kalerkantho

সোমবার । ২২ জুলাই ২০১৯। ৭ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৮ জিলকদ ১৪৪০

রামপাল ইস্যু এবং আশার আলো

ডা. মো. ফজলুল হক   

৩০ নভেম্বর, ২০১৩ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বর্তমানে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ায় কয়লাভিত্তিক ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সুস্থ পরিবেশ বজায় রেখেই চালু রয়েছে। সুতরাং সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপালে নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপিত হলে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। বড়পুকুরিয়ার সঙ্গে তুলনা করলে পরিবেশের জন্য তেমন একটা ক্ষতির আশঙ্কা আছে বলে মনে হয় না। তার পরও সতর্কতা অবলম্বন করা মঙ্গলজনক। বিশ্বের অনেক দেশেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতেও রয়েছে। আমেরিকায় প্রায় ৩০০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। ২০১০ সালে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সুন্দরবন থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে রামপালে এক হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাটের কাজ চলে। রামপাল সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি হওয়ায় কয়লা আমদানিতে এ পথ সহজ এবং খরচও তুলনামূলক কম। সুতরাং বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে নিঃসন্দেহে। ২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার পিডিবি ও এনটিপিসি প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২০ জানুয়ারি Center for Environment and Geographical Information Services (CEGIS) রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা বা যাচাই-বাছাইপূর্বক ১০ জুলাই পিডিবি পরিবেশ অধিদপ্তরে জমা দেয়। বাগেরহাটের রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হলে পরিবেশের জন্য সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বিশ্বে যত ধরনের ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে প্রায় সব কয়টি থেকেই কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ধরনের গ্যাস নির্গত হয়ে বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, তাই বলে কি ইন্ডাস্ট্রিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বা বন্ধ করে দেওয়া কোনো দেশের জন্যই অর্থবহ হবে না। রামপালের বিষয়টিকেও একই বিবেচনায় ভাবতে হবে। সব ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন তথা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের মানদণ্ডে অত্যন্ত প্রয়োজন। উল্লেখ্য, একমাত্র ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের চারপাশেই রয়েছে প্রায় দুই হাজার কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক ইটভাটা। প্রায় ১০০ একর জমির ওপর ঢাকার মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা ও কেন্দ্রীয় হাঁস-মুরগির খামার স্থাপিত। এ এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার বা তার চেয়েও কম দূরত্বে বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক ইটভাটা রয়েছে। সেখানে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা বা সমালোচনা হচ্ছে না। এ এলাকায় গাছপালা, লতাপাতা ও শাকসবজি উৎপাদিত হচ্ছে যথারীতি। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সুন্দরবন অঞ্চল থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অবস্থান সুন্দরবনের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হবে না। অন্যদিকে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের দিকে নজর রেখেই করার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ বিন্দুমাত্রও অবহেলা করবে না- এ বিশ্বাসটুকু না থাকলে দেশে উন্নয়নের ছোঁয়াই বা লাগবে কিভাবে? ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানিমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেছেন, রামপালে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে যাচ্ছে। সুন্দরবনের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হবে না। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রটি পরিবেশবান্ধব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। একটি উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি ইটভাটা রয়েছে, যেখানে কয়লা, কাঠ, গ্যাস ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গত আশির দশকে ইটভাটার ধোঁয়া নির্গমন চিমনিগুলোর উচ্চতা ছিল মাত্র ৩০-৪০ ফুট। ফলে পার্শ্ববর্তী ক্ষেতের ফসলের ক্ষতিসহ পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ত। বর্তমানে ওই চিমনির উচ্চতা হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ ফুট। ফলে এখন আর সে ধরনের ক্ষতি হচ্ছে না। তেমনি নতুন প্রযুক্তিতে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে উদ্গীর্ণ ধোঁয়া বা ছাইও ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুন্দরবনের গাছপালার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে ওই এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বড় কলকারখানা স্থাপন করা সম্ভব হবে। ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে খুলনা, বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের। ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নেপাল, ভুটান থেকে বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আমদানিতে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার ছাড়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের সঙ্গে সব ক্ষেত্রেই সুসম্পর্ক স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশ ও জনগণের স্বার্থেই বর্তমান সরকার সীমাহীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাগ্যে জুটছে বাধা আর বাধা। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা যথাযথভাবে শেষ করেই সরকার এ প্রকল্পের মূল অবকাঠামো তৈরিতে হাত দিয়েছে। অর্থাৎ সুন্দরবনের পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের মঙ্গলের দিকটি বিবেচনায় এনেই বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি স্থাপন করা হচ্ছে। এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে রূপপুরে একটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লাট স্থাপনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয়েছে। বর্তমানে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে আরো ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এ ব্যাপারে সব শ্রেণীর মানুষ আনন্দিত। জনগণ সরকারের এ উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় গাছপালা, বনজঙ্গল ও প্রাণিকুলের প্রয়োজনকে গুরুত্বসহকারে অনুধাবন করতে হবে। তবে জনহিতকর উন্নয়নমূলক কোনো সরকারি কাজে বাধা দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল জনগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারে না বা কারো জন্য সুখকর নয়। এটিই বাস্তব সত্য। তবে সুন্দরবন ও বনের মধ্যে সব শ্রেণীর প্রাণিকুল যেন স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারে সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই নজর রাখতে হবে। প্রয়োজনে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে আরো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর

 

 

মন্তব্য