kalerkantho

সোমবার । ২৮ নভেম্বর ২০২২ । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

ডাউন দ্য উইকেট

তারকানামা

সাইদুজ্জামান

৬ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



তারকানামা

পুরো দেশ সাকিব-তামিমের জমকালো খ্যাতির আলোয় বিমোহিত। এর মধ্যে আচমকা কালের কণ্ঠের খেলার এক পাতাজুড়ে দেশের দুই শীর্ষ ক্রিকেট তারকার আচরণগত সমস্যার কথা বলা হলো। প্রায় এক দশক আগের সেদিনের পর থেকে বেশির ভাগ পাঠকের কাছে কালের কণ্ঠ মানেই একদল সাকিব-তামিম বিরোধীর সম্মিলন, নিন্দামন্দের শেষ নেই! সহযোগী গণমাধ্যমের গুঞ্জনও কানে আসে, সাকিব-তামিমরা পাত্তা দেয় না বলেই...।

পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়েছিল যে, নিজেদের পত্রিকার অন্য বিভাগেও একই সন্দেহের বুদবুদ দেখতে পেয়েছিলাম।

বিজ্ঞাপন

তাই আশঙ্কা ছিল, পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগ থেকে না কোনো ‘ডিক্রি’ জারি হয়।

সেরকম কিছু হয়নি। তাতে আমরা আরো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, তারকার আগে ক্রিকেট খেলাটাকে এগিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাই। কখনো পেরেছি, কখনো পারিনি। তাই বলে চেষ্টা থামিয়ে দিইনি। আমরা এখনো তারকার চেয়ে খেলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। এই চেষ্টার বাণিজ্যিক মূল্য নেই। বরং এতে রেসে পিছিয়ে যাওয়ার উপকরণ আছে। কারণ খেলাধুলাও বিনোদনের মাধ্যম। বিনোদনের জগৎ তারকা দ্বারা প্রভাবিত। তাই তারকাতোষণের বাজার ক্রিকেট মাঠের চেয়ে বড়, যে বাজারে ক্রিকেটও বিক্রি হয়ে যায়!

এ প্রসঙ্গে পরে আসছি।

ইদানীং দেশের বিভিন্ন মিডিয়া আউটলেটে সাকিব আল হাসানের বন্দনার চেয়ে নিন্দামন্দই বেশি চোখে পড়ে। এক দশক আগে কালের কণ্ঠের পাতাজুড়ে প্রকাশিত ‘নিন্দা’র চেয়ে এসব খবর বহুগুণ মানহানিকর। ক্রিকেট জুয়া থেকে দুর্নীতির অভিযোগ—মাঠের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে সাকিবের সমালোচনা। অন্ধভক্তরা বেদনাহত, অনুরক্তের কি-বোর্ডেও নিন্দার ঝড় উঠছে!

ভাবছেন, এসব দেখে আমরা কালের কণ্ঠের ক্রীড়া বিভাগ মুচকি হাসছি? মোটেও না। সাকিব এ দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা। সেটা তখন যেমন স্বীকার করতাম, এখনো করছি এবং ভবিষ্যতে নতুন কারোর আবির্ভাবের আগ পর্যন্তও করব। এ কারণে সাকিবের ‘দরপতনে’ হতাশাগ্রস্ত। ক্রিকেটবিশ্বে ‘বাংলাদেশের একজন সাকিব আছেন’ বলে জোর আওয়াজ তোলা যায় না।

কেন আর ভিনদেশের প্রেসবক্সে জোর পাওয়া যায় না, সেটার ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার। এর সঙ্গে ক্রিকেটীয় কোনো ব্যাপার নেই। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে যেকোনো ক্রিকেটারের ধার কমে, সাকিবের ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবেন, বিশ্বের আর কোন দলের অধিনায়ককে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ কাটাতে হয়েছে? কেউ কি জানেন, বিশ্বের আর কোন দলের অধিনায়ক দর্শককে হেনস্তার দায়ে শাস্তি পেয়েছিলেন? কেউ কি বলতে পারবেন আর কোন অধিনায়কের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে?

উত্তরে একটি নামও খুঁজে পাওয়া যাবে না। বরং বল টেম্পারিংয়ের মতো ‘মামুলি’ অপরাধে স্টিভেন স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে নেতৃত্বের জন্য আর বিবেচনাই করে না ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। টিম পেইন ছিটকেই গেছেন এক নারীকে আপত্তিকর কিছু টেক্সট পাঠিয়ে। নেতৃত্বগুণ থাকা সত্ত্বেও প্রয়াত শেন ওয়ার্নকে কখনো অধিনায়ক করা হয়নি ক্রিকেট জুয়ার গুঞ্জনে একবার তাঁর নাম ওঠায়।

বল টেম্পারিংকে মামুলি বলা এ কারণেই যে, বল ঘষামাজার বিষয়টি ক্রিকেট রাজ্যে নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ দলেও একদা প্রাণপণ চেষ্টা হয়েছে বল বানানোর। কিন্তু দক্ষ কারিগরের অভাবে সেভাবে সাফল্য আসেনি। সে তুলনায় জুয়াড়ির সঙ্গে যোগাযোগ অনেক বড় অপরাধ। শেয়ারবাজারে নয়ছয়ের দায় আরো বেশি। তবে এই দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন সাকিব। কিন্তু তাঁর প্রতিষ্ঠানের দুজন পরিচালকের অর্থদণ্ড হয়েছে। এ কারণে আসন্ন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) সাকিবের মোনার্ক হোল্ডিংসের দল কেনার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্যসচিব ও বিসিবি পরিচালক ইসমাইল হায়দার মল্লিক এমনটাই জানিয়েছিলেন। কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার হলো, সেই বোর্ডই আবার তাঁকে নেতা বানিয়েছে জাতীয় দলের!

এই দুটি সিদ্ধান্তের কোনো একটি অবশ্যই ভুল। সেই অনুসিদ্ধান্তে গেলাম না। তবে এটা যে ভুলে ভরা, তাতে কোনো সংশয় নেই। আর এই ভুলের শুরু কিন্তু সাম্প্রতিক নয়। বহুদিনের ভুল চর্চার কুফল এটি। এই ভুলের যাবতীয় দায়ভার কিন্তু সাকিবের একার নয়, অংশীদার অনেকে।

আজকের সাকিব এক দিনে এবং একা তৈরি হননি। আজকের সাকিব মানে মাঠের বাইরের কাণ্ডকীর্তির কারণে সমালোচিত সাকিবের কথা বলছি।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সদ্য পা রাখা সাকিবের গোঁফও ঠিকঠাক ওঠেনি। আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে ভারতে যাওয়া উঠতি তরুণ সাকিবকে টেলিফোনে মায়ের বকুনি শুনতে হয়েছিল, ‘পড়াশোনা করছ তো?’ স্মিত হাসি আর এক-দুটি শব্দে ভাব প্রকাশে অভ্যস্ত সাকিবের লক্ষ্য ছিল অনেক বড় ক্রিকেটারের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হওয়ারও।

২০০৮ সালে সম্ভবত। বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার রাবীদ ইমামের কক্ষে বসে এই দুটি লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন সাকিব। প্রথমটি অবধারিতভাবে পূরণ হয়েছে তাঁর। দ্বিতীয়টি নিয়ে জনমনে ঘোর সংশয় তৈরি হয়েছে। কাঁকড়ার ব্যবসা থেকে মোনার্কের আগে ক্রিকেট জুয়াড়ির সঙ্গে যোগাযোগের বিতর্ক থামতেই বেটউইনারের প্রচারণায় যুক্ত হওয়া সাকিবকে ইমেজ সংকটে ফেলেছে।

পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশে এই ইমেজ সংকটের ব্যাপারটিই এক ধরনের ইমেজ। নইলে ছোটখাটো অপরাধেও বিশ্বের বিপণন বাজার থেকে হারিয়ে গেছেন কত শত তারকা। কিন্তু আইসিসির নিষেধাজ্ঞার পর সাকিবের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছে—বিজ্ঞাপনের বাজারে কদরও বেড়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান অন্য দেশের একজন তারকাকে বিতর্ক এড়াতে দূতিয়ালির চুক্তি থেকে বাতিল করেছে। কিন্তু সেই একই প্রতিষ্ঠান সাকিবকে চুক্তিবদ্ধ করেছে! তার মানে, আর সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের ভোক্তা বাজারের মিল নেই।

খুব বেশি দিন হয়নি, দেশের নামি একটি প্রতিষ্ঠানের শুভেচ্ছা দূত হয়েছেন। সেই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের এক ঘনিষ্ঠজনের কাছে এ নিয়ে অদ্ভুত একটা গল্প শুনেছি। তিনি নাকি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এত কিছুর পরও সাকিবকে কেন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করলেন?’ ভদ্রলোক নাকি মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘সাকিবের মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। ’

এই ‘ব্যাপার’টাই সেদিনের সাকিবকে আজকের সাকিবে পরিণত করেছে। এই বিশেষ ব্যাপারের কারণে যা খুশি করার ব্ল্যাংক চেক তুলে দেওয়া হয়েছে দেশসেরা ক্রিকেট তারকার হাতে। সাকিবকে সামনে রেখে সহজে পাওয়া যায় বাণিজ্যিক ছাড়পত্র। এই সুবিধাকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যাবসায়িক সাফল্যের চেয়ে শেয়ারবাজার ও কাঁকড়া প্রজেক্ট নেতিবাচক আলোচনায় টেনে এনেছে সাকিবকে। সামনে তাঁকে রেখে পেছন থেকে খেলছে ক্রীড়নকরা। এসব বোঝার ক্ষমতা ত্রিশোর্ধ্ব সাকিবের নেই, বিশ্বাস করা কঠিন। এই অবিশ্বাস কারণেই দেশের ক্রিকেটের মহাতারকাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবিরাম অর্থলোলুপ গালমন্দ শুনতে হয়।

আমাদের হতাশার মূলে এই গালমন্দ। ছিলেনই একজন সাকিব আল হাসান। তাঁর যখন এই পরিচিতি, তাহলে বাকি থাকল কী? যাঁকে দেখে দেশের অযুত কিশোর-তরুণ স্বপ্নজাল বুনেছে, তাঁর একি হাল!

সাকিব এই আলোচনা কিভাবে নেবেন, জানি না। তবে আন্দাজ করি, এসব তাঁর মনে কোনো প্রতিক্রিয়া ফেলবে না। প্রতিটি সমালোচনার জবাব সাকিবের কাছে আছে। সেসব জবাব তাঁর মতো করে। এবং সেসব জবাব ‘এন্ডোর্স’ করার জন্য বিসিবি তো রয়েছেই।

অবিশ্বাস্য, আবার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে অবিশ্বাস্যও না ঘটনাটি। সেদিনের ঘটনা। বেটউইনারের দূতিয়ালি নিয়ে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন বিসিবি সভাপতি। হাঁকডাক শুনে মনে হচ্ছিল, এবার বুঝি রেহাই নেই সাকিবের। তবে অভিজ্ঞতা থেকে জানি, গর্জালেও বর্ষাবে না। তবু দেখি না কী হয়—এই কৌতূহল থেকে জীবনে প্রথম এবং শেষবার বোর্ড সভাপতির গ্যারেজে সংবাদকর্মীদের ভিড়ে মিশে গিয়েছিলাম। সাকিব এলেন এবং ফিরে গেলেন রাজসিক ভঙ্গিতে, প্রতিপক্ষকে ধবলধোলাই করার উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে। অন্য যেকোনো দেশের প্রেক্ষাপটে এই দৃশ্য অবিশ্বাস্য।

কিন্তু বাংলাদেশ বলেই এই দৃশ্য অবিশ্বাস্য নয়। একরকম জানাই ছিল যে, এত বিতর্কের পরও টেস্টের পর টি-টোয়েন্টিরও অধিনায়ক হতে যাচ্ছেন সাকিব। কেননা, অনেক হম্বিতম্বির পরদিন বোর্ড সভাপতির অসহায় আর্তনাদে সেরকম ইঙ্গিত আগেই দেওয়া ছিল।

দেশের ক্রিকেটে শৃঙ্খলার শেষ শিকলটিও সেদিন ভেঙে গিয়েছিল। বৈষম্যমূলক তারকানীতি বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক দিনের রোগ। মুখে ড্রেসিংরুমে সাম্যবাদ বজায় রাখার নীতির কথা বললেও কাজের বেলায় কর্মকর্তারা যত বড় তারকা তত বেশি সমাদর করেন। তাই ড্রেসিংরুমের কেউ কেউ নিজের সাফল্যের দিনেও খবরের শিরোনাম হতে সাকিব কিংবা অন্য কোনো ভাইয়ের অবদানের কথাই বেশি বলেন মিডিয়ায়!

সবশেষে, তুলে রাখা প্রসঙ্গটি আনছি। সাকিব-তামিম কিংবা অন্য কোনো তারকার কাছে ‘পাত্তা’ আমরা কখনোই চাইনি। চেয়েছি ক্রিকেট মাঠে তাঁদের নৈপুণ্য এবং মাঠের বাইরে অনুকরণীয় চরিত্র হয়ে ওঠা দেখতে।

একই প্রত্যাশা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের কাছেও।



সাতদিনের সেরা