙ্গেই বাণিজ্য করার অধিকার ভোগ করবে। ইরানের পুনর্গঠনের জন্য শর্ত সাপেক্ষে ৩০ হাজার কোটি ডলার সহায়তার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো দায়িত্ব নেবে। উল্লেখ্য, এই অর্থের সংস্থান হবে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে, যাঁরা ইরানে তাঁদের ব্যবসায় বিনিয়োগ করবেন। এ ক্ষেত্রে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু বিনিয়োগকারী এরই মধ্যে আগ্রহ প্রদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে। ইরান গ্যাস ও তেলের মজুদের দিক দিয়ে বিশ্বের মধ্যে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। এত দিন ধরে নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকলেও তেল উৎপাদনে তারা তৃতীয় বৃহত্তম অবস্থান ধরে রেখেছে। তাদের উৎপাদিত তেলের শতকরা ৯০ ভাগের ক্রেতা হচ্ছে চীন। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কবলে থেকেও ইরান কৌশলে তেল বাণিজ্যের মাধ্যমে এত দিন ধরে তাদের অর্থনীতিকে ধরে রেখেছিল। এখন এই নিষেধাজ্ঞার আপাত অবসান এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগ কার্যত দীর্ঘ মেয়াদে ইরানকে তার অর্থনৈতিক স্বার্থের নিশ্চয়তা দিতে পারে।